সমসাময়িক সমাজকে ব্যঙ্গচ্ছলে, নিন্দার ছলে দেখানোর কৌশল টেকচাঁদ পেয়েছিলেন মঙ্গলকাব্য থেকে

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে ১৮৫৮ সালটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এই বছরকেই বলা হয় যুগসন্ধির বছর। নানাদিক দিয়ে যেমন যুগের বদল ঘটতে থাকে একই সাথে সেই যুগ বদলের সাক্ষ্য বহন করেই প্রকাশ পেল ‘আলালের ঘরের দুলাল’। লেখক টেকচাঁদ ঠাকুর। সালটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। ওই বছরেরই আরেকটি ঘটনা হল বেলগাছিয়া-র নাট্যশালায় ‘রত্নাবলী’ নাটকের অভিনয় দেখে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মনে নাটক লেখার ইচ্ছে জন্মায়। যাইহোক, আলালের ঘরের দুলাল প্রকাশ হওয়ার পর বোঝা গেল বাংলা সাহিত্য চর্চার ভাষা ও প্রয়োগ বিন্যাস রীতিতে দুর্দান্তভাবে দিকবদল ঘটছে। প্রচলিত ভাষার রীতি উল্টে পাল্টে একাকার। তাছাড়া বিষয় নির্বাচনেও এক তীব্র ঝাঁঝের অভিনবত্ব।

‘আলালের ঘরের দুলাল’ মাসিক পত্রিকায় প্রথম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হতে থাকে। এর মৌলিকতা ধরা পড়ে দুটি জায়গায়। প্রথমত – ভাষা ও রচনা পদ্ধতি, দ্বিতীয়ত – গল্পাংশ ও চরিত্র চিত্রণে সামাজিক কলহকে তুলে ধরার গুণ। সমসাময়িক সমাজকে ব্যঙ্গচ্ছলে, নিন্দার ছলে দেখানোর প্রয়োগ কৌশল টেকচাঁদ ঠাকুর পেয়েছিলেন প্রাচীন মঙ্গলকাব্য থেকে। কলহ সাহিত্যের আড়ালে সমাজকে মোচড় দিয়েছিলেন টেকচাঁদ ঠাকুর। মঙ্গল কাব্যের মোক্ষদা ও প্রমদার কথোপকথনের সঙ্গে কিম্বা রামচন্দ্র তর্কালঙ্কারের দুর্গামঙ্গল কাব্যের ধারার সঙ্গে আলালের লেখনী চরিত্র মিলিয়ে মিলিয়ে দেখা যায়। তাছাড়া আলালের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পর্ব ও ঊনবিংশ শতাব্দীর আরম্ভকালের গল্পকে আড়াল থেকে ইঙ্গিত করে যাওয়া। সেটাই সূচনা। যার মধ্যে দিয়ে ঊনবিংশকে আন্দাজ করা যায়। যখন সাহিত্যের ভাষা ইংরেজি ও সংস্কৃত প্রভাবদোষে দুষ্ট সেই সময়ে এই সমাজ নকশা ও মুখচলতি ভাষার দুরন্ত প্রয়োগ একটা ভাষাগত মুক্তি। টেকচাঁদ ঠাকুর দেখিয়ে দিলেন সাহিত্য রচনার উপাদান বাংলাতেই আছে; তার জন্য ইংরেজি বা সংস্কৃত-র কাছে ভিক্ষে চাইতে হয় না।

ছদ্মনামি এই মানুষটি হলেন ‘প্যারীচাঁদ মিত্র’।

Developed by DXDasia