সিঙ্গুরের চুক্তি বেআইনি ঘোষণা করল আদালত

'সিঙ্গুরে' মেঘ কাটলো । ২০০৬-র বুদ্ধবাবুর আনন্দের কারণ বেআইনি বলে ঘোষণা হল

২০০৬ সালের ১৮ মে, ডব্লিউবিআইডিসি(WBIDC) -র সঙ্গে টাটার চ্যুক্তি মোতাবিক চাষীদের জমি, কারখানা করার জন্য হস্তান্তর করা হয়। এই দিনই ২৩৫ আসন নিয়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ‘আরও উন্নতর বামফ্রন্ট সরকার’-এর যাত্রা শুরু হয়েছিলো। বুদ্ধবাবু তাঁর প্রথম দিনের ক্যাবিনেট মিটিংয়ের পর সাংবাদিকদের বলেছিলেন- ‘আমার জীবনে আজ সব থেকে আনন্দের দিন।’ কমিউনিস্ট পার্টিতে সদস্যপদ পাওয়ার দিনের থেকেও চাষীদের জমি জোড় করে নিয়ে শিল্পপতির হাতে তুলে দেওয়াটা ওঁনার কাছে আরও বেশী আনন্দের দিন বলে মনে হয়েছিলো!!
 
তার ঠিক পাঁচ বছর পর ২০১১ সালের ২০ মে। নির্বাচনে জেতার পর শপথ নিয়ে মহাকরণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম ক্যাবিনেট মিটিং-এর প্রথম সিদ্ধান্ত, সিঙ্গুরে অধিগৃহীত জমি কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তার পরেও নানা দিকে সিঙ্গুরের জল গড়িয়েছে। অবশেষে গত ৩১ অগস্ট সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের দুই বিচারপতির রায়, বামফ্রন্ট সরকারের ওই জমি অধিগ্রহণ অবৈধ ছিল। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ, ১২ সপ্তাহের মধ্যে ওই জমিকে চাষযোগ্য করে কৃষকদের ফিরিয়ে দিতে হবে। জমি অধিগ্রহণের যে সব নিয়ম আইনে বলা আছে, তার অনেকগুলিই অমান্য করা হয়েছিল সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণের সময়, এই মত দুই বিচারপতির। রায়ে বলা হয়েছে, জমিই যেহেতু এই সব কৃষকদের জীবিকা ছিল, তাই জমি নিয়ে নেওয়ায় কার্যত তাদের জীবিকাচ্যুত করা হয়েছিল। ফলে জমির জন্য চাষিরা যে ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন, জমি ফেরত পেলেও ওই টাকা তাদের আর ফেরত দিতে হবে না। আর যারা অনিচ্ছুকচাষি, জমি হাত ছাড়া হওয়া সত্ত্বেও যারা টাকা নেননি। তাদের জন্য সরকারের কোষাগারে সেই টাকা গচ্ছিত আছে, ওই টাকা তারা পাবেন। টাটাদের কোনও ক্ষতিপূরণের কথা ওই রায়ে বলা হয়নি।

এই রায়ের পর সিঙ্গুরে উৎসব শুরু হয়েছে। অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছেন, ওই জমিতে টাটারা অনেক কিছু নির্মাণ করে ফেলেছিল, ফলে জমি আর চাষযোগ্য নেই। ফলে জমি ফেরত পেয়ে চাষিরা কী করবেন? এই প্রশ্নে সিঙ্গুরের এক চাষি বলেছেন, পাহাড় ভেঙে যদি চাষিরা চাষ করতে পারে, এটাতো কিছুই না। হয়তো সময় লাগবে একটু, কিন্তু সিঙ্গুরের জমিতে চাষই হবে।
শিল্পায়নের জন্য কাদের জমি নেওয়া হয়? কোনও বড় শিল্পপতি যদি সরকারকে বলে তারা পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে যাদবপুরে ২০০০ একর জমি চান। কোনও সরকারের পিতারও সাহস হবে না হ্যাঁ বলতে। জমি সাধারণত নেওয়া হয় দুর্বল পিছিয়ে থাকা মানুষের। অথবা যে এলাকার উপরে সরকারি দলের মাফিয়াসুলভ নিয়ন্ত্রণ আছে। রাজারহাটে জমি অধিগ্রহণের বড় অংশই গায়ের জোরে হয়েছিল। সে সময় সাংবাদিক হিসেবে সাধারণ মানুষের ডাকে বেশ কয়েকবার সেই দখলের সরকারি রাজনীতি দেখতেও গিয়েছি। কিন্তু তখনও এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো কোনও রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। উপনগরীর প্রয়োজন মেনে নিয়েও বলতে হয়, গায়ের জোরে এই কাজ কোনও সভ্য সমাজে চলতে পারে না।

আরও একটা কথা এখানে বলা দরকার। সরকার যতই ভোটে জিতুক, তাকে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে না। কারণটা বলা যাক। ২০০৯ সালের মহাকরণের ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের হিসেব অনুসারে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পূর্ববর্তী এ রাজ্যের জমি অধিগ্রহণের ছবিটা কেমন ছিল এক বার দেখে নেওয়া যাক। সরকারি হিসেব অনুযায়ী ১২ হাজার একর জমির মালিককে সরকার জমি অধিগ্রহণের পর ক্ষতিপূরণের একটা পয়সাও মেটায়নি। এবং এই হিসেব পূর্ণাঙ্গ নয়। আংশিক। বহু বছর ধরে রাস্তা, ঘাট, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, সেতু, জলপ্রকল্ক, রেললাইনের জন্য এই সব জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ জনস্বার্থে। কিন্তু জমি দাতারা ক্ষতিপূরণ পেলেন না। কেন তারা সরকারকে বিশ্বাস করবেন? ৫০-এর দশকে চিত্তরঞ্জনে রেল ইঞ্জিন তৈরির কারখানার জন্য সাঁওতালদের জমি দখল করতে গিয়ে বাধা পায় সরকারি কর্মীরা। পুলিশের গুলিতে ৭ জন সাঁওতালের মৃত্যু হয়েছিল। তারা কোনও ক্ষতিপূরণ পেয়েছিল কিনা তার কোনও রেকর্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি।

উন্নয়নের জন্য জমি অধিগ্রহণে সব থেকে বেশি জমি যে সব থেকে পিছিয়ে থাকা মানুষদের থেকেই বেশি নেওয়া হয়, সরকারি রিপোর্টেও তা স্বীকার করা হয়েছে। " Report of an expert group to planning commission: Developmental challenges in extremist affected areas, 2008"- এ বলা হয়েছে, " An official database of persons displaced/affected by projects is not available. However some unofficial studies particularly by Dr. Walter Fernandes, peg this figure at around 60 million for the period from 1947 to 2004, involving 25 million ha, which includes 7 million ha of forest and 6 million ha of other common property resources (CPR). Whereas the tribals  constitute 8.08 % of countries population, they are 40% of the total displaced or affected persons by the projects. Similarly atleast 20% of the displaced/ affected are Dalits and another 20% are OBCs. The settlement records is also very dismal. Only a third of the displaced persons of planned development have been resettled."

লক্ষণীয়, এই সব এলাকাতে যে সশস্ত্র আন্দোলন বেড়েছে তার পেছনে জমির এই কারণ স্বীকার করে নিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারও। দুর্বল গণতন্ত্রে যা সম্ভব, তুলনায় উন্নত গণতন্ত্রে তা সম্ভব নয়। সিঙ্গুরকে শুধু বামপন্থীদের পারাজয় হিসেবে দেখলে খুবই ছোট করে দেখা হবে। সিঙ্গুর আসলে নাগরিক অধিকারের জয়। এমন ঐতিহাসিক জমি ফেরতের নজির আমাদের দেশে অতীতে নেই।

দশ বছর আগে ১৮মে, ‘জনস্বার্থে’-র কারণে অনিচ্ছুক চাষীদের কাছ থেকে জমি বেআইনি ভাবে কেড়ে নিয়ে বুদ্ধবাবু তাঁর জীবনের সব থেকে আনন্দের দিন ঘোষণা করেছিলেন। আর ১০ বছর পর ৩১ অগস্ট বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অক্লান্ত সংগ্রাম এর ফলে সেই অনিচ্ছুক চাষীরা জমি ফিরে পেলেন এবং তিনি সাংবাদিকদের ডেকে বললেন- ‘আজ আমার খুব আনন্দের দিন।’

 

Developed by DXDasia