
পর্ব ২৬
শীত পুরোপুরি যায়নি। বাতাসে রুকুসুখু ভাব। আবার বেলার দিকটা খানিক গরম। ফেব্রুয়ারির এই সময় বসন্তের আহ্বান হয়ে আসে। তার মধ্যে আসে সরস্বতী পুজোর হলুদ সকালটা। কলকাতার রাস্তা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের পাঞ্জাবি-শাড়ির ভিড়ে মশগুল হয়ে ওঠে। এই পরিবেশে মনে হয় ল্যান্সডাউন রোডে গুরু শ্রী শুভাশিস ভট্টাচার্য (লালিদা নামেই যিনি বিশ্ববিদিত) ও শ্রীমতি সুস্মিতা ভট্টাচার্য-এর কলাক্ষেত্রম নৃত্যপ্রতিষ্ঠানে ছুটে যাই। কী অপূর্ব সরস্বতী পুজো হয় সেখানে প্রতি বছর! সারাদিন অগণিত ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনা লেগেই থাকে।
সুস্মিতাদিকে ‘দিদি’ বলে ডাকলেও যে-মানুষ তার সঙ্গে একবার দেখা করেছে সে জানে যে এই মানুষটার স্নেহে সকলের জন্য মাতৃচ্ছায়া মিশে থাকে। সবাইকে কাছে টেনে নেয় সুস্মিতাদি এমন এক অতি চেনা অথচ প্রতিবারই নতুন এক ভঙ্গিতে মনে হয় যেন কেন আরও আগে তার সঙ্গে দেখা হলো না! তখন একবারও মনে হয় না বাংলার রবীন্দ্রনৃত্যের ঐতিহ্যময় জগতে সুস্মিতাদি একটি নক্ষত্রসম উপস্থিতি। ‘কলাক্ষেত্রম’ যেভাবে রবীন্দ্রনৃত্য তথা সৃজনশীল নৃত্যে আজ প্রায় চল্লিশ বছর ছাত্রছাত্রী তৈরি করে চলেছে তা অভূতপূর্ব। এতগুলো বছর সোজা কথা নয়। আর রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর সৃষ্ট নৃত্যধারাটিকে যেমন নানা দিক থেকে বেঁধে দিয়েছেন তাতে নিজেদের সৃজনশীলতা প্রকাশ করা আরও কঠিন। কীভাবে হলো তবে শুরু?

সুস্মিতাদি বলে ওঠেন, “ভাবলে হয়তো অবাক হবি আমার জীবনের শুরুটা কিন্তু একেবারেই নাচ দিয়ে হয়নি। গান দিয়ে হয়েছিল। সুচিত্রা মিত্রের রবিতীর্থতে আমি গান শিখতাম। কমলা গার্লস স্কুলের ছাত্রী ছিলাম। আর আমার মা, তখনকার সমস্ত মধ্যবিত্ত পরিবারের মায়েদের মতো মেয়েদের নাচ শেখার খানিক বিরোধীই ছিলেন। বরং বাবা সাপোর্ট করতেন। কিন্তু ওই রবিতীর্থেরই হেন কোনও নাচের অনুষ্ঠান ছিল না যেটা আমি করতাম না। রেখা মৈত্র আর তোদের লালিদা যখন রবীন্দ্রনাথের কচ ও দেবযানী করছে আমি হয়তো কম বয়সী দেবযানী করছি। কিংবা আরও নানা নৃত্যানুষ্ঠানে বিভিন্ন চরিত্র। এমতাবস্থায় মা শর্ত দিলেন যে আমাকে যদি নাচ করতে হয় তাহলে নাচে স্ট্যান্ড করতে হবে। তখন রবিতীর্থে অন্য কোনও বোর্ড নয়, রবিতীর্থের নিজস্ব সার্টিফিকেট দেওয়া হতো। আর আমি সে-বার নাচে সেকেন্ড হলাম। মা তো অবাক। বললেল, ফার্স্ট হলি না যে! আমি বললাম তুমি বলেছিলে স্ট্যান্ড করতে। ফার্স্ট হতে মোটেই বলোনি। সেই সেকেন্ড হয়ে আমার গানে ইতি পড়লো আর নাচে হলো অফিশিয়াল হাতেখড়ি।”
সুস্মিতাদির মতো দিকপাল শিল্পীকেও তবে মধ্যবিত্তের নাচ-শিখতে-না-দেওয়া মেয়েদের পংক্তিতে থাকতে হয়েছিল! অবশ্য অবাক করা কথা নয়। বাঙালি মেয়েদের নাচ শেখাকে আজও যে বাঁকা চোখে দেখা হয় না, জোর দিয়ে তা বলা যায় না। বিয়ে হলে সে চাপ আরও বাড়ে বৈ কমে না।
“না, আমার ক্ষেত্রে তা হয়েছে বলি না কিন্তু তার একটা দিক অবশ্যই লালিদা নিজে নৃত্যশিল্পী ছিলেন বলেও হতে পারে। মাত্র আঠারো বছর কয়েক মাস বয়সে আমার বিয়ে হয়েছিল। শ্বশুরবাড়িতে নতুন জীবন। রীতিমতো কাঠের উনুন জ্বেলে রান্না। তখন আবার বাংলা নিয়ে পড়াশোনা করছি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। শঙ্খ ঘোষ, পবিত্র সরকারের কাছে পড়েছি। রবিতীর্থে আমি নাচ শিখতাম শ্রদ্ধেয় গুরু রামগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। এবং তার সঙ্গে ভরতনাট্যম শিখেছি গুরু গোবিন্দন কুট্টি – থাঙ্কমণি কুট্টির কাছে কলামণ্ডলমে। আমি মহুয়া মুখোপাধ্যায়, মালবিকা সেন-দের ব্যাচ। দশ বছর ভরতনাট্যম শিখেছি। আরও একটা কথা জানলে অবাক হবি, আমি যে কত নাটকে অভিনয় করেছি তার ইয়ত্তা নেই! আর নাটক করাতেন কে? ম্যাক্সমুলার ভবনে ডঃ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। অলোকদা তখনও জার্মানি যাননি। হাইনে, রিলকে-সহ নানা জার্মান সাহিত্যিকদের বিভিন্ন লেখার ওপর অভিনয় করতাম। আমার নাটকে অভিনয় নিয়ে যত রিভিউ বেরিয়েছে এক সময়, নাচ নিয়ে আজ অবধি বোধহয় তত বেরোয়নি।”
সত্যি! মানুষের প্রতিভা কতো দিকে বহমান থাকতে চায় কিন্তু সেই মানুষটিকে একটি মাত্র বিন্দুতে ফিরতে হয়। নাচ সুস্মিতাদিকে কখনও ছাড়লো না। স্বামী হলো, সংসার হলো। তার মধ্যেও সুস্মিতাদি নাচের মধ্যে ডুবে থাকলেন। আর সন্তান?

“আমার ছেলে ঠিক নব্বই সালে হলো। আর ওই বছর আমি এমএ ফাইনাল পরীক্ষাও দিলাম। সবরকম পরীক্ষাই কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করেছি, বলতে পারিস! তবে ছেলে আসার পর কয়েকদিন মায়ের বাড়ি থাকার পর যখন শ্বশুরবাড়ি ফিরলাম, তখন আমাদের বাড়ি উনুন বন্ধ হয়ে গ্যাস এল। আরেকটা পরিবর্তন এলো যে আমি ওডিসি নাচের সঙ্গে যুক্ত হলাম। গুরু গিরিধারী নায়েকের কাছে প্রথমে নবনালন্দা স্কুলে তারপর গুরুজির বাড়িতে আমি ওডিসি শিখতাম। গুরুজি হাতে ধরে শেখাতেন। ছেলেকে নিয়েও কতোদিন শিখতে গেছি। আবার গুরুজির বাড়ি লোকজন এলে অনেক সময় রান্নাবান্নাও করে দিয়েছি। এরপর ছেলে যখন একটু বড়ো হলো, আমার মায়ের কাছে থাকতে শুরু করলো, আমি ভুবনেশ্বর যেতে শুরু করলাম বড়ো গুরুজি গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের কাছে। তখন সুজাতাদি মানে গুরুজির পুত্রবধূ আর এখনকার প্রখ্যাত সুজাতা মহাপাত্রও নিজেকে তৈরি করছেন। কলকাতা থেকে আজকের মতো অনেক শিল্পী ঠিক ওই সময়টায় এত যাতায়াত করতেন না। তার আগে হয়তো করেছে। গুরুজি আমাকে নতুন অনেক অভিনয় শেখাতেন। সুজাতাদিও ক্লাস নিতেন। বরং, শিবুদা মানে গুরু রতিকান্ত মহাপাত্র আজকের মতো এত ইনভল্ভড ছিলেন না। কিন্তু গুরুজি প্রয়াত হতে আমি শিবুদার কাছেই আরও অ্যাডভান্সড নৃত্যশিক্ষা পেতে শুরু করি। আমার মাথায় গুরুকৃপা যে সব সময় আছে, এটা আমার পরমপ্রাপ্তি।”
সুস্মিতাদির মতো দিকপাল শিল্পীকেও তবে মধ্যবিত্তের নাচ-শিখতে-না-দেওয়া মেয়েদের পংক্তিতে থাকতে হয়েছিল! অবশ্য অবাক করা কথা নয়। বাঙালি মেয়েদের নাচ শেখাকে আজও যে বাঁকা চোখে দেখা হয় না, জোর দিয়ে তা বলা যায় না। বিয়ে হলে সে চাপ আরও বাড়ে বৈ কমে না।
তবে সুস্মিতাদির স্বামী লালিদাও তো নিশ্চয়ই জীবনের অনেক শিক্ষাই তাকে শিখিয়েছেন। আমি জিজ্ঞেস করি – “দ্যাখ, লালিদা রবীন্দ্রনৃত্যের ঐতিহ্যে ও ইতিহাসে একজন গুরুত্বপূর্ণ পুরুষশিল্পী এ তো কেউ অস্বীকার করবে না। তার থেকেও বড়ো কথা তিনি খুবই আন্ডারস্ট্যান্ডিং স্বামী। আবার কখনও বাচ্চাদের মতোও হয়ে পড়েন। হাতের কাছে সব জোগাড় করে দিতে হয়। ছেলেও শিল্পী। লোকসংগীত তার বিষয়। আবার কলাক্ষেত্রমকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। তবে তোদের লালিদা আর আমার যে একটা যৌথতা সেটা দিয়ে শুধু অনুষ্ঠান নয়, নাচকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া নয় বহু ছাত্রছাত্রী এখানে থেকে পড়াশোনা করেছে। অনেকের বিয়ের ব্যবস্থাও কলাক্ষেত্রম থেকে হয়েছে। লালিদা না থাকলে এগুলো হতো না।”
তবে শুধু লালিদা কেন সুস্মিতাদি নিজেও রবীন্দ্রনৃত্যের ইতিহাস-এ একজন দিকপাল শিল্পী। রবীন্দ্রনৃত্যনাট্য সাহিত্যের এমন কোনও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র নেই যাতে সুস্মিতাদি সাফল্যের সঙ্গে অভিনয় করেননি। কেমন ছিল সেই যাত্রা? – ‘রবিতীর্থের শিক্ষা তো ছিল আবার আমার ব্যক্তিগত রসবোধ, সৌন্দর্যবোধ মিশে থাকতো সেসব অভিজ্ঞতায়। রামদা বলতেন অভিনয় কাউকে শেখানো যায় না। কথাটা ঠিক। তবে এটাও দেখতে হবে অকারণ অন্য শাস্ত্রের নাচ বা অভিনয়ের ইনফ্লুয়েন্স যেন রবীন্দ্রনৃত্যে না এসে পড়ে। কারণ, রবীন্দ্রনৃত্য স্বয়ংসম্পূর্ণ একটা ডিসিপ্লিন। কিন্তু এখনকার সময়ের দাবি মনে হয় অন্যরকম। এখন ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে অনেক কিছু হয়ে উঠতে চায়। তাই মন-প্রাণ দিয়ে যে শিক্ষার ধৈর্য সেটা ধরে রাখার সময় তাদের আছে বলে মনে হয় না। এটা পরবর্তী কালে ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে।”

ঠিক তাই। সুস্মিতাদির প্রতিটি কথাই ঠিক। গুরু সুস্মিতা ভট্টাচার্যদের মতো নৃত্য ব্যক্তিত্বদের কাছে আজকের শিক্ষার্থীদের অনেক কিছু শেখা প্রয়োজন। আরও সময় দেওয়া প্রয়োজন নৃত্যশিল্পে।
বিকেল হয়ে আসে। পুজোর ঘর খালি হতে শুরু করে। সকলেরই বাড়ি ফেরার পালা। বাতাসে ঝিমঝিমে ভাব। একটা বসন্ত-পঞ্চমী চলে গেল। আবার পরের বছর আরেকটা আসবে। তবে রবীন্দ্রনৃত্যের নায়িকা, কমলা গার্লস বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্রীটি প্রায় অর্ধ শতক আগে নৃত্যে হাতেখড়ি নিয়েছিল তার কিন্তু আজও ছটি ঋতুতেই কেবল নাচ। জানি না নৃত্যে তার সেই প্রথম প্রবেশের দিনটাও কোনও সরস্বতী পুজো ছিল কী না!
______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

