
জ্যোতিবাবুকে সোমনাথ বলেছিলেন, দলকে অস্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী হন
অবশেষে বোমাই ফাটালেন প্রাক্তন সিপিএম নেতা এবং প্রাক্তন অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। সাংবাদিক অরুন্ধতী মুখোপাধ্যায়কে এক সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি তিনি বলেছেন, প্রকাশ কারাত সিপিএমের ক্ষতি করেছেন। ২০০৭ সালে প্রকাশ কারাত তাঁকে রাষ্ট্রপতি হতে দেননি। তাঁর বাধাতেই ভারত এক জন বাঙালি প্রধানমন্ত্রী থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, তিনি এবং আরও কয়েক জন (তাঁদের নাম বলেননি) সেই সময় জ্যোতি বসুকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, সব দলের সমর্থন যখন আছে, জ্যোতি বসু যেন সিপিএমের সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করে প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। জ্যোতি বসু অবশ্য অনুগামীদের সেই অনুরোধ রাখেননি। কী বলেছেন সোমনাথবাবু একবার শুনে নেওয়া যাক। সোমনাথ বলেন, ‘এখনও কাউকে বলিনি। ২০০৭ সালে শরদ যাদব আমার কাছে এসেছিলেন। আমি তখন লোকসভার স্পিকার। শরদ বললেন, ‘আমরা আপনাকে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চাই।’ কংগ্রেস থেকে শারদকে পাঠানো হয়েছিল বলে জেনেছিলাম। জেডিইউ, ডিএমকে, বিজেডি, অকালি দল আমাকে সমর্থন করবে বলেছিল। এমনকী, শিবসেনাতেও আমার দু’জনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল। আমি শারদকে বলেছিলাম, ‘আমাকে নয়, দলকে বলতে হবে।’ উনি প্রকাশ কারাতের সঙ্গে কথা বলেন। সেবার বাধা না–দিলে বাংলা আরও একজন বাঙালি রাষ্ট্রপতি পেত। বিজেপি কাউকে দাঁড় করাবে না বলে ঠিক করেছিল। সেক্ষেত্রে দল আমাকে দাঁড় করালে রাষ্ট্রপতি পদে ভোটাভুটি হত না। প্রকাশ কারাত ‘না’ বলার পরেও নীতীশ কুমার আমাকে ৭–৮ বার ফোন করেছিলেন’।
ইউপিএ সরকারের উপর থেকে বামেদের সমর্থন প্রত্যাহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন,‘প্রকাশই তখন পার্টির দায়িত্বে। পরমাণু চুক্তি কেন্দ্র করে তখন সিপিএম ইউপিএ থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করেছিল। আমাকে উনি বলেছিলেন, সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা জানিয়ে সংসদে ভোট দিতে হবে। আমি তখন স্পিকার। আমি বলেছিলাম, স্পিকার কোনও পার্টির হয়ে কাজ করেন না। এখন তো দেখি, অনেক স্পিকার মুখ্যমন্ত্রীর পাশে দাঁড়ান। রাজনৈতিক সভায় যান। আমি এটা করিনি। আমি প্রকাশ কারাতকে জানাই, স্পিকার ভোট দেন না। আমাকে সব পার্টি সমর্থন করে। ২০০৮–এ আমাকে দল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরমাণু চুক্তি যে আমি সমর্থন করি, তা নয়। কিন্তু সেই ইস্যুতে ইউপিএ সরকার থেকে সমর্থন তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল’।
সোমনাথ বলেন, ‘ উনি (প্রকাশ কারাত) পার্টির ক্ষতি করেছেন। তখন ইউপিএ সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার না–করলে আমাদের অবস্থা অনেক ভাল হত। জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হতে না দেওয়াটা কত বড় ভুল, তা আজও সবাই মানেন। আর একজন বাঙালিকেও উনি রাষ্ট্রপতি হতে দেননি! আমি তো শুনেছি, ইউপিএ থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের সময় দিল্লিতে মাত্র ৫ জন পলিটব্যুরো সদস্য হাজির ছিলেন। কারাত ফোনে অন্য সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে নিজে সিদ্ধান্ত নেন। সেভাবে বৈঠক হয়নি। ভোটাভুটিও হয়নি। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য’।
সোমনাথবাবু দলের কারাত লবি সম্পর্কে এই মন্তব্য ঠিক সেদিনই করছেন (২৩জুলাই), যেদিন দিল্লিতে দলের পলিটব্যুরো বাতিল করে দিচ্ছে সীতারাম ইয়েচুরিকে কংগ্রেসের সমর্থনে রাজ্যসভায় পাঠানোর প্রস্তাব। ১১-৫ ভোটে বাতিল হয়ে যায় এই প্রস্তাব। কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকেও এই প্রস্তাব খারিজ ওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের একটি সংবাদমাধ্যমের উদ্যোগে ইয়েচুরির হাতে সেরা সাংসদের পুরস্কার তুলে দিয়েছেন বিদায়ী উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি। সেই ছবিকে ব্যবহার করে সীতারামের তরুণ সমর্থকরা একটি পেজ তৈরি করে প্রচার শুরু করেছেন, ‘কেন্দ্রে যখন নাথুরাম, সংসদে চাই সীতারাম’। যদিও তাতে ক্রমাগত লাইক আর কমেন্ট পড়ছে, কিন্তু প্রকাশ অবশ্যই এটা আটকে দিতে সফল হবেন বলে সিপিএমের অনেকেরই মত। সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় তাঁর দেওয়া সাক্ষাৎকারে সীতারাম সম্পর্কে কী বলেছেন দেখে নেওয়া যাক।
সোমনাথ: নিশ্চয়ই! সীতারাম একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। খুব ভাল সাংসদ। দলের স্বার্থেই তাঁকে আবার মনোনয়ন দেওয়া উচিত। সীতারামকে না–পাঠালে দলের অন্য কেউ রাজ্যসভায় যেতে পারবেন না। তবে আমার আশঙ্কা, এ ব্যাপারেও বাধা দেওয়া হবে। জ্যোতি বসুকে এভাবেই বাধা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে দেওয়া হয়নি। এখনও মানুষ সেকথা দুঃখের সঙ্গে মনে রেখেছেন। জ্যোতি বসুকে আমরা কয়েকজন বলেছিলাম, অন্য দলের সমর্থন যখন আছে, তখন তিনি যেন আমাদের দলের কথা না–শুনে প্রধানমন্ত্রীর পদ নেন। কিন্তু তিনি দলের কথা ফেলতে রাজি হননি।
(পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছে ২৩ জুলাই আজকাল রবীবাসরীয়তে)
