তারপর ওরা লোকটার অচৈতন্য দেহটি ঘোড়ার পিঠে তুলে শুইয়ে নিয়ে চলে গেল ফ্রেমের বাঁ দিক দিয়ে

আন্দ্রেই রুবলেভ । আন্দ্রেই তারকোভস্কি । ১৯৬৬, ১৯৭১

টাইটেল শেষে বেলুন পতনের পর এক মেঘলা দিনে শুরু হয় বাফুন পর্ব। আমরা দেখি কিরিল,ড্যানিলা আর রুবলেভ এই তিন সন্ন্যাসী মাঠামাঠি হেঁটে চলেছেন। ফসল তোলার পর অবশেষগুলো চুড়ো বেঁধে রাখা হয়েছে, অনেকটা আমাদের খড়ের আঁটির মতোই, ইতস্তত, এখানে সেখানে।ওঁরা চলেছেন কাজের সন্ধানে। হঠাৎই চরাচর ব্যেপে ঝেঁপে বৃষ্টি এল আর মাথা বাঁচাতে ওরা লাগাল ছুট। ঠাঁই মিলল একটা কুঁড়েতে, না ঠিক কুঁড়ে নয়, চারধার ঘেরা একটু বড়োসড়ো চন্ডিমন্ডপ মতো বাড়িতে বা শস্যাগারে। সেখানে তখন বাচ্চা বুড়ো মেয়ে পুরুষ মায় ছাগলছানা  অবধি সকলেই জড়ো হয়েছে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে। আর ভাঁড় মতো একটা বেঁটেখাটো টেকো লোক নেচেকুঁদে অভব্য গানবাজনা করে ওই জমায়েতকে আমোদ দিচ্ছে। ওরা তিনজন, সেখানে, ওই নিচুতলার সাধারণ মানুষের জমায়েতে, যে বেশ বেমানান তা বোঝা গেল সমস্ত নাচনকোঁদন আচমকাই থেমে যাওয়ায়। বিদূষকটি ওদের দেখে মদের গেলাসটা নিজের টেকো মাথায় উল্টে রেখে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। সবাই ওদের তিনজনকে মাপছে। কেউ একজন দেশজ মদ দিতে চাইল কিন্তু কিরিলের প্রত্যাখানে ওই ভাঁড়জাতীয় মানুষটি ফুট কাটল – মদ! ওরা মেয়েমানুষ ছোঁয় না! অপমানটা কিরিল উপেক্ষা করতে পারল না। সে রুবলেভের দিকে তাকিয়ে কিন্তু বিদূষকটিকে শুনিয়ে বলল ─ ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন ধর্মযাজকদের আর শয়তান ভাঁড়েদের। গোটা জমায়েতটাকে ক্যামেরা ঘুরিয়ে দেখাতে থাকল। ইতস্তত নীরবতা আর ইতিউতি কৌতুহলী দৃষ্টি নিয়ে বাচ্চারা সাঁকালু আর বড়োরা পেঁয়াজ গাছ দিয়ে ভাঁড়ে করে দেশজ মদ খাচ্ছিল। হঠাৎই বিদূষকটি গায়ের জামা খুলে রেখে বৃষ্টিতে ভিজতে গেল।

ছবিটি ইউটিউবে দেখতে  ক্লিক করুন

বাইরে তখন তুমুল অঝোর।
রুবলেভ আয়তাকার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। ঘোড়াগুলো ওই দূরের তৃতীয় ফ্রেমে ভিজে যাচ্ছিল ( সব সংস্করণে নেই )। আমরা দেখলাম দুজন স্থানীয় মানুষ প্রবল বর্ষণের মধ্যে বেধরক ভিজে, বেহেড মাতাল হয়ে ইয়া বড়ো লাঠি নিয়ে মারামারি করছে কিন্তু কেউই কাউকে মারতে পারছে না, উল্টে জলে কাদায় আছাড় খাচ্ছে, শেষমেষ  বেসামাল হয়ে পড়েই গেল সপাটে আর  ঠিক তখনই সেই মুষল বারিধারাকে ভেদ করে চার অশ্বারোহী চার্চ পুলিশ এল ওইখানে।

বৃষ্টি ধরে গেছে । ভেতরে আলতো রোদ্দুর। পুলিশেরা বিদূষকটিকে বাইরে থেকে ডেকে নিয়ে দুজন দুদিক থেকে লোকটার দুহাত ধরে ঝুলিয়ে নিয়ে গিয়ে সজোরে মাথা ঠুকে দিল সামনের গাছটাতে। এত জোড়ে যে ওই বড়ো গাছটাও কেঁপে উঠল আর সদ্য বৃষ্টি ভেজা পাতা থেকে শান্তিবারির মতো ধারা নেমে এল কাদা মাটি জলের ওপর জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকা লোকটার ওপর । গাছ ─ সে তো কাঁদতে জানে না। একটি পুলিশ আরেকবার দরজায় এসে হার্পের মতো দেখতে লোকটার বাজনাটা বাইরে নিয়ে গিয়ে আছড়ে ভাঙল। তারপর ওরা লোকটার অচৈতন্য দেহটি ঘোড়ার পিঠে তুলে শুইয়ে নিয়ে চলে গেল ফ্রেমের বাঁ দিক দিয়ে। কেউ কোনো প্রশ্ন করল না কোনো কথা হল না।

তখন বৃষ্টি হচ্ছিল না।
আমরা দেখলাম কিরিলকে ফিরতে। রুবলেভ জিজ্ঞেস করল ─ কোথায় গেছিলে ? উত্তরে কিরিল বলল ─ যে এই একটু হাঁটাহাঁটি করছিলাম। (আসলে আমরা কেউ টেরই পাইনি যে কিরিল এর মধ্যে বাইরে গেছিল আর কেনটা জানতে আরও ২ ঘন্টা ২৮মিনিট, কাহিনি অনুসার তেইশ বছর অপেক্ষা করতে হবে। ‘ঘন্টা’ পর্বে যখন আরও বুড়ো হয়ে যাওয়া ওই বিদূষকটি রুবলেভকে কিরিল ভেবে ভুল করে কুঠার নিয়ে তেড়ে যাবে এই বলে যে ওকে দশ বছর জেলে কাটাতে হয়েছে, অর্ধেক জিভ কেটে নিয়েছে স্রেফ কিরিলের জন্যে কেননা ওই  সেদিন পুলিস ডেকে আনতে গিয়েছিল )।
বৃষ্টি ধরে গেছে এবার চলো – কিরিল বলল। এবং রুবলেভ ঘুমিয়ে পড়া ড্যানিলাকে ডেকে নিয়ে ওই বাড়িটি থেকে বাইরে এল তারপর ফ্রেমের সামনে দিয়ে তিন সন্ন্যাসী চলে গেল ডানদিকে, মস্কো শহর অভিমূখে। আর তখনই আমরা দেখলাম ৭০মিমি পর্দা যেন আরও কত বড়ো হয়ে গেছে! সামনের কাদামাঠের ফোরগ্রাউন্ড পেরিয়ে এক বিশাল, যতদূর দেখা যায় ততদূর বিস্তৃত জলাশয় তারপর আরেকটা আরও বিশাল দিগন্তবিস্তৃত জলাশয় আর সেই আকাশ জলের মহাকাব্যের ঠিক মাঝখান দিয়ে দুটি জলাশয় ভেদকারি যে পথরেখা সেটা বরাবর ওই দূর দিয়ে চারটি অশ্ব সমেত রাজপুরুষেরা যাচ্ছে। তাকিয়ে ছিলাম ওই দূরে আর ঠিক তখনই ক্যামেরার সামনে ঝেঁপে এল ভারি বৃষ্টি। আমরা পুরো ভিজে গেলাম। সাদা হয়ে গেল পর্দা। ধুয়ে দিল যেন বাফুন পর্বটিকে।

রাশিয়াকে, নিজের দেশকে তারকোভস্কি ঠিক কতখানি ভালোবাসতেন আর সেটা এই গোটা দুনিয়াকে দেখাতে চেয়েছিলেন পরম মমতায়, তা বোঝেনি তৎকালীন কম্যুনিস্ট সরকার কেননা তারা চায়নি রাশিয়ার সেই অন্ধকার ইতিহাস বাইরের পৃথিবী জানুক তাই সিনেমাটি বানাতে সময় লেগে যায় দশ বছর আর রিলিজ নিয়ে হতে থাকে গড়িমসি। অবিশ্যি তারকোভস্কির সিনেমা ভাষা সরকারি কর্তৃপক্ষ বুঝতেও পারেনি তাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টির এই অপার সৌন্দর্য আর তো দেখিনি কখনও কিন্তু তা নিসর্গের চোখের আরামে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই ফাঁকে তিন জন যাজকের চরিত্র প্রকৃতির আঁচ পেয়েছি, আচমকা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে এক জায়গায় জড়ো হওয়া রাশিয়ার গ্রাম প্রদেশের মানুষজনকে চেনার, দেখার সুযোগ পেয়েছি। বৃষ্টি তাদের কাছে ছুটি। ফুরসত। নেশা করা, বৃষ্টিতে ভেজা, গান বাজনা করা, মজা করার একটা সুযোগ। একটা গোটা রাশিয়াই যেন চলে এল বৃষ্টির হাত ধরে। প্রকৃতপ্রস্তাবে এই পর্বটির নাম ভিন্ন সাবটাইটেলে skomorokh, বাফুন বা জেস্চার নয়। এই স্কমারখ কিন্তু ঠিক ভাঁড় বা বিদূষক নয় বরং এমন অভিনেতা যাঁরা গান গাইতে, বাজনা বাজাতে, নাটক করতে পারতেন এবং মুখে মুখে ছড়া রচনাও করতে পারতেন। রাশিয়ান পাপেট থিয়েটার স্কমারখদের থেকে অনেকটাই নিয়েছে। এখন যে গানটা ওখানে ওই স্কমারখ লোকটি গাইছিল তা ইংরেজি সাবটাইটেলে অনেকটাই চেপে দেওয়া হয় কেননা সেটি বেশ অকথ্য এবং স্যাটায়ার ধর্মী ছিল। শহরের রাস্তাঘাটে কিংবা চৌমাথায় ৭০-১০০ জনের জমায়েতে এরা গানবাজনা করত। বেশ জনপ্রিয় ছিল তাদের সংগীত। জার আলেক্সি মিখাইলোভিচের সময়ে ১৬৪৮ সালে এদের নিষিদ্ধ করা হয়। রক্ষণশীল চার্চ সহ্য করতে পারত না এদের গান বাজনাকে, ব্যঙ্গবিদ্রূপ, সমালোচনাকে আর তাই চার্চের হাতে স্কমারখদের প্রাণ যেত অহরহ। চার্চ ছিল সেই সময় বিরাট ক্ষমতার প্রতিভু। তাই কিরিলের মন্তব্য ও চার্চ পুলিশ ডেকে নিয়ে আসা থেকে আমরা রাশিয়ান চার্চের নিপীড়ণ ও অত্যাচারের যে মুখটি দেখি তা উঠে আসে ইতিহাস থেকে। বৃষ্টিপাতের মধ্যে নরম সূর্যের আলো একবারই এসে পড়েছিল সেই খালি গায়ের স্কমারখটির ওপর। তারকোভস্কির পক্ষপাত বুঝে নিতে আমাদের অসুবিধা হয়নি। একই সঙ্গে গান বাজনা অভিনয় ও স্বাধীন পারফর্মেন্সের ওপর রাষ্ট্রের মনোভঙ্গিটিও আমরা দেখতে পাই চরাচর ভাসিয়ে দেওয়া বৃষ্টির মধ্যে। ধর্মের মুখও দেখিয়ে দেয় এই বৃষ্টিই। সত্যই আমরা পুরোদস্তুর ভিজে যাই বৃষ্টিতে।

দা লাস্ট জাজমেন্ট বা পঞ্চম পর্বের শেষের দিকে দুম করে চার্চের সাদা দেওয়ালে রুবলেভের উন্মত্তের মতো রঙের তাল ছুঁড়ে মারা তারপর সেটাকে হাত দিয়ে রগড়াতে রগড়াতে কান্নায় ভেঙে পড়া মনে পড়ে? বাইরে তখন বৃষ্টিতে সবকিছু সাদা আর তার মধ্যেই সেই আলোর ক্যানভাস থেকে ধীর পায়ে পেছোতে পেছোতে চার্চের ভেতরে ঢুকে আসে সেই নিষ্পাপ বোবা মেয়েটি। পরম মমতায় বুকে আগলে রেখেছে একগাদা খড়ুকুটো। সরলতার প্রতিমূর্তির মতো সে ঘুরতে ঘুরতে চলে আসে রুবলেভের ছোঁড়া রঙের দলাটির (যদিও আমরা দেখি সাদা কালোয়। তখন বাইবেল থেকে পাঠ হচ্ছিল মেয়েদের চার্চে প্রবেশের সময় মাথায় ঘোমটা দেওয়া নিয়ে) কাছে আর সেটির ওপর হাত বোলাতে থাকে সে খড়কুটোগুলো ফেলে দেয় মাটিতে, রং-টা রগড়ায় হাতে করে। তারপর কী যেন হয়, ও কেঁদে ফেলে হাউ হাউ করে। রং-ঘষা হাতটা নাকের কাছে এনে শোঁকে। আবার কেঁদে ফেলে । রুবলেভ যেন কীসের উত্তর খুঁজে পায়! বেরিয়ে যায়। বোবা মেয়েটিও চলে যায় পিছুপিছু, বাইরে, সেখানে তখন প্রবল বর্ষণ হয়ে চলেছে।

সে, বৃষ্টি, এসেছিল আরেকবার। ছবি শেষ হওয়ার ছ-সাত মিনিট আগে অষ্টম বা ঘন্টা পর্বের শেষে যেখানে জল কাদার ওপর শুয়ে পড়ে কাঁদছিল ছেলেটি সাফল্যের কান্না, যখন চতুর্দিক অনুরনিত হচ্ছিল ঘন্টাধ্বিতে, যখন ও রুবলেভকে বলছে ─ জানো তো বাবা আমাকে কিছুই শিখিয়ে দিয়ে যায়নি সবটা নিয়েই কবরে গেছে আর রুবলেভ ওকে জড়িয়ে ধরে সামলাচ্ছে ঠিক তখনই সেই মুহূর্তে ক্যামেরা আস্তে করে ওদের ছেড়ে পাশে চলে যায় যেখানে কাঠকুটো দিয়ে আগুন জালানো ছিল আর তা থেকে ধোঁয়া উঠছিল। সেটা হঠাৎই রঙীন হয়ে যায় তিন ঘন্টা সাদা কালোর পর। বেজে ওঠে ভ্যাচেসেলাকো ভিসিনিকোখের সঙ্গীত আর আমরা দেখি রুবলেভের কাজকর্ম, চার্চের, কাঠের প্যানেলের খন্ডাংশের চিত্র। সেসব দেখাতে দেখাতে যখনই খ্রীস্টের মুখকে ধরে ক্যামেরা ঠিক তখনই শুনি গুরুগম্ভীর মেঘের গর্জন আর ঝরতে শুরু করে 'রঙের ঝরনা'।

শেষতম দৃশ্য। একটা নদী মধ্যিখানে চরের মতো ঘন সবুজ জমিখণ্ড আর সেখানে দাঁড়িয়ে চারটে ঘোড়া ভিজে যাচ্ছে !
তিন ঘন্টা মানব যন্ত্রণা শেষে শান্তি ।
সেখানে তখন ঝেঁপে বৃষ্টি হয়ে চলেছে ।
আহ!

(বৃষ্টিপাত চলবে)

কৈফিয়ত : যে কটি সিনেমার বৃষ্টি পুরোদস্তুর ভিজিয়ে দিয়ে গেছে আমায়, সর্বাঙ্গের জল শুকোয়নি আজও, শুকোবেও না শ্বাসবায়ু থাকতে, তাদের নিয়েই এই লিখন। বলে রাখা ভালো যে, সিনেমায় বৃষ্টি নিয়ে কোনো সর্বসম্মত তালিকা তৈরির চেষ্টা আমি করিনি।

Developed by DXDasia