আর্থিক ফ্যাসিবাদ : দেখার বিষয় কতটা ক্ষতি হয় অর্থনীতির, সমাজের, মননের

বড় নোট বাতিল করে সরকার আদতে এক বিপুল করভার চাপিয়ে দিয়েছে মধ্য ব্যবসার ওপর

নভেম্বর বিপ্লবের ৯৯তম বার্ষিকীতে নরেন্দ্র মোদি এক বৈপ্লবিক ঘোষণা করে দিলেন। ভারতীয় অর্থনীতি প্রায় অর্থহীন হয়ে গেল। আপাতদৃষ্টিতে খুব ভাল। এক ধাক্কায় সমস্ত নকল টাকা অচল হয়ে গেল। বাতিল হয়ে গেল কালোবাজারিদের হাতে ধরে রাখা কোটি কোটি টাকা যা পাঁচশো আর হাজারে রাখা ছিল। কিন্তু অর্থব্যবস্থার ভেতরে উঁকি দিলে দেখব এতে লাভ যা হবে তার চেয়ে  ক্ষতি হবে অনেক বেশি।

ভারতের অর্থনীতিতে রিজার্ভ ব্যাংকের হিসেবে এক লক্ষ নোটে ২৫টি জাল। কাজেই জাল নোট ধরার জন্য এত ঝামেলা নিশ্চয়ই না।

ভারতে আয়কর বা বাণিজ্যকরের লাগাম খুব শিথিল। ব্যাংক-ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ একটা এমন জাল তৈরি করেছে যে লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করলেই আয়কর দপ্তরের কাছে তার হিসেব চলে যাবে। কিন্তু কতজন ব্যবসায়ী ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করে? বিপুল পরিমাণ উৎপাদন আর বাণিজ্য অর্থের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। আর এই অসংগঠিত ক্ষেত্র অর্থাৎ কাঁচা-টাকার ব্যবসা করও দেয় খুব কম। অথচ জাতীয় আয়ের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ এদের থেকে আসে, জাতীয় কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশও। কাজেই এদের কর-ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে এসে কর আদায় বিষয়ে সরকারের স্বার্থ রয়েছে। আধুনিক সব রাষ্ট্রেই কর আদায় ব্যবস্থা আমাদের দেশের থেকে ভাল। ভারতে যেখানে কর আয়-জাতীয় আয় অনুপাত ১৭.৭%, চীনে ২২, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ২৭, ইংল্যান্ডে ৩৪, ফ্রান্সে ৪৮, ডেনমার্কে ৫১%। স্বাভাবিক ভাবেই মনে হতে পারে আমাদের সরকারের আরও কর আয় বাড়ানো উচিত।

কিন্তু বাস্তবটা আলাদা।
কেইনসের অর্থনীতির সহজপাঠ বলছে

# কর বাড়ালে জাতীয় আয় কমে যায়। যেহেতু আয়কর খরচযোগ্য আয় কমিয়ে দেয়, কমে যায় চাহিদা, কাজেই বাজার আয়কর প্রয়োগের আগে যে ভারসাম্যে ছিল তার চেয়ে নিচের উৎপাদনের ভারসাম্য বেছে নেয়।

# তেমনি ব্যবসার আয়ে কর বসালে মুনাফা কমে যায়, পুনর্নিয়োগযোগ্য অর্থের পরিমাণ কমে গেলে বাজারে চাহিদার জন্য উৎপাদন বৃদ্ধির চাপ থাকলেও সেটা করা সম্ভব হয় না।

# অন্যদিকে ধনতন্ত্রে টাকা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। পুনর্নিয়োগ হয়নি এমন অর্থনীতিতে টাকার জোগান বাড়ালে মূল্যবৃদ্ধি হয় ঠিকই কিন্তু খানিক উৎপাদনও বেড়ে যায়। তেমনি টাকার যোগান কমালে কমে উৎপাদন।

# করলব্ধ আয় সরকার পুরোটা অর্থনীতিতে খরচ করে দিলেও করের জন্য যতটা আয় কমেছে ততটা আয় বাড়ে না।

আধুনিক রাষ্ট্র কল্যানরাষ্ট্র, দেশের পিছিয়ে পড়া শ্রেণী, পরিকাঠামো, প্রতিরক্ষা, সামাজিক সুরক্ষার জন্য কর তাকে তুলতেই হয়। উন্নত দেশে উৎপাদনশীলতা বেশি। দেশের পরিকাঠামো ধরে রাখা আর আন্তর্জাতিক ভাবে বিপুল ক্ষমতা বজায় রাখার স্বার্থে তাদের অনেক বেশি কর আদায় করতে হয়। কিন্তু জাতীয় আয় আর মাথাপিছু আয় বেশি হওয়ায় বিপুল করভার জনগণ কখনই বুঝতে পারে না। বরং অর্থনীতি নিজে থেকে পুনর্নিয়োগের দিকে চলে যাওয়ায় কর এবং সরকারি খরচ বেশি আয়কে ধরে রাখে, বাজারের ওঠাপড়ায় আয়ের পতন আটকে দেয়, সামাজিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করে।

ভারতের মত একটি পিছিয়ে পড়া দেশে কি করে জাতীয় আয় বাড়ানো যাবে, দারিদ্র কমানো যাবে সেটা একটা কঠিন প্রশ্ন। দেশের আয়তন, জনসংখ্যা, নানা রকমের প্রাচীন চিরাচরিত প্রথা চলে আসায় পশ্চিমের দেশের মত সরকারি আর্থিক আর কর নীতি দ্রুত আয় বৃদ্ধি করতে পারে না। অর্থনীতিবিদ অমিয় দাসগুপ্ত একবার বলেছিলেন যে আমাদের অর্থনীতিতে পশ্চিমের অর্থবিজ্ঞান অনেকটাই অচল। টাকার যোগান বাড়লে এখানে ততটা আয় বাড়ে না। সরকারি খরচ বাড়লেও আয়ের বৃদ্ধি কম হয়। দেশের চিরাচরিত প্রথা, উৎপাদন ব্যবস্থার সমস্যা, আধুনিক শিক্ষার অভাব, আধুনিক উৎপাদন প্রণালী না থাকা, সরকারি বেসরকারি স্তরে দুর্নীতি এর কারণ।

বড় নোট বাতিল করে সরকার আদতে এক বিপুল করভার চাপিয়ে দিয়েছে মধ্য ব্যবসার ওপর। যারা এতকালের কর না দেওয়া টাকার যা হাতে ধরা আছে জমা দেবে, যারা না দিয়ে পুড়িয়ে দেবে, প্রকারান্তরে দু’দলই এই কর দিতে বাধ্য হল। যে টাকা ফিরে আসবে না, সে পরিমাণ টাকা সরকার ছাপিয়ে নিতে পারবে। এর দু’টো দিক। মধ্য ব্যবসার হাতে দসেরা, দুর্গাপূজা, ছট পরব, ঈদের পর যে বিপুল টাকা ছিল শীতের ফসল কিনে রাখার জন্য, ধান আলু, সরষে চাষে দাদনের জন্য সে টাকা আর থাকল না। আর সরকারের হাতে সমপরিমাণ টাকা খরচের অধিকার চলে এল। এর সাথে রাশিয়ার ডিকুলাকাইসেশনেরই তুলনা করা যায়। এক লহমায় নানা সরকারী উদ্যোগে খরচ করার টাকা পেয়ে গেল সরকার। কিন্তু সরকারের খরচের দিক আর বাজারের দিক এক না থাকার একটা অর্থ এমন কোনভাবে খরচ যা আমাদের সামাজিক চাহিদা নয়। এই বিপুল টাকা কি সমাজের নিচের দিকের মানুষের জন্য ব্যয় হবে? সামাজিক সুরক্ষায় খরচ হবে? মধ্যব্যবসা, কৃষিসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ডিমনিটাইসেশনের জন্য যে ১৫/২০/৩০% মূলধন নষ্ট হয়ে গেল তার জন্য কিন্তু জিডিপি কমে যাবে, শ্রমিক কাজ হারাবে, কাজেই সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্ন খুব জরুরী হয়ে ওঠেই।

ভারতে কোন সরকারই খুব আমজনতার হয়ে কোনদিন কাজ করেনি, যা করেছে ভোটের দিকে চেয়ে। সরকারের স্বচ্ছতা বা শুভেচ্ছা সাধারণ মানুষ খুব টের পায়নি কোন দিন। আচমকা কেন্দ্রের সরকার দেশের জন্য কিছু করে দেবে ভাবা কঠিন। তাও বিপুল মানুষ ডিমনিটাইসেশনের পক্ষে। একদিকে ধনীদের প্রতি ঘৃণা, অন্যদিকে পাকিস্তানের সাথে সাময়িক কালের অশান্তির জেরে জনতার দেশপ্রেম তুঙ্গে। সেই আবেগকেই কাজে লাগিয়েছে মোদিসাহেব। আর সেখানেই ভয়। দেশপ্রেম, ধর্মীয় জিগির, সংখ্যালঘু, দলিত, বুদ্ধিজীবী, মধ্যব্যবসায়ী-নানান জাতের দেশের শত্রু চিহ্নিত করার প্রবণতা, যুদ্ধবাজ ভাবভঙ্গী নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ এক নয়া জঙ্গী অবস্থা নিয়েছে। সেখান থেকে ফ্যাসিবাদী আর কয়েক কদম দূরে।

পুতিনের হুংকার, ব্রেক্সিট, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের পর ভারতে এ ধরনের আর্থিক ফ্যাসিবাদ খুব অবাক করা ঘটনা নয়। দেখার বিষয় কতটা ক্ষতি হয় অর্থনীতির, সমাজের, মননের। গভীর ক্ষতির মাঝেই আমাদের যুক্তি আর বিশ্বাসের পুনরারম্ভ লেখা রয়েছে।

Developed by DXDasia