কেলুচরণ মহাপাত্রের ছাত্রী থেকে ঋতুপর্ণ ঘোষের নৃত্য প্রশিক্ষক : বর্ণময় শর্মিলা বিশ্বাস


পর্ব ৩৬

কালে আবহাওয়া আগুন ছিল। বিকেলটা হঠাৎ এত নরম হয়ে যাবে, মৃদু বাতাস বইবে ধীরে- সেটা ভাবা যায়নি। লর্ডসের মোড় থেকে নাক বরাবর ঢুকে প্রথম তিন মাথার রাস্তাটা বেশ আলোকিত। আশপাশের ক্যাফেগুলোর আলো রাস্তাটাকে কাঁচা হলুদ রং দিয়েছে। ওখান থেকেই শুনতে পাচ্ছি বোল আর ঘুঙুরের শব্দ। আমি সেই শব্দের ইশারায় ছুটে যাই। থামি ওডিসি ভিশন অ্যান্ড মুভমেন্ট সেন্টারের দরজায় এসে। বেলে চাপ দিলে যিনি দরজা খুলে দেন তিনি অয়না ভাদুড়ি। ওঁকে শর্মিলা বিশ্বাসের পুরোনো অনেক ভিডিওতে দেখেছি। অয়না সপ্রতিভ জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কে?” নিজের পরিচয় দিয়ে বলি নাচের এই স্টুডিওটা দেখতে এসেছি। অয়না হাসেন। সামনে বোধহয় সংস্থার বার্ষিক অনুষ্ঠান। পুরোদমে মহড়া চলছে। কী অসম্ভব উদ্দীপনাতে তরুণ ছেলেমেয়েরা নেচে চলেছে! একেকটা পা পড়ছে আর ধাতব শব্দ হচ্ছে। কেউ পারছে, কেউ কম পারছে। কেউ আবার তীব্র একাগ্রতায়। ছাত্রীদের সকলেরই একটা বিশেষ স্টাইলে বিনুনি-বাঁধা। শর্মিলা বিশ্বাসের শিল্পসৌন্দর্যৈর একটা বৈশিষ্ট্য বুঝি এই বিনুনি। মনে হয় মকবুল ফিদা হুসেনের গজগামিনী ছবি থেকে নেমে এসেছে সরাসরি!

শর্মিলা বিশ্বাসের তত্ত্বাবধানে ওডিসি ভিশন অ্যান্ড মুভমেন্ট সেন্টার

ঋতুপর্ণ ঘোষের চিত্রাঙ্গদা ছবির নৃত্য পরিচালক ছিলেন শর্মিলা বিশ্বাস। ঋতুপর্ণ বহু সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন শর্মিলাদিকে দেখে ঋতুপর্ণের ওই ছবির ‘রুদ্র’ চরিত্রটি তৈরি হয়েছিল। ঋতুপর্ণ নাচ শিখতে চেয়েছিলেন তাঁর কাছে।

এই স্থানকে কোনও নাচের স্কুল বলা চলে না। এ সত্যিই একটা স্টুডিও। যেন-বা রঙ্গমঞ্চ কোনও। ঘরের ভেতর থেকেই গ্যালারির ঢঙে একটা দেড় তলার জায়গা উপরে। তাতে আরও অনেক ছাত্রছাত্রী। মঞ্চের আলোর মতো ঝোলানো স্পটলাইটের ব্যবস্থাও আছে। শর্মিলাদির নানা বয়সের ছবি। আর একটা বিরাট ছবি গুরু শ্রী কেলুচরণ মহাপাত্রের। আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে এই মানুষটাকে নিজের গুরু মেনে ছিলেন শ্রীমতি শর্মিলা বিশ্বাস (Sharmila Biswas)। কিন্তু কেন? শর্মিলাদি চিলড্রেন্স লিটল থিয়েটারের সদস্য ছিলেন ছোটোবেলা থেকে। সেখানে নানা ধরনের নাচ শিখেছেন। সঙ্গে গান, আঁকাও শেখানো হত। এই সিএলটিতেই গুরু মূরলীধর মাঝির সংস্পর্শে তাঁর আসা। কিন্তু গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র? শর্মিলাদি বলছিলেন, “গানের যেমন নানা প্রকরণে শিক্ষা হয় তেমন গুরুজির নৃত্যের সব থেকে আকর্ষণীয় জায়গা ছিল তাঁর শেখানো। নাচের একটা ফিসিক্যালিটি আছে কিন্তু তাল-লয়-অভিনয় ঠিক রেখে সমান পরিমাপে শরীরকে নৃত্যোপযোগী করে তোলা ছিল গুরুজির একটা খুব ইউনিক পয়েন্ট। আমার মুগ্ধতা ছিল সেখানেই। তাই কলেজে পড়তে পড়তে আমি তাঁর কটকের বাড়িতে যাতায়াত শুরু করি এবং তারপর একটা সময় গুরুজি-গুরুমার বাড়িতে থেকে নৃত্যশিক্ষা করেছি। সম্পূর্ণ গুরুকূল ছিল সেটা আমার। নাচ শিখেছি যেমন তেমনই একজন শিল্পীর দৈনন্দিন জীবন কেমন হওয়া উচিত সেটার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার গুরুজিকে দেখে। আর সেটা তো কোনও কোর্স শেষ করার বস্তু ছিল না। গুরুজির শিক্ষা ছিল সারাজীবনের। তার কোনও শেষ নেই। আজও ক্রমাগত শিখে চলেছি।”

মিতবাক শর্মিলাদির কথায় একরকম জাদু আছে। উনি খুব সঠিক শব্দচয়ণে বিষয় বোঝান, বেশি কথা বলেন না কিন্তু যতটুকু বলেন শুনে যেতে হয়। থামা যায় না। কিন্তু শর্মিলাদির কথা যে এখন শুনছি তা তো নয়। গত শতকের শেষ ভাগ হবে কিংবা নতুন শতকের একদম প্রথমদিক। দূরদর্শনে ‘সানন্দিতা’ নামের একটা অনুষ্ঠান হত। সঞ্চালনাতে ছিলেন অপর্ণা সেন। সেখানে শর্মিলাদিকে প্রথম দেখি। ওঁর সাক্ষাৎকার শুনি। তখন একটা কথায় খুব অবাক হয়েছিলাম যে উনি বলেছিলেন দিনে আটঘণ্টা নাচ প্র্যাকটিস করেন। আমরা চাকরির আটঘণ্টা জানতাম। কাজের আপিসের সময়সীমা জানতাম। কিন্তু নাচও প্রাত্যহিক আটঘণ্টা চর্চা করা যায়? অবশ্য এত গভীর ভাবে চর্চা করেছেন বলেই তো তিনি আজ শর্মিলা বিশ্বাস। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের শিক্ষার সবটুকু নিয়েও ওডিসি নাচে নিজের একটা স্টাইল, প্রায় একটা ঘরানা তৈরি করে নিয়েছেন। নৃত্যপ্রকরণ নিয়ে, উড়িয়া ভাষা নিয়ে, নাচের পোশাক-গয়না নিয়ে, সংগীত নিয়ে তিনি নানা গবেষণা করেছেন। নিজের নৃত্যশিল্পে সেসব যুক্ত করেছেন। তাতে অবশ্য দেশ-বিদেশের নানা স্বীকৃতি মিলেছে। কিন্তু সে পথে কী বাধা আসেনি কিছু?

ঋতুপর্ণ ঘোষের চিত্রাঙ্গদা ছবির নৃত্য পরিচালক ছিলেন শর্মিলা

গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের শিক্ষার সবটুকু নিয়েও ওডিসি নাচে নিজের একটা স্টাইল, প্রায় একটা ঘরানা তৈরি করে নিয়েছেন শর্মিলা। নৃত্যপ্রকরণ নিয়ে, উড়িয়া ভাষা নিয়ে, নাচের পোশাক-গয়না নিয়ে, সংগীত নিয়ে তিনি নানা গবেষণা করেছেন তিনি।

মেয়েদের বিশেষত বিবাহিত মেয়েদের নাচ শেখা, সেই নাচ এগিয়ে নিয়ে চলা তো কম কথা নয়। শর্মিলাদি এমন শুনে বলেছিলেন একবার, “শুধু নাচ নয় কাজের সমস্ত ক্ষেত্রেই মেয়েদের নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। আজও হয়। আর কেবল বিবাহিত বলে নয়। যেমন আমার মা-বাবাও কিন্তু প্রথমটায় বিশ্বাস করতে পারতেন না নাচ করে কেউ গ্রাসাচ্ছাদন চালাতে পারে। আমি তো কোনও ঘরানার সন্তান ছিলাম না আর আমার মা-বাবা সন্তানের কেরিয়ারটা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। কিন্তু আজ এক্সপোজার অনেক বেড়েছে। আজ বিবাহিত মেয়েরা সংসারের ভেতর থেকে অনেক রকম সাহচর্য পায়। নাচের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতে যাতে না হয় তারা জীবনে তাই ভেবেচিন্তে পা ফেলে। তবে একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে যে মানুষ মানে যারা শিখছে তারা প্রাথমিক ভাবে নাচকে কীভাবে নিচ্ছে। নাচকে এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি হিসেবে রেখে নিজেকে প্রফেশনাল বললে কিন্তু হবে না।”

আমি চোখ বন্ধ করি। ফিরে যাই অনেকগুলো বছর আগে। টালিগঞ্জের আইটিআই কলেজের পাশের গলিতে একটি শ্বেতপাথরে মোড়া বিরাট বাড়িতে গিরিজাদেবী থাকতেন। তাঁর মেয়ে সুধা দত্ত ওডিসি নাচের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রোগ্রাম কিছু হলে উনি কখনও আমাদের পাড়ার থেকে ছেলেমেয়ে নিতেন। আমরা যেতাম। নাচ শেষ হলে মামণি (সুধা দত্ত) অনেক গল্প করতেন। সেই গল্পেই বহুবার শুনেছিলাম শর্মিলা বিশ্বাসের কথা। নাচের জন্য যিনি সারাজীবন নিবেদিত প্রাণ। কিংবা গুরু সুতপা তালুকদার আমাকে একবার বলেছিলেন যে ওঁরা যখন ওডিশা যেতেন গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের কাছে নাচ শিখতে, হয়তো দৈনন্দিন শেখা হয়ে গেল, ওঁরা একটু এদিক-ওদিক বেরোলেন কিন্তু শর্মিলাদি নাকি তা করতেন না। গুরুজি শেখানোর পরেও আরও বহু ঘণ্টা তিনি ওই নাচের অংশ প্র্যাকটিস করেই যেতেন অবিরত! সারাজীবন যে-মানুষটার নিজের শিল্প নিয়ে এত আত্মোৎসর্গ তিনি তো আমাদের সামনে প্রফেশনালিজমের ভ্রাম্যমান উদাহরণ। তিনিই তো বলবেন নাচকে কীভাবে এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি থেকে প্রফেশনালিজমে পরিণত করা যায়। আর সে-কারণে তাঁর একেকটা প্রযোজনা সে ‘মূর্ছনা’ হোক কিংবা ‘ধূলিখেল’ অথবা ‘কথা সূর্পনখা’-সারা ভারতবর্ষেই এত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। শর্মিলাদির প্রত্যেকটি প্রযোজনাই সম্পূর্ণ গবেষণালব্ধ। দর্শক প্রতিবার কিছু না কিছু শেখেই। বহু প্রজন্মের শিল্পীর কাছে শ্রীমতি শর্মিলা বিশ্বাস আজ অনুপ্রেরণা। আর কেবল মঞ্চ তো নয় সিনেমাতেও তাঁর উজ্জ্বল স্বকীয়তা আমরা দেখেছি।

চিত্রাঙ্গদা ছবির জন্য মহড়া, শর্মিলা-ঋতুপর্ণ একসঙ্গে

ঋতুপর্ণ ঘোষের চিত্রাঙ্গদা ছবির নৃত্য পরিচালক ছিলেন শর্মিলা বিশ্বাস। ঋতুপর্ণ বহু সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন শর্মিলাদিকে দেখে ঋতুপর্ণের ওই ছবির ‘রুদ্র’ চরিত্রটি তৈরি হয়েছিল। ঋতুপর্ণ নাচ শিখতে চেয়েছিলেন। শর্মিলাদি যথাসম্ভব তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। তখন পত্র-পত্রিকাতে তাঁদের দৈনন্দিন নাচের কথা ছাপা হত। খবরের চ্যানেলে আমরা সাক্ষাৎকার দেখতাম। ওই সময়ই কিংবা তার আশেপাশে শর্মিলাদি বাংলাকে আরেকটি ব্যাপারে গর্বিত করেছিলেন। বহু বছর পর বাংলায় সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার এল। তিনি বোধকরি প্রথম বাঙালি যিনি ওডিসি নৃত্যের জন্য সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন (ওডিসি নাচের জন্য শর্মিলা বিশ্বাস সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার পান ২০১২ সালে)। সেই অভিজ্ঞতার কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি চুপ করে থাকেন। তাঁর মনে পড়ে ঋতুপর্ণ তাঁকে শাড়ি উপহার দিয়েছিলেন। পুরস্কার নিতে যাবার দিন সেই শাড়ি তাঁকে পরতে বলেছিলেন ঋতুপর্ণ। কিন্তু সে-শাড়ি শর্মিলাদির পরা হয়নি। তিনি যেদিন পুরস্কার নিতে গিয়েছিলেন সেদিনই যে ঋতুপর্ণের অকালপ্রয়াণের খবর এসেছিল!

একটা গ্রুপের নাচ শেষ হল। আরেকটা শুরু হবে। সবাই বোধহয় ভাবছে আমি শর্মিলাদির জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু আদৌ তা নয়। আমি ওডিসি ভিশন অ্যান্ড মুভমেন্ট সেন্টার (Odissi Vision and Movement Center)-এর এই নৃত্যময় পরিবেশটা উপভোগ করছি বলেই বসে আছি। শর্মিলাদির সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে বহুদিন আগেই। হয়তো বহু বছর।

______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

Written by