
পোশাক পরতে দেরি হওয়ায় জীপাকে নির্বাসিত করা হল অযোধ্যা পাহাড়ে
একবার গম্ভীর-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কার চরিত্রে অভিনয় করতে আপনার ভাল লাগে? তিনি বলেছিলেন, রাবণ…
ছৌনাচকে যিনি জগৎ বিখ্যাত করেছেন, তিনি গম্ভীর সিং মুড়া। তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল। রোগা লিকলিকে চেহারার গম্ভীরের তাগড়াই গোঁফও ছিল একসময় আলোচনার বিষয়। তাঁর বাবা জীপা সিং মুড়া ছিলেন নামী ছৌ শিল্পী। গুপ্তযুগে যে ছৌনাচ রাজার মন জয় করত, রানিরা অন্দরমহলের বাইরে এসে নাচ দেখতেন, আদিম অধিবাসী শিল্পীরা খাসমহলে প্রবেশের ছাড়পত্র জোগাড় করতেন, তারই পরম্পরা বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন জীপা। কিন্তু বেশি সে সুখ সয়নি তাঁর। শারীরিক কসরত করে একটু চাল, ক’আনা পয়সা, চালের ক্ষুদ এসব নিয়ে ফিরতেন বাড়িতে, তাতে সংসার চলত। গম্ভীরের বয়স যখন আড়াই বছর তখন তাঁর বাবা মারা যান। বাবার কাছ থেকে তিনি কোনো শিক্ষা পাননি। তবে বাবার ছাত্র মধুভাট রায়ের কাছে তিনি ছৌনাচে প্রাথমিক পাঠ নিয়েছিলেন, তারপর ইতিহাস।
বাঘমুণ্ডীর রাজা তখন মদনমোহন। রাজ পরিবারে ছৌনাচের আয়োজন করা হয়েছে, বাংলা জুড়ে তখন জীপার নাম। গরীব শিল্পী। রাজা বসে আছেন আসরে, জীপার একটু দেরি হয়েছে পোশাক পরতে, জীপাকে দেওয়া হল নির্বাসন। তখন থেকেই অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে চড়িদায় বাস গম্ভীরদের, জঙ্গল কেটে বসবাসের জায়গা তৈরি করেছিলেন। এরপর আর বেশিদিন বাঁচেননি জীপা। তবে তাঁর ছোট ছেলে বাবু সিং মায়ের কাছে গল্প শুনছিলেন, মামার বাড়িতে থাকার সময়। বাবার মৃত্যুর পর বাবু সিংদের সংসার চলে না তখন মা সন্তানদের নিয়ে চলে গিয়েছিলেন বাপের বাড়ি।
বাবু সিংয়ের গম্ভীর হয়ে ওঠার কাহিনী আরও রোমহর্ষক। তখন বয়স মাত্র পনের, বাঘমুণ্ডীর রাজা তখন ক্ষেত্রমোহন। রাজদরবারে ছৌনাচের আসর বসেছে। চৈত্র সংক্রান্তিতে প্রতিবছর ছৌনাচ দেখাতেন শিল্পীরা। রাজার কাছ থেকে ওই একদিনে যা পেতেন তাই দিয়ে প্রায় সম্বৎসর সংসার চলত। রাজার ঘনিষ্ঠ গুলাম মহম্মদ খান রাজার কাছে এসে বললেন, হুজুর, জীপার পনের বছরের ছেলে নাচ দেখাতে চায়। বাবু সিংয়ের শীর্ণ বস্ত্র, মলিন বসন, রোগা চেহারা। বাবার পুরানো তলোয়ার। রাজার সম্মতিতে বাবু সিং নাচ দেখালেন। একক নৃত্যে ১০০টা ভল্ট দিলেন। রানির অন্দরমহলে ডাক পড়ল। বাবু হয়ে উঠলেব গম্ভীর। অর্থাৎ বিধবার ছেলে। এরপর আর গম্ভীরকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তার পরেরটা ইতিহাস।
স্বদেশে, বিদেশে গম্ভীর। কখন অর্থের জন্য কারও কাছে হাত পাতেননি। তবে তিনি বলতেন, পেটে ভাত না থাকলে ছৌ হয় না। বিদেশে নাচ দেখিয়ে তিনি যা আয় করেছিলেন তা দিয়ে সামান্য জমি কিনেছিলেন। তাঁর সন্তানদের আজও এই জমি সম্বল। তিনি অ্যাকাদেমি পেয়েছেন, পদ্মশ্রী পেয়েছেন, অগণিত মানুষের ভালবাসা নিয়ে রাতের পর রাত আসর মাতিয়েছেন। কখনও সেজেছেন কংস, কখনও দুর্গা, কখনও মহিষাসুর। তাঁর মহিষাসুর বধ, অভিমন্যু বধ, কীরাত অর্জুন পালা, হরধনু ভঙ্গ, মহীরাবণ বধ, রামচন্দ্রের ১০৮ নীলপদ্ম মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে। একবার গম্ভীর-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কার চরিত্রে অভিনয় করতে আপনার ভাল লাগে? তিনি বলেছিলেন, রাবণ। সম্প্রতি ছৌ-এর মুখোশ জিআই তকমাও পেয়েছে। এই মুখোশের প্রচলন করেন গম্ভীর সিং মুড়া-ই।
পশু শিকার আদিবাসীদের কাছে যৌবন আর বীরত্বের প্রতীক। প্রতিবছর তাই শিকারে বের হন আদিবাসী মানুষ। গম্ভীর বলেছেন, যে বয়সে তিনি নাচ দেখাতে শুরু করেছিলেন তা ছিল বীরত্ব প্রকাশের সময়, ছৌ আসলে বীররসে ভরা। এমনই এক আসরে তার রাবণ চরিত্র দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন চিন্তামণি মুড়া। তারপর প্রেম, বিয়ে। ২০০২ সালের ১০ নভেম্বর কলকাতা থেকে চিকিৎসকের কাছ থেকে ফেরার পথে ট্রেনে মৃত্যু হয় প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর। তবে ছৌকে তিনি জনপ্রিয় করে রেখে গেছেন।
পুরুলিয়ার টাঁড় জমি জন্ম দিয়েছে আরও এক প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর। তিনি ঝুমুর সম্রাট ছলাবত মাহাত। কী সাধারণ তাঁদের জীবনযাত্রা! গান গেয়ে জগৎ মাতিয়ে দিয়েছেন, অথচ প্রচারের আলোয় আসতে চাননি। গম্ভীর আর ছলাবত আর নেই। কিন্তু তাঁদের ধারা রয়ে গেছে।
