যে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা নিরপরাধ, তাঁদের নিরাপত্তা চাই

রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ভাঙতে চাইলে সমাধান কঠিন

বুধবার মিয়ানমারের রাষ্ট্রনেত্রী আং সান সু কির সঙ্গে বৈঠকের পরে নরেন্দ্র মোদি রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে নেপিতাওয়ের সরকারি অবস্থানকেই সমর্থন করায় অনেকেই খুব বিস্মিত হয়েছেন। বিস্ময়ের কারণ, মোদি কেন রোহিঙ্গাদের ওপর মায়ানমারের সেনাবাহিনীর অত্যাচারের কথা বললেন না। কিন্তু সেরকম বলার কথা ছিল কি? অথবা, যা করছেন তার থেকে ভিন্ন কিছু করা মোদির পক্ষে সম্ভব ছিল কী? শুধু আমাদের দেশের নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মিডিয়া রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের কাহিনী নিয়ে শত শত নিবন্ধ লিখেছে। সেই নিবন্ধগুলোতে যা বলা হয়েছে, তা পড়লে বোঝা যায় ‘নিরীহ’ রোহিঙ্গাদের ওপর ভীষণ অত্যাচার চালাচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হাজারে হাজারে রোহিঙ্গা মুসলিম মিয়ানমার ছেড়ে পালাচ্ছেন। সম্প্রতি সেই ঘটনা বেড়েছে। এর আগে ২০১২ সালেও এভাবেই রোহিঙ্গারা পালিয়েছিলেন। তাঁদের ওপর ভয়ঙ্কর অত্যাচারের এই কাহিনী অতিরঞ্জিত নয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, তাঁরা বা তাঁদের সম্প্রদায়ের সব লোকজনই কি ‘নিরীহ’? না সংঘাতের প্ররোচনা তাঁদের সম্প্রদায়ের মানুষেরাই দিয়েছেন? রোহিঙ্গাদের একাংশ সেই ১৯৪৭ থেকে মায়ানমার ভাঙার চেষ্টা করছেন এবং মিলিশিয়া গড়ে সেনাবাহিনী এবং হিন্দু ও বৌদ্ধদের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছেন। ১৯৪৭–এর আগে ব্রিটিশদের হয়ে রাজাকার হিসাবে তাঁরা লড়েছিলেন জাপান–সমর্থক বৌদ্ধ বর্মীদের বিরুদ্ধে। ১৯৪৭ সালে তাঁরা মহম্মদ আলি জিন্নার কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন, রাখিন (আরাকান)  প্রদেশকে পাকিস্তানে ঢুকিয়ে নিতে। ওই প্রদেশের উত্তরাংশে তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও দক্ষিণাংশে কিন্তু বৌদ্ধদের বাস। ফলে তাঁদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সংঘাত চলতে থাকে। তারপর একটা সমাধানের চেষ্টা হয়। কিন্তু সামরিক জুন্টা ক্ষমতায় এসে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী সরকার গড়ে, এবং জানিয়ে দেয় রোহিঙ্গারা বহিরাগত, বাংলাদেশ থেকে আসা ‘বাঙালি’, আর সে কারণেই নাগরিকত্বের অধিকারী নয়। 

সেই থেকে সংঘাত চলছে। এর মধ্যে গত ২৫ আগস্ট ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’র আক্রমণে মিয়ানমারের ১২ জন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। তারপর থেকে চলছে সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ মিলিশিয়ার সঙ্গে মুসলিম মিলিশিয়ার লড়াই, যার পরিণতিতে অন্তত ৮০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়েছেন। এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে। লাগাতার এই লড়াইয়ে লাখ দশেক মানুষের রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় আশি হাজার শিশুর খাবার নেই। কিন্তু সন্ত্রাসবাদকে আঁকড়ে আজকের দুনিয়ায় কোনও লড়াই চালানো কি সম্ভব? ব্রিটিশ পত্রিকা ‘গার্ডিয়ান’ একটি উদারনৈতিক ও ব্যক্তিস্বাধীনতা–পন্থী সংবাদপত্র হিসাবে সুপরিচিত। গত রবিবারে প্রকাশিত তাদের একটি নিবন্ধের নাম, ‘উই ডাই অর দে ডাই’: রোহিঙ্গা ইনসার্জেন্সি স্পার্কস ফ্রেশ ভায়োলেন্স ইন মিয়ানমার। নাম থেকেই স্পষ্ট, কী ঘটছে। রাষ্ট্রকে অস্ত্র হাতে চ্যালেঞ্জ করলো রাষ্ট্র তো জবাব দেবেই। 

আর সেজন্যই সু কি বলছেন, যারা রোহিঙ্গাদের সমর্থন করছেন, তাঁরা সন্ত্রাসবাদীদের সমর্থন করছেন। তাঁর সুরে সুর মিলিয়ে মোদি বলেছেন, ‘দেশের অখণ্ডতা ও আঞ্চলিক ঐক্য বজায় রাখতে সব পক্ষকে সচেষ্ট হতে হবে।’ বলেছেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারত পাশে আছে। মনে রাখতে হবে, নাগা সহ উত্তর–পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন ভারতীয় জঙ্গিগোষ্ঠী মিয়ানমারে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে। তারা প্রচ্ছন্ন সমর্থন পায় চীনের থেকে। তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতের প্রয়োজন মিয়ানমারকে। কাজেই মোদির পক্ষে অন্য কিছু বলা সম্ভব ছিল না। সু কি–ও সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে ভারতকে পাশে পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। সুকি বলেছেন, ভারত ও মিয়ানমার নিশ্চিত করছে যে তাদের দেশে সন্ত্রাসের শিকড় গাড়তে দেওয়া হবে না। প্রতিবেশী দেশে নাশকতা চালানোর জন্য সন্ত্রাসবাদীদের লালনও করবে না অন্য দেশ।

রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা থাকে। প্রত্যেক সরকারকে নিজের দেশের নাগরিকদের রক্ষা করার কথা সবার আগে ভাবতে হয়। এদেশের বোধগয়ায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার পিছনেও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসবাদীরা যুক্ত ছিলেন। কাজেই ভারত রোহিঙ্গাদের আনন্দের সঙ্গে আশ্রয় দেবে, এমন সম্ভাবনা এমনিতেও ছিল না। কিন্তু যে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা সত্যিই নিরপরাধ, তাঁদের তো রক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে মহিলা ও শিশুদের। খবর পাওয়া যাচ্ছে, বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর মাইন পেতে রাখছে মায়ানমারের সেনা। রোহিঙ্গরা যাতে মায়ানমারের ফিরে যেতে না পারেন, সেই কারণেই এই পরিকল্পনা করেছে তারা। আর সেই সীমান্ত পোরেতে গিয়ে মাইনে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে রোহিঙ্গাদের দেহ। সীমান্তের কাছে মাইন পোঁতার বিরোধিতা করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। অথচ মুসলিম দেশ হয়েও তারা রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব নিতে রাজি নয়, কারণ তাঁদের দেশের নিরাপত্তার পক্ষে তা হানিকারক হতে পারে। কাজেই এখন রোহিঙ্গারা কোন দেশে নিরাপদ আশ্রয় পেতে পারেন, তা আন্তর্জাতিক দুনিয়াকে ঠিক করতে হবে। যাঁরা ভেবেছিলেন সেই দায় মোদী নেবেন, তাঁরা অবশ্যই ভুল ভেবেছিলেন।

Developed by DXDasia