
বরকে হত্যা করতে ডাক পড়ল ১০০ লাঠিয়ালের
জাতরক্ষার তাগিদে বিয়েতে বাধা দেওয়া এবং তার জন্য পুলিশি পাহারায় বিবাহ সম্পন্ন করা, এমন ঘটনা খবরের কাগজ খুললে মাঝে মাঝে শোনা যায়। কিন্তু আঠেরো শতকেও এমন ঘটনা ঘটেছিল খোদ ঠাকুরবাড়ির ছেলের বিয়েতে। এবং সেই খবরও আবার বড় করে ছাপা হয় ‘তত্ত্বাবোধনী পত্রিকা’য়। এমন ঘটনা কথা জানা যায় চিত্রা দেবের লেখা ‘বিবাহবাসরের কাব্যকথা’ ও প্রফুল্লময়ীর লেখা থেকে। এখানেই শেষ নয়, এই বিয়েতে নাতজামাই সেজেছিলেন স্বয়ং রবিঠাকুর।
সালটি ১২৭৪ বঙ্গাব্দ, ১১ অগ্রহায়ণ। হাওড়ার সাঁতরাগাছি মহেশ পাল লেনে চলছে জোর জল্পনা। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের পুত্রের সঙ্গে গোধূলি লগ্নে বিয়ে হবে হরদেব চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা নৃপময়ীর। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও হাওড়াবাসী হরদেব চট্টোপাধ্যায় ব্রাহ্ম সমাজের বাইরেও ছিলেন অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। সেই সূত্রে ঠাকুরবাড়িতে সর্বদা যাতায়াত হরদেবের। একদিন হরদেব বন্ধুর কাছে ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তাঁর দুই মেয়ে নৃপময়ী ও প্রফুল্লময়ীর বিয়ে যদি হয় ঠাকুরবাড়িতে। বন্ধুর ইচ্ছার মর্যাদা দিয়ে মহর্ষি তাঁর নিজের পুত্র হেমেন্দ্রনাথের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করলেন নৃপময়ীর। এই বিয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাওড়ার ব্রাহ্মণ সমাজ রেগে যায়। কারণ, ঠাকুর পরিবার হল পিরালী ব্রাহ্মণ। তার ওপর বিয়ে হবে ব্রাহ্ম মতে। ব্রাহ্মমতে বিয়েতে শালগ্রাম শিলা, তুলসিপাতা, বেলপাতা, কুশ, গঙ্গাজল, হোমাগ্নি থাকে না। যা গোঁড়া হিন্দু মতের বিপরীত। এই কথা প্রচার হতেই জাতরক্ষার তাগিদে জমায়েত হয় গ্রামের মানুষ। বিয়ে ভেঙে দেওয়ার জন্য সচেষ্ট হয় তারা। এই বিয়ে বিভ্রাট সম্পর্কে প্রফুল্লময়ী লিখেছিলেন- ‘নৃপময়ীর বিবাহের সময় আমাদের দিকে মহা গণ্ডগোল উপস্থিত হয়। আমাদের জ্ঞাতি কুটুম্বেরা সকলেই মনে করিলেন এই বিবাহ হইলে তাহাদের জাত নষ্ট হইবে, সেই আক্রোশে একশত লাঠিয়াল ঠিক করিয়া রাখিলেন, যে, যেমনি বর সভায় আসিবে তৎক্ষণাৎ তাহাকে লাঠির ঘায়ে শেষ করিয়া কনেকে তুলিয়া লইয়া যাইবেন।’
আরও পড়ুন
রবীন্দ্রনাথের বিয়ের গল্প
হরদেব যখন এই খবর পেলেন তখন কী করবেন বুঝতে পাচ্ছেন না। সেই সময় বিয়ে যাতে নির্বিঘ্ন ভাবে হয় তার জন্য হরদেবের ছেলে দুর্গাপ্রসন্ন খবর দিলেন পুলিশকে। খবর পেয়ে থানা থেকে সার্জেন কনস্টেবল পুলিশ বাহিনী আসে। শেষমেশ পুলিশের পাহারায় শুরু হল বিয়ের আয়োজন। পুলিশের উপস্থিতি দেখে লাঠিয়ালরা সরে পড়ে। উপযুক্ত সময়ে নানারঙে সাজানো পালকি এসে থামে মহেশ পাল লেনে। পালকি থেকে নামলেন বহুমূল্য বস্ত্রে সজ্জিত হেমেন্দ্রনাথের সঙ্গে জরির টুপি ও পোশাক পরা ছয় বছরের বালক রবীন্দ্রনাথ। বিয়েতে নিতবর সেজেছিলেন কবি। বরযাত্রী দেখে সকলের চোখ ছানাবড়া। স্বয়ং মহাদেব যেন ধরাতলে অবতীর্ণ হয়েছেন। যেমন রূপ, তেমনি সাজের বাহার। চারিদিক থেকে লোকেরা বর দেখিবার জন্য উঁকিঝুঁকি মারতে লাগল। অগ্রহায়ণ মাসে গোধূলি লগ্নে বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই বিয়ের দুই বছর পরেই প্রফুল্লময়ীর সঙ্গে বিয়ে হয় মহর্ষির আরেক ছেলে বীরেন্দ্রনাথের। এই বিয়েতেও রবিঠাকুর আবার নিতবর সেজে এসেছিলেন। তখন কবির বয়স আট। তবে এই বিয়েতে আর পুলিশের পাহারার প্রয়োজন হয়নি। কনেকে সাজানো হয় ঠাকুরবাড়ি থেকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের আনা অমূল্য গয়না দিয়ে। নানারকমের কাপড়ের তাঞ্জাম দিয়ে সাজানো হয় পালকি। বীরেন্দ্রনাথ চার ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন। ঘোড়ার গাড়ি ও পালকি একত্রে বড় বজরায় করে গঙ্গা পার করে কলকাতা ঘাটে নামে। এই কনেযাত্রা দেখতে হাওড়ার গঙ্গার পাড়ে লোক জমে যায়। এটিই ছিল কলকাতার বাইরে প্রথম অপৌত্তলিক বিবাহ। তাই হেমেন্দ্রনাথ ও নৃপময়ীর এই বিয়ের খবর এতটাই সাড়া জাগিয়েছিল সমাজে যে এই খবর প্রকাশিত হয় তৎকালীন ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’য়। এই বিয়ের ফলে হরদেবকে জাতিভ্রষ্ট হতে হলেও, দেবেন্দ্রনাথ কিন্তু শেষ জীবন পর্যন্ত বন্ধুত্ব রেখেছিলেন। হরদেবের মৃত্যুর পর মহর্ষি নিজে দাঁড়িয়ে চন্দন কাঠের চিতা সাজিয়ে শবদাহ করেছিলেন তাঁর।
(তথ্যসূত্র- ১। চিত্রা দেব- বিবাহবাসরের কাব্যকথা, ২। প্রফুল্লময়ীর রচনা)
