বে-লাগাম এক অশ্ব

আজ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ৮৬তম জন্মদিন

কেমন হত ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা যদি শক্তি চট্টোপাধ্যায় তার সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতেন? আমরা জানতে পারিনি। কারণ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঠিক পরের দিনই শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। একটা অবিশ্বাস্য ইনিংস দেখা থেকে বঞ্চিত হল বাংলার সাহিত্যানুরাগী মানুষ। তবে কবি আমাদের ঝুলি ভরে দিয়েছেন, কাউকে শূন্য হাতে ফেরায়নি তার কবিতা। ভগ্ন হৃদয়ে আমরা কি কখনো মনে মনে আওড়াইনি, “লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কিনা?” অদ্ভুত এই ‘ৎ’, ‘ফিরত’ শব্দের সাথে এক লহমায় তাচ্ছিল্য অথবা ঔদাসিন্যকে জুড়ে দিলো। কী অবাকই না লাগে যখন খেয়াল করি, “মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস পড়া হ্যায়ঁ” গানে গুলজার সাহেবের কলম এসে জুড়ে বসছে এই “ফিরৎ চাহো কিনা”- র প্রতি একরকম দাবি হিসেবে। কবিত্ব বোধহয় এমনই শাশ্বত সীমাহীন। আবার তুমুল জ্বরের দুপুরগুলোয় মনে মনে আওড়ে গেছি, 
“কোমল বাতাস এলে ভাবি, কাছেই সমুদ্র! তুই তোর জরার হাতে কঠিন বাঁধন দিস। অর্থ হয়, আমার যা-কিছু আছে তার অন্ধকার নিয়ে নাইতে নামলে সমুদ্র স’রে যাবে শীতল স’রে যাবে মৃত্যু স’রে যাবে। তবে হয়তো মৃত্যু প্রসব করেছিস জীবনের ভুলে। অন্ধকার আছি, অন্ধকার থাকবো, বা অন্ধকার হবো।
আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে।”

তিনি অন্ধকার ছিলেন, অন্ধকার থাকলেন অথবা অন্ধকার হলেন।

তিনি, এবং ‘তাঁর’ সমগ্র আইডিয়াটিই এইভাবে তীব্র। ‘পদ্য’ -এর বইয়ের নামকরণ থেকে শুরু করে তাঁর কবিতাপাঠ, সবেতেই এই তীব্রতার লেশ লেগে থাকে। বিশেষভাবে বলতে হয়, তাঁর কিছু কাব্যগ্রন্থের নাম এমনই শ্রুতিমধুর যে তা বার বার আওড়াতে ইচ্ছে করে, একটা নেশা এসে জড়িয়ে ধরে পাঠকের সত্ত্বাকে, যেমন- ‘সোনার মাছি খুন করেছি’ (১৯৬৮), ‘অস্ত্রের গৌরবহীন একা’ (১৯৭৫), ‘প্রভু নষ্ট হয়ে যাই’ (১৯৭২), ‘কোথাকার তরবারি কোথায় রেখেছে’ এবং আরও অনেক। আর তাঁর ছদ্মনাম – স্ফুলিঙ্গ সমাদ্দার –এ তো আপাদমস্তক বারুদে ঠাসা! একটুখানি কলম ছোঁয়ালেই যেন জ্বলে উঠবেন।

এর উপর জুড়ে আছে তাঁর মাঝরাত্রের কলকাতা শাসনকাল এবং কতিপয় মিথ। শুধুমাত্র এই শাসনকাল এবং মিথই অনেককে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মোহে আবিষ্ট করেছে, বোহেমিয়ান কবির প্রতি, খেয়ালি কবির প্রতি সহজাত মমত্ব সিঞ্চিত হয়েছে। ডকুমেন্ট্রিতে আমরা তাঁকে উদার কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে শুনি, বিভিন্ন স্মৃতিকথায় পড়ি খালাসিটোলার কথা। তবে এত বিশালসংখ্যক কবিতা লিখে ফেলার পরেও কি তাঁকে খেয়ালি বলা উচিত? নিজের প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম অসংখ্যবার পরিবর্তন করেছেন, সাথে বারংবার বাতিল হয়েছে প্রচ্ছদও, তবু যখন ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ কাব্যগ্রন্থে আমরা পাই 

“অদ্বন্দ্বে যে ঝর্না নামে নিচে
সে তো প্রেমের পূর্ণিমার ভগ্নী”

তখন থমকাতে হয়। স্বাধীন বাজপাখির মত কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় অবশ্যই শব্দের ব্যবহারের যে কোনো সীমাকে অগ্রাহ্য করবেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার এই “প্রেমের পূর্ণিমার ভগ্নী” এসে মিশে যায় কোথাও জীবনানন্দ দাশের ‘ক্যাম্পে’ কবিতার “হৃদয়ের বোন”-এ। অদ্ভুত এই যুগ থেকে যুগে, কলম থেকে কলমে যাতায়াত। মহাকবি ব্যতীত আর কারোর পক্ষে বোধহয় এই আবেগের আদানপ্রদান সম্ভব নয়। কবিতা বা যে কোনো শিল্পকর্মে নিরবিচ্ছিন্ন একাগ্রতা, নিজের সাথে একা হওয়া এবং সেই একা হওয়ার অধ্যবসায়, সর্বোপরি সেই শিল্পের প্রতি মাতৃসুলভ টান থাকা প্রয়োজন। মিথের পাহাড়ে চড়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাই কোথাও গিয়ে দূরে সরে থাকেন। ঘুরতে ঘুরতে একা হয়ে গিয়ে নিমেষের মধ্যে লিখে ফেলেন, “সাতাশ ঘড়ার জলে পরিপূর্ণ হৃদয় তোমার/ ভোলা যায়?” এবং সেই লেখা কবিতা হারিয়েও দেন স্বেচ্ছায়, সংগ্রহ করার অনিচ্ছাতে। এবং ‘একা’ শব্দটা ঘুরে ফিরে আসে তাঁর কাব্যগ্রন্থের নামে।

১৯৩৩ সালের ২৫শে নভেম্বর শক্তিশালী কবি জন্মগ্রহণ করেন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায়। পিতা বামানাথ চট্টোপাধ্যায় এবং মা কমলা দেবী। ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ ভেবেও যদি তিনি ১৯৯৫ সালের ২৩শে মার্চ চলে না যেতেন, তবে আজ তাঁর বয়স হত ছিয়াশি বছর। কলম তাঁর অক্ষুণ্ণ থাকবে চিরকাল, তিনি জীবিত থাকলে যে আজও তা তেজি ঘোড়ার মত বেলাগাম ছুটত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। 

তথ্যসূত্র – রোর বাংলা এবং আনন্দবাজার পত্রিকা

Developed by DXDasia