লেনিন সরণির জ্যোতি সিনেমা হল এখন হেরিটেজ বিল্ডিং

মধ্য কলকাতার ডান ও বাম অলিন্দ যদি নিউ মার্কেট ও চাঁদনি চক হয়, তবে লেনিন সরণি তার মহাধমনি। মৌলালি থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষের দিনের বাস এই রাস্তায়। কয়েক হাজার মানুষের রুজিরুটি। এমন এক ভিড়ের খাঁচায় ওয়েলিংটন মোড় যেন জানলার ফুরসতটুকু। একদিক থেকে কলেজস্ট্রিটের হাওয়া ভেসে আসছে পার্কস্ট্রিটমুখী সমস্ত যানবাহনে। ট্রাম যাওয়ার ঘণ্টা আর রান্নার টুংটাং শব্দ। কেউ সিগারেট খাচ্ছে দাঁড়িয়ে, কেউ নিমকি ভাজছে, কেউ কড়াই মাজছে আর কেউ হেলমেট দর করছে প্রাণপণ। ১০ বর্গমিটারের পরিধিতে এতগুলি উদাসীন মানুষ, তারা এতরকম কাজ করছে, এ একমাত্র কলকাতাই পারে। এই মোড় থেকে ২ মিনিট হেঁটে এগোলেই এক পরিত্যক্ত বাড়ি। গায়ে লাগোয়া অন্যান্য বাড়ির পাশ দিয়ে লেনিন সরণির বুকে জেগে রয়েছে একটি মরচে ধরা বোর্ড। বিরাট আকৃতির সেই বোর্ডে গোল গোল খাঁজে এক একটি শব্দ দিয়ে লেখা রয়েছে ‘জ্যোতি’! হ্যাঁ, জ্যোতি কলকাতাকে ছেড়ে গেলেও কলকাতা ভোলেনি তার নাম। এই লোকালয়টুকু এখনও জ্যোতি নামেই চেনে মানুষ। ১৯৩০ এর মাঝামাঝি তৈরি হয় এই সিঙ্গল স্ক্রিন হল। মধ্য কলকাতার বুকে ৭০ মিলিমিটার ফিল্ম চালিয়ে ১৯৭০এ এক অন্য মাত্রার খ্যাতি অর্জন করে এই হল। স্ক্রিনের মান থেকে বসার চেয়ার পর্যন্ত সবকিছুই ছিল নিখুঁত এখানে। মানুষের মুখে মুখে ফিরত এই হলের নাম। কেবল হিন্দি নয়, বহু হলিউড ছবি স্ক্রিনিং হয়েছে এখানে বহুবার। অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে দুর্দান্ত সাউন্ডের জন্যও জ্যোতির এক বাধা দর্শকমহল তৈরি হয়ে যায়। ৩২/১ লেনিন সরণির এই বাড়ি এখন হেরিটেজ বিল্ডিং। যদিও টিকে রয়েছে সামান্য কিছু অংশ। অসুস্থ মানুষের মতো ভিতর ভিতর ফাঁকা হয়ে গেছে সবকিছু। কেবল ঋজু দাঁড়িয়ে রয়েছে বাইরের দেওয়াল। একতলায় তালা দেওয়া দরজাগুলি দেখলে মনে হবে এইমাত্র কেউ এসে খুলবে হল। তারপর টিকিট কিনতে লাইন দেবে লোকজন। দারোয়ান টিকিট দেখে টর্চ জ্বালিয়ে দেখিয়ে দেবেন আসন। আমরা গিয়ে বসব, দেখব গমগম শব্দে স্ক্রিন জ্বলে উঠছে, লেনিন সরণির উপর দশহাজার স্ক্যোয়ারফুটে কখনও পাহাড় উঠে আসছে, কখনও সমুদ্রের জল পা ছুঁয়ে যাচ্ছে। বাইরের ব্যস্ততা নেই, শব্দ নেই, মারদাঙ্গা-মাতলামি নেই। একদল মানুষ যেন টাইম মেশিনে মোহগ্রস্ত।

আরও পড়ুন
টকি-কথা ১

 

এরপর ২০০৮ নাগাদ এক প্রবল আর্থিক সমস্যায় পড়ে এই হল। বিরাট টাকার লোকসান হয় কর্তৃপক্ষের। এই সমস্যা সামাল দিতে না পেরে মালিকেরা সে বছরেই বন্ধ করে দেন হল। ২০১০ সালে বিকে সেঠি ও বিকে খান্না কিনে নেন এই জায়গাটি। ২০১২-র জুলাই নাগাদ একতলায় শুরু হয় একটি ডিস্ট্রিবিউশন অফিস ও দোতলায় একটি ফিনান্স কোম্পানি। এর কয়েকবছর পর তাঁরা জানান জায়গাটি নিয়ে কী করা হবে সে বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। সিঙ্গল স্ক্রিন হলের কোনও ভবিষ্যৎ নেই আর। অথচ একটি মল তৈরি করার মতো জায়গাও নেই ওখানে। পার্কিং নিয়েও যথেষ্ট সমস্যা রয়েছে ওই রাস্তায়। তবে তাঁরা ভাবনা চিন্তায় রয়েছেন।

আরও পড়ুন
টকি-কথা ২

এরপর আরও কয়েক বছর কেটে গেছে। ভিতর ভিতর ছাদ ভেঙে ফেলা হয়েছে দোতলার। বাকিটাও ভেঙে ভেঙে পড়ছে ক্রমশ। কুঁজো হয়ে আসছে ‘জ্যোতি’। বুঝতে পারছে সময় শেষ। সামনে দিয়ে বাস চলে গেল, কন্ডাক্টর চিৎকার করে ডাকল, ‘জ্যোতি কে নামবেন?’… ‘জ্যোতি’ শুনতে পেল কি? ইটে ইটে শিহরণ হলো তার ভগ্নপ্রায় শরীরে?

Developed by DXDasia