
পর্ব ২৯
বসন্তের ডালি সাজিয়ে ফুলওয়ালি আসে। শ্যামলী গাইয়ের দুধ নিয়ে আসে দইওয়ালা। সোনালি তারে মোড়া চুড়ি নিয়ে আসে চুড়িওয়ালা। ভিড় করে বিকিকিনি হয়। কিন্তু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ে যখন কাছে এসে কিনতে চায় কিছু, গ্রামের অন্যান্য মেয়েরা ছিটকে সরে যায়। বলে, ‘ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো ছি/ও যে চন্ডালিনীর ঝি!’ চন্ডালিকা প্রকৃতি দুঃখ পায়। ঠাকুরের কাছে অনুযোগ জানায়। ১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথ সামাজিক অস্পৃশ্যতা ও নারীবাদ নিয়ে এক অপূর্ব টেক্সট তৈরি করেছিলেন যার নাম ‘চন্ডালিকা’। যে-কোনও সাহিত্যই যখন সামাজিক বৈষম্যের কথা বলে তখন বুঝতে হয় লেখক আসলে এসব জিনিস সমাজ থেকে মুছে গিয়ে সমাজে সমানতা ও ভারসাম্য আসুক, সেটাই চাইছেন। কিন্তু আজ থেকে ছিয়াশি বছর আগে রবীন্দ্রনাথ আমাদের সমাজের যে কর্কটরোগ চিহ্নিত করেছিলেন চন্ডালিকার মধ্যে দিয়ে, তা থেকে নিরাময় খুব একটা পেয়েছি বলে মনে হয় না।

শর্মিলাদি (শর্মিলা বসু) হেসে ওঠেন। বলেন, “খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দুটি ধরলেন। সামাজিক অস্পৃশ্যতা বলতে আগে বুঝতাম একে অপরকে না-ছোঁওয়া। আইন করে সেটা বন্ধ হলেও বাঙালি সমাজে সেসব এখনও আছে খুব সূক্ষ্মরূপে। যেমন ধরুন আপনার একটা ‘বিশেষ’ প্রতিভাসম্পন্ন শিশু আছে। এই বিশেষ প্রতিভা ব্যাপারটা গালভরা। লোকে আসলে প্রতিবন্ধীই ভাবে। সমাজ যে তথাকথিত ‘নর্মাল’-এর ধারণায় চলে তা থেকে খানিক বিচ্যুত হলেই সমাজ নিজের চলার পথে সেই বাচ্চাটিকে রাখে না। সূর্যর আজ বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। এই কতগুলো বছর সত্যিকারের প্রতিভা সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও সূর্যকে মেইনস্ট্রিম খুব সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে তা নয়। আবার অযাচিত এমন অনেক মানুষ পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন যাঁদের কথা আগে ভাবতেই পারিনি। আর এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহিলা হিসেবে আমার প্রাত্যহিক যুদ্ধের কাহিনি। তবে এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় পুরুষের সাহচর্য নারী হয়তো পায় না কিন্তু আমার সঙ্গে তা হয়নি। সূর্যর বাবা আমার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিক্ষণ ছিলেন। যদিও ২০১৯-এ ওঁকে হারাই।”
আমি শর্মিলাদির কথা শুনছি। শর্মিলা বসু সারা ভারতবর্ষেই বিশেষ প্রতিভাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে কাজ করার এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর সন্তান সূর্য ডাউনসিন্ড্রোমযুক্ত মানুষ এবং বাংলার নৃত্যশিল্পে বহু মানুষের অনুপ্রেরণা। সূর্য জাতীয় স্কলারশিপ বিজেতা। আজ সে দেশের দশের একজন। কিন্তু প্রথম দিন যেদিন জানতে পারা গেল সূর্যর ডাউনসিন্ড্রোম আছে সেদিন কী হয়েছিল? শর্মিলাদি এবারেও অল্প মিঠে হাসি হাসেন। বলেন, “সূর্যর যখন ডাউনসিন্ড্রোম ধরা পড়ে তখন ওর বয়স এক বছর। আমি যে খুব ভেঙে পড়েছিলাম তা নয়, কারণ ডাউনসিন্ড্রোম সম্বন্ধে আমার একটা প্রাথমিক ধারণা ছিল। আমাদের পরিবারে এমন একটি শিশুকে তার আগে আমি দেখেছিলাম। কিন্তু তাও আমরা মধ্যবিত্ত মা-বাবা, তাতে একটা প্রচণ্ড স্ট্রেস বেড়ে যাওয়াটা ছিলই। তবে তখন বেঁচে ছিলেন ডঃ শিশির বোস। উনি আমাকে এবং সূর্যর বাবাকে বুঝিয়েছিলেন। তাতে ডাউনসিন্ড্রোম সংক্রান্ত অনেক কিছু আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। সেই সময় আমরা লক্ষ্ণৌতে।”
সূর্যর আজ বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। এই কতগুলো বছর সত্যিকারের প্রতিভা সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও সূর্যকে মেইনস্ট্রিম খুব সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে তা নয়। আবার অযাচিত এমন অনেক মানুষ পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন যাঁদের কথা আগে ভাবতেই পারা যায়নি। আর এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহিলা হিসেবে শর্মিলা বসুর প্রাত্যহিক যুদ্ধের কাহিনি।
আর সূর্যর নাচে আসা? শর্মিলাদি যোগ করেন, “আমরা যখন কলকাতায় ফিরি সূর্যকে মমতাশঙ্করের নৃত্যবিদ্যালয় উদয়ণ-এ ভর্তি করি। সব তথাকথিত ‘নর্মাল’ ছেলেমেয়েদের মধ্যে নব্বইয়ের দশকে সূর্য ছিল একমাত্র বিশেষ প্রতিভাসম্পন্ন শিশু। মমদিই প্রথম আমাদের ধরিয়ে দেন সূর্য নিজের মতো নাচ তৈরি করতে পারে! এবং ওইখানে ওদের দেখে দেখে আমিও, জানেন, অনেক নাচ তুলতাম। এবং আমি যে গানের লোক ছিলাম, গোখেল কলেজ থেকে ভূগোলে গ্র্যাজুয়েট; ছেলের সঙ্গে থাকতে থাকতে নাচের প্রতি একটা অদ্ভুত ভালো লাগা তৈরি হলো। তার কারণ নাচই যে তখন আমার ছেলেটাকে একটা অন্যরকমভাবে বিকশিত হবার সুযোগ দিচ্ছিল।” আমি অবাক হয়ে শুনি। এ-গল্প আমাদের সকলের জানা দরকার। জিজ্ঞেস করি, ‘তারপর?’
শর্মিলাদি বলে চলেন, “তারপর প্রীতিদি মানে মণিপুরি নৃত্যের কিংবদন্তি প্রীতি প্যাটেল সূর্যর নাচ দেখে প্রস্তাব দেন তাঁর স্কুল অঞ্জিকাতে যোগ দেবার। সেটাই করি। সূর্য নাচে আরও অনেকটা সড়গড় হয় এবং প্রীতিদির কাছ থেকেই সে ন্যাশনাল স্কলারশিপ পায়।” আর নাচের পাশাপাশি? “নাচের ঠিক পাশাপাশি নয় মানে সূর্যর সঙ্গে, নাচের সঙ্গে থেকে বলতে পারেন আমারও একটা পরিবর্তন হলো। আমিও নাচ শেখা শুরু করলাম এবং প্রীতিদির অঞ্জিকাতে আমি বহুদিন শিক্ষকতা করছি। আমার কাজ ছিল: নতুন যেসব বিশেষ প্রতিভাসম্পন্ন ছেলেমেয়েরা নাচ শিখতে আসত তাদের আমি প্রথমে একটু তৈরি করে তারপর সিনিয়র-ব্যাচ অর্থাৎ সূর্যদের ক্লাসে ট্রান্সফার করতাম। এরও অনেক পর আমার নিজস্ব সংস্থা অন্বেষা-দ্য কোয়েস্ট শুরু করি। একেবারেই নিজে। কিন্তু আসতে আসতে বহু মানুষ তাদের বিশেষ প্রতিভাসম্পন্ন সন্তানদের নিয়ে আমার সংস্থায় আসতে শুরু করেন। প্রথমে আমি একেবারেই একা সব করেছি তারপর অন্যান্য অভিভাবকরা। তবে সব থেকে বেশি পাশে থেকেছেন আমার স্বামী। উনি খালি বলতেন বাড়ির সব কাজ ফেলে আগে ছেলের সঙ্গে থাকো। এমনকি কতো কাজ বিশেষত বাড়ির, উনিই করে নিতেন। এটা আমি নিজের সৌভাগ্য মনে করি। নাচ তো অন্বেষাতে হতই তারপর গান চালু করি। এবং একটা সময় রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে একযোগে হয়ে ভোকেশনাল ট্রেনিঙের ব্যবস্থাও হয়েছে অন্বেষাতে। ধূপকাঠি বানানো হতো। আমি একাই বড়োবাজার ঘুরে ঘুরে সব সরঞ্জাম, কাঁচামাল জোগাড় করতাম। কিনতাম। কখনও বিফলমনোরথ হইনি। এখন যখন অনেক অভিভাবক ভেঙে পড়েন, মায়েরা কাঁদেন তখন তাদের বোঝাই সবার জীবন এক রকম কাটে না। একেক জনের জীবনে চ্যালেঞ্জ একেক রকম। তবে আমার জীবনটাকে আদর্শ না মানলেও জানবেন নৃত্যশিল্পে সূর্যর যে সাফল্য তা কিন্তু বিশেষ প্রতিভাসম্পন্ন সকল ছেলেমেয়েদের কাছেই একটা দুরন্ত অনুপ্রেরণা হতে পারে। হয়েছেও। দূরদর্শনে আমাদের মা-ছেলের সাক্ষাৎকার হবার পর কতো না ছেলেমেয়ে, তাদের মা-বাবা খোঁজ করতে করতে অন্বেষা-দ্য কোয়েস্ট-এ এসে পৌঁছেছেন। এমনকি একটি বেসরকারি গণমাধ্যম থেকে আমার জীবনসংগ্রামকে যখন পুরস্কৃত করা হলো তখনও বহু মা-বাবারা অনুপ্রাণিত বোধ করেছিলেন।”

শর্মিলাদির জীবন আমাদের সকলের আদর্শ। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও কখনও তিনি হেরে যাননি, পিছিয়ে পড়েননি। তথাকথিত ‘নর্মাল’ সমাজের চোখে চোখ রেখে বহু বিশেষ প্রতিভাসম্পন্ন ছেলেমেয়েদের, তাদের অভিভাবকদের সুস্থির জায়গা তিনি লড়ে তৈরি করেছেন।।
সত্যিই তাই। শর্মিলাদির জীবন আমাদের সকলের আদর্শ। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও কখনও তিনি হেরে যাননি, পিছিয়ে পড়ননি। তথাকথিত ‘নর্মাল’ সমাজের চোখে চোখ রেখে বহু বিশেষ প্রতিভাসম্পন্ন ছেলেমেয়েদের, তাদের অভিভাবকদের সুস্থির জায়গা তিনি লড়ে তৈরি করেছেন। কিন্তু কী এর ভবিষ্যৎ? শর্মিলাদি উদাস হতে হতেও হন না। আবারও মুখে হাসি এনে সুরেলা কণ্ঠস্বরে বলেন, “গুড কোয়েশ্চেন! আসলে কী জানেন মা-বাবারা ছেলেমেয়েদের জন্ম দেন, তারা বড়ো হয় এবং কোথাও এই অভিভাবকদের মনে একটা আশা তৈরি হয় যে তাঁদের বৃদ্ধ বয়সে সন্তানরাই দেখবে। হয় তো? কিন্তু বিশেষ প্রতিভাসম্পন্ন ছেলেমেয়েই বলুন কিংবা প্রতিবন্ধী; এইসব সন্তানদের মা-বাবাদের যে চাহিদা সেটা তো পূরণ হয় না। আবার এমনও শোনা যায় কী হবে এদের জন্য এতো করে? এতো লড়ে? কী রিটার্ন আসবে? কিন্তু আমার স্বামী বলতেন দ্যাখো ওদের তো কোনও দোষ নেই। ওরা আমাদের সন্তান, আমরা পৃথিবীতে এনেছি। সুতরাং, আমাদের কর্তব্য আছে। আরেকটা কথা জানবেন, সূর্যর মতো ছেলেমেয়েরা না হয় মা-বাবার প্রতি তথাকথিত কর্তব্য পালন করতে অপারগ, কিন্তু যাদের সমাজ নর্মাল বা সুস্থ বলে তারা কতোটা বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি যত্নশীল? যদি সত্যিই তারা খুব কর্তব্যপরায়ণ হতো তবে কি সমাজে মুড়িমুড়কির মতো বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠতো? সব থেকে বড়ো কথা কি জানেন? সমাজের থেকেও পরিবার জিনিসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি সমাজটাকে একটা পরিবার ভাবি তাহলে সব সদস্যের প্রতিই আমাদের স্নেহ-ভালোবাসা বজায় থাকে। আমাদের দেশে কজন প্রতিবন্ধী মানুষ আছেন? দশ শতাংশ? তো, বাকি নব্বই শতাংশ মানুষ তাদের দেখে রাখতে পারবো না? কিংবা যেখানে এই মানুষগুলো এত গুণী তখন তাদের জন্য আরও কেন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারবো না? আমার সব থেকে কখন ভালো লাগে জানেন? যখন এই ছেলেমেয়েগুলো নাচের পোশাকে মঞ্চে উড়ে বেড়ায় তখন আমার এই বুকটা শান্তিতে ভরে যায়। মা হিসেবে, নারী হিসেবে, কর্মী হিসেবে নিজেকে একটু হলেও সফল মনে হয়।”
আজ আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবস। কত নারীর সংগ্রামী জীবনের খোঁজ আমরা পাই না। আবার কত জন চোখের সামনেই থাকেন এতটুকু উচ্চকিত উপস্থিতি ছাড়া। শ্রীমতী শর্মিলা বসু তেমনই এক নারী, যাঁর জীবনযুদ্ধ আমাদের প্রাত্যহিক শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা। তিনি সূর্যর মতো বিশেষ প্রতিভাসম্পন্ন মানুষ ও একজন সফল নৃত্যশিল্পীর রূপকার।
______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

