
ডিজিটাল পরিষেবাকে রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া তাঁর অন্যতম লক্ষ্য
তাঁকে দেখলেই মনে হয় স্পোর্টসম্যান।আর তাঁর উজ্জ্বল চোখের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বাঙালি উদ্যোগপতির আন্তর্জাতিক স্তরে সফল হয়ে ওঠার ইতিহাস। তিনি শৌভিক ব্যানার্জি। বিশ্বের সফলতম ছ’জন টেকনোলজিস্টদের মধ্যে একজন।একই সঙ্গে একজন উদ্যোগপতি এবং আর্কিটেক্ট। মাত্র ২০ বছরের পেশাদার জীবনে ১৫০টিরও বেশি ডিজিটাল প্রোডাক্টের সঙ্গে যাঁর নাম জড়িয়ে গেছে। রিলায়েন্স জিওর প্রাক্তন চিফ আর্কিটেক্ট শৌভিক বর্তমানে টাটা গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ এর ডিজিটাল ইনিশিয়েটিভের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং টাটা ক্লিকের সিটিও। শৌভিকের সাফল্যের মন্ত্র হল,‘স্বপ্ন দেখা থামিয়ে ভবিষ্যতের রোড ম্যাপ বানাও।এমনিতে প্রযুক্তির কোনও মূল্য নেই।প্রযুক্তি তখনই মূল্যবান হয়ে ওঠে যখন এটি কোনও সমস্যার সমাধান করে’।
তাঁর ছোটবেলা জুড়ে রয়েছে খেলাধূলা এবং বিজ্ঞানচর্চা। অধ্যাপক বাবা আর স্পোর্টসউওম্যান মায়ের সাহচর্যে বেড়ে ওঠা শৌভিক ক্রিকেটটা খেলেছেন চুটিয়ে।রনজি ট্রফিতে ১৯৯৩-৯৫ বাংলার প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি অনূর্ধ ১৯ টিম ইন্ডিয়ার সদস্য হিসাবে সাবা করিমের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৩টি টেস্ট ম্যাচও খেলেছেন তিনি। সাফল্যের শিখরে পৌঁছে শৌভিক বলেন,‘শৃঙ্খলা,সকলকে নিয়ে এগিয়ে চলা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার মতো গুণগুলি আমি অর্জন করেছি খেলা থেকেই’।
আর ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে ল্যাবরেটরিতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা শৌভিককে সাহায্য করেছে তাঁর গবেষণার দিনগুলিতে। ইউরোপ থেকেই তিনি অর্জন করেছেন পিএইচডি ডিগ্রি। ইউরোপেই কেটেছে তাঁর বেশিরভাগ কর্মজীবন। নতুন কিছু উদ্ভাবনের নেশাতেই একদিন বানিয়ে ছিলেন ‘ফাইডস’। এটি একটি ই-কমার্স ইঞ্জিন। প্রথম সংগীত বিষয়ক ব্যাক ক্যাটালগ অনলাইন ই-কমার্স ইঞ্জিন। সেই শুরু, তারপর থেকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি এই উজ্জ্বল মেধাবী বঙ্গসন্তানকে। একের পর এক উদ্ভাবন এবং ব্যবসায়িক নিরিখে সাফল্য গড়ে দিয়েছে তার ভবিষ্যৎ।
দীর্ঘদিন ইউরোপে কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন শৌভিক। তাঁর এই ঘরে ফিরে আসা দেশের জন্য এবং বাংলার জন্য কিছু করার তাগিদেই। আর সেই কাজও শুরু করে দিয়েছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে ডিজিটাল পরিষেবাকে রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। আর পাশাপাশি বাংলার তরুণ প্রজন্ম যাতে আধুনিক প্রযুক্তিশিক্ষায় পারঙ্গম হয় সেদিকেও রয়েছে তাঁর নজর।
আর শৌভিকের মূল লক্ষ্য হল কর্মসূত্রে ভারতের বাইরে থাকা ১০০জন সু-প্রতিষ্ঠিত শ্রেষ্ঠ বাঙালি প্রযুক্তিবিদকে ঘরে তথা বাংলায় ফেরানো। এই কাজে ইতিমধ্যেই অনেকটা সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি। তাঁর উদ্যোগেই বাংলায় ফিরে এসেছেন ৩০ জন কৃতী বঙ্গসন্তান।
টাটা গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের উচ্চ পদে আসীন শৌভিক বঙ্গদর্শনকে বলেন, ‘ টাটা স্টিলের সঙ্গে আমার কাজ করতে ভালো লাগে কারণ আমি আমার কাজের সময় এক্ষেত্রে জামশেদপুর এবং কলকাতার মধ্যে ভাগ করে নিতে পারি। আর বাংলার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রচুর ইনটার্ন নিয়োগ করতে পারি’। বাংলার ব্যাপারে শৌভিককে একটু বেশি দুর্বল বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। আর নিজের জন্মভূমিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সদা প্রস্তুত শৌভিক এ বিষয়ে অকপট, ‘আমার কর্মক্ষেত্রের ভিতর বাংলাকে এগিয়ে রাখার ক্ষেত্রে আমার কোনও দ্বিধা নেই। এ রাজ্যের বাঙালি এবং অ-বাঙালিদের নিয়োগকেই আমি বিশেষ গুরুত্ব দিই আর এ নিয়ে কে কী বলল তাতে আমার কিছু এসে যায় না’।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘মাটির কথা’ প্রকল্পের আওতায় শৌভিক এখন রাজ্যের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে ৪৫ হাজারেরও বেশি কৃষকের হাতে জিও হ্যান্ডসেট তুলে দিতে বদ্ধপরিকর। বিশ্বের দরবারে বাংলা ও বাঙালিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সংকল্পে মশগুল শৌভিক ব্যানার্জিকে বঙ্গদর্শনের পক্ষ থেকে কুর্নিশ।
