
আগামী ৩-৫ ফেব্রুয়ারি কলকাতার মোহরকুঞ্জের বসছে বিশ্ব শান্তির এই গানের আসর। আন্তর্জাতিক সঙ্গীত আসরে এই মুহুর্তে সাড়া জাগানো দলগুল অংশগ্রহণ করবেন এই আসরে
এই শহরের মানুষ বরাবর গান পাগল। মার্গ সংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, বাংলা ব্যান্ড, আধুনিক, পুরাতনী, হিন্দি-বাংলা-ইংরেজি সিনেমার গান কোন কিছুতেই কলকাতার না নেই। ব্লুজ থেকে বাউল সে সমান যত্নে শোনে। ইদানিং লোকগান আর ফিউশন তো ক্রেজ! তবুও কলকাতায় বড় গানবাজনার আসর এখনও চোখে পড়ার মত কম। দু-একটা যা হয় তাতেও টিকিটের দাম শুনে গায়ে ছ্যাঁকা লাগে। প্রবেশ অবাধ, খোলা আকাশের তলায় সবাই একসঙ্গে বসে গান শুনছে অথচ চেহারা চরিত্রে একেবারেই আন্তর্জাতিক এমন আসর আমাদের শহরে ছিল না। বাংলানাটক ডট কম-এর উদ্যোগে ২০১১ সাল থেকে শুরু হওয়া বিশ্বসংগীতের আসর সুফি সূত্র এই অভাব পূরণ করেছিল। শুধু গান শোনাই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীদের সঙ্গে খোলামেলা কথাবার্তা, মত-বিনিময়, তাঁদের নাচ-গান গলা ও পা মেলানো তাদের বাদ্যযন্ত্র এবং তা বাজানোর কায়দা, সে দেশের সংগীতের ইতিহাস জানার সুযোগ করে দিয়েছিল তিনদিন ব্যাপী এই সংগীতের আসর। সিরিয়া থেকে সুইডেন, ব্রাজিল থেকে বুরকিনা ফাসো, আফগানিস্থান থেকে আজারবাইজান, তাজিকিস্তান থেকে টিউনিশিয়ায় এ এক আশ্চর্য সংগীত সফর। বড় অনুষ্ঠানের মঞ্চে তেমন সুযোগ না পাওয়া বাংলার বাউল-ফকিরি গানের গ্রামীণ শিল্পীরা পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের শিল্পীদের সঙ্গে গলা মেলানোর সুযোগ পেয়েছিলেন এই আসরে। এই অভিজ্ঞতা তাদের যে কতটা এগিয়ে দিয়েছে সাম্প্রতিক ইতিহাস তার প্রমাণ। এসব কিছুর হাত ধরে সুফি সূত্র ঢুকে পড়েছে কলকাতার কালচারাল ক্যালেন্ডারে। ৬ বছর পেরিয়ে এবার তারই নাম সুর জঁহা। অনিবার্য কারণবশত গত বছর রবীন্দ্র সদনে হওয়ার পর এবার আবার তা ফিরছে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর উল্টোদিকে মোহরকুঞ্জে।
কার্নিভাল
এটা কি শুধুই গানের আসর? তিন দিনের এই সংগীত সফরের দিকে তাকালে তা কিন্তু মনে হয় না। সুর জঁহা বস্তুত একটা মিউজিকাল কার্নিভাল। এটা শুধু গান শুনলাম আর বাড়ি চলে গেলাম এমন ব্যাপার নয়। সকালে অংশগ্রহণকারী বিদেশী দলগুলির সঙ্গে কর্মশালা, যা কিনা বস্তুত একটা সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান, তার কথা তো আগেই বলেছি। এছাড়াও বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের হস্তশিল্পীরা তাদের পসরা সাজিয়ে বসেন মোহরকুঞ্জের প্রাঙ্গণে। আবার এই উদ্যোগের আরেক প্রান্তে নিজেদের মত করে লোকশিল্পীরা নাচ-গানের আসর বসান। যেমন, এবার থাকবে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, ঝুমুর, বাউল, পটের গান, দার্জিলিঙের লোকনৃত্য, রায়বেঁশে, নাটুর এবং ছৌ নাচ। কি দেখবেন, কি শুনবেন নিজেই ঠিক করুন- তার পর একা, দোকা কিংবা অনেকে মিলে বসে পড়ুন অনুষ্ঠান প্রাঙ্গনে। সুর জঁহা-র দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে বিকেল ৪টা থেকে ৮টা পর্যন্ত চলবে এই লোকশিল্প মেলা ও লোকসাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কার্নিভাল ছাড়া একে আর কিই বা বলা যায়!
কারা আসছে
দিন যত এগিয়ে আসে ততই শহরের সংগীত বৃত্তে ঘুরপাক খেতে থাকে এই প্রশ্ন- এবার কারা আসছেন? সুর জঁহা-য় আসছে সুইডেনের ব্যান্ড এলিকা সোলো রাফায়েল, রাশিয়ার ওটাভা ইয়ো, চেক প্রজাতন্ত্রের ব্রাগাস, ডেনমার্কের ভিরেলাই, সুইডেনের আলে মোলার কোয়াট্রেট এবং পাঞ্জাবের রন্ঝান আলি ও সম্প্রদায়। এছাড়াও মেঠো সুরের গন্ধ নিয়ে থাকছে বাউল গানের দুটি ব্যান্ড- ফোকস অফ বেঙ্গল ও বাউলস অফ বেঙ্গল। ফোকস অফ বেঙ্গল দলটিতে রয়েছে নাগরিক পরিসরে যারা লোকগান চর্চা করেন এমন শিল্পীরা। অন্যদিকে বাউলস অফ বেঙ্গল-এ রয়েছে নদীয়া, বর্ধমান, বীরভূম এবং বাউল-ফকির শিল্পীরা। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ক্ষুদ্র, ছোট মাঝারি ও বস্ত্রশিল্প বিভাগ এবং ইউনেস্কো-র যৌথ উদ্যোগে বাংলার হস্ত ও সাংস্কৃতির শিল্পীদের আর্থ-সামাজিক বৃদ্ধির যে উদ্যোগে নেওয়া হয়েছে এই শিল্পীরা তার আওতায় এসেছেন।
কেমন গান
এই আসর যেন বিশ্বসংগীতের এক ক্যালাইডোস্কোপ। গান এখন কি চেহারা পাচ্ছে, এই আসর তার একটা হদিশ দেয়। পৃথিবীর সুর আর গান এখন এক নতুন দিকে বাঁক নিচ্ছে, নানা পরীক্ষা নীরিক্ষার পর সে আবার ফিরছে ঐতিহ্যে। আবার সেই ঐতিহ্য মানে শুধু কোন গুরুগম্ভীর ব্যাপার নয়, সেখানেও আছে নানা মজা, ত্যারছা চোখে সমাজের দিকে তাকানো। যেমন- সুইডেনের এলিকা সোলো রাফায়েল, রাশিয়ার ওটাভা ইয়ো, চেক প্রজাতন্ত্রের ব্রাগাস। আন্তর্জাতিক সংগীতের আসরে এরা সবাই এখন পরিচিত নাম। নিজের নিজের দেশের ঐতিহ্যবাহী গান এদের পরিবেশনায় একটা বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে। তার সঙ্গে এদের কেউ মিশিয়েছেন হিউমান, তৈরি করেছেন নতুন ধ্বনি, পরিবেশনায় নতুনত্ব তো আছেই। এলিকা সোলো রাফায়েল-এর গান যেন ত্রিধারার এক মিলন। সুইডেন, সেনেগাল আর মেক্সিকোর সাঙ্গীতিক ঐতিহ্য এসে মিশেছে এদের গানে। অন্যদিকে ডেনমার্কের ভিরেলাই পুনরাবিষ্কার করছেন মধ্যযুগীয় সংগীতধারা ও তাদের পরিবেশন পদ্ধতি। সুইডেনের অ্যালে মোলার ব্যান্ড সুইডিশ গ্রামি অ্যাওয়ার্ড। ঐতিহ্যবাহী নানা সাঙ্গীতিক মিশ্রণ ও নানা ধরণের বাদ্যযন্ত্রের অভিনব ব্যবহারের সুবাদে এরা এখন বেশ জনপ্রিয়।
সুর জঁহা, মানে সুরের এই বিশ্বে আপনাদের সবাইকে স্বাগতম। গান মানে শুধু শোনা নয়, বরং তা এক অংশগ্রহণ। সুর আমাদের সবাইকে মিলেমিশে চলতে শেখাক।
