‘তুঝসে নারাজ নেহি জিন্দেগি/ হ্যাঁয়রান হু ম্যায় …’ এ হয়রানিতে মায়া আছে, জীবন আছে

জাত কবি চেনার একটা উপায় বোধহয় কবির উপমাবোধ খেয়াল করা। সবাই তো পারেন না লিখতে বিনয়ের মত, ‘শিশুদের আহার্যের মত সরল হও তুমি।’ সবাই প্রণবেন্দুও নন যে লিখবেন, ‘শাল পরলে ওকে খরগোশের মত মনে হয়।’ তেমন সবাই পারেননা দারিদ্রকে লিখতে, ‘দিন খালি খালি বর্তন হ্যায়/ অউর রাত হ্যাঁয় জ্যায়সে অন্ধা কুয়া।’ এটা পারতেন গুলজার। গ্যারেজে কাজ করতেন, সামনের পেপার বিক্রেতা লাইব্রেরির কার্ডের সিসটেমে বইও দিতেন চার আনায় একটা করে এক সপ্তাহের জন্য। গুলজার পড়তেন উর্দু গোয়েন্দা গল্প রোজ একটা করে। ভদ্রলোকের ভান্ডার গুলজার ফুরিয়ে আনলেন, বিরক্ত হয়ে  শেষ অবধি ভদ্রলোক ওঁকে দিলেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা সংগ্রহের উর্দু অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথের বইটা ছোট্ট গুলজার এতবার পড়েছেন, ওটা চুরি করে ফেললেন, দোকানদারকে আর ফেরত দেননি।। এভাবেই রবীন্দ্রনাথের বাকি লেখা, বঙ্কিম শরৎ পড়ে ফেললেন এক এক করে। একদিন গুলজার তাঁর মাতৃভাষা পাঞ্জাবীতে গল্প করছেন একটা পাবলিক টেলিফোনে, পেছন থেকে পরিচালক কে আসিফ বললেন, তুমি এত ভালো পাঞ্জাবী জানো! গুলজার বললেন, ওটাই আমার ভাষা। তিনি বললেন, সব্বাই জানে তুমি বাঙালি। অবাঙালি হয়েও রবীন্দ্রনাথ চর্চা করেছেন, মনে পড়ছে আবু সৈয়দ আয়ুব, সৈয়দ মুজতবা আলি, ফাদার দ্যাতিয়েন এরকম কিছু নাম। আরো নাম উল্লেখ করা যাবেই, তার সাথে সম্পুরন সিং কালরা- অর্থাৎ গুলজারের নাম থাকবেই । শুধু চর্চাই নয়, রবীন্দ্রনাথের কবিতা গান অনুবাদ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা গান ওঁর কাছে জলভাত। অবশ্য ওঁর ভাষায়, ‘পান্তাভাতে’।  

হিন্দিতে প্রায় সব্বার শৈলেন্দ্র, সাহির, মজরুহ, গুলজার, সকলেরই সিনেমাতে অনীহা ছিল। প্রাথমিক অনীহার পর এঁরা প্রত্যেকেই নিজের সময়ে দাপটে সিনেমার লিরিক লিখেছেন।

বন্দিনী সিনেমার সময় কবি শৈলেন্দ্রের সঙ্গে শচীন দেব বর্মনের একটু ঝামেলা চলছে। ফলে নতুন গীতিকার চাই। বিমল রায়ের সহকারী দেবু সেনের জোরাজুরিতেও গুলজার বড় বর্মনের সাথে দেখা না করতে গেলে, কবি শৈলেন্দ্র একেবারে খড়গহস্ত হয়ে ওঁকে পাঠালেন। এঁদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এই। বিমল রায় গুলজারকে চেনেন না, দেবু সেনকে দেখে বললেন, একে এনেছ, ভদ্রলোক বুঝবেন কী করে বৈষ্ণব কবিতাটা কী। লেখা হল, ‘মোরা গোরা অঙ্গ লেই লে’ কী অসামান্য লিরিক! লিখেছেন গানটাতে, ‘কুছ খো দিয়া হ্যায় পাইকে/ কুছ পা লিয়া গইয়কে।’ ওঁর লেখা প্রথম গান এটা। যদিও বন্দিনীর আগে কাবুলিওয়ালা আর প্রেমপত্র- সিনেমা দুটো রিলিজ হয়। সেক্ষেত্রে তিন নম্বর ছবি এটা ওঁর।

আমাদের ছোটবেলায় শুনতাম, ‘গোলি মার ভেজে মে/ ভেজা শোর করতা হ্যাঁয়’ প্রবল জনপ্রিয় গান। কিন্তু পরের লাইন দুটো গাওয়া হয় না, ‘ভেজে কি সুনেগা তো মরেগা কাল্লু/ তু করেগা দুসরা ভরেগা কাল্লু’… তু করেগা দুসরা ভরেগা কাল্লু, সেই কবে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত লিখে গেছেন, ‘অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে/ আমাদের পরে দেনা শোধবার ভার।’

যুগের সাথে নতুন কয়েনেজ তৈরি হয়, গুলজারের আগে কেউ ভাবেননি, পরেও কেউ ভাবেননি, ‘তুঝসে নারাজ নেহি জিন্দেগি/ হ্যাঁয়রান হু ম্যায় …’ এ হয়রানিতে মায়া আছে, জীবন আছে।

বর্তমানের সিরিয়ালময় জগতের কাছে একটা অবিশ্বাস্য জিনিস গুলজার পরিচালিত সিরিয়াল মির্জা গালিব। সিনেমার জন্য এই স্ক্রিপ্ট লেখা ছিল, পরে সিরিয়াল হয়। সিরিয়াল হয় বলেই ৬ ঘন্টার ও বেশী স্প্যান জুড়ে গুলজার কাজটা করতে পেরেছিলেন। গুলজার নিজে কবি কিন্তু সিনেমার সাথে , সিনেমার গানের সাথে এমন ভাবে মিশে গেছেন, কোনটা ওঁর আসল সত্তা এখনো বোঝা মুস্কিল।

কী অসামান্য সব ফ্রেজ তৈরি করেছেন, খেয়াল করুন পাঠক, চল ছইয়া ছইয়া গানটাতে, ‘উসকি জুবান উর্দু কি তরহা’, উর্দু’র জায়গায় সংস্কৃত বা আরবি নয় কেন, উর্দু’র মিষ্টি ভাবটা সংস্কৃতে নেই বলেই। কিংবা ঐ গানেই, ‘আয়াত কি তরহা মিল যায়ে কহি’, ‘সৌভাগ্য’ শব্দটা এভাবে ব্যবহার করা যায়, আমাদের গুলজার শিখিয়েছেন।

যেভাবে গানের লড়াই খেলা হয় ছোটবেলায় গুলজারের শিক্ষক ওঁদের কবিতার লড়াই খেলাতেন। ওঁর একবন্ধু একই অক্ষরে তিন চারটে কবিতা বলে ফেলতে পারতেন। গুলজার তাকে হারাবার জন্যে কবিতা মুখস্থ করতেন। কবিতা এভাবেও আসতে পারে ভেবে সত্যিই অবাক হতে হয়। আসলেই তো কবি একটা অবাক করা থিয়োরি মজা করে বললেন, কভি নকল করতে করতে অকল অ্যা জাতি হ্যাঁয়।’ 

পরিচয় সিনেমার প্রযোজক ছিলেন অভিনেতা জিতেন্দ্র। ‘বিতি না বিতায়ি র্যরয়না’ গানটা ওঁর পছন্দ হয়নি, একটু নিমরাজি হয়ে যখন রেকর্ড হবে গানটা, সেদিন অমিতাভ বচ্চন ছিলেন সেট –এ। জিতেন্দ্র ওঁকে শোনান, অমিতাভ নাকি বড্ড আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন গানটা শুনে। শেষ অবধি গানটা থাকে, লতা আর ভুপেন্দ্র সিং গানটাতে জাতীয় পুরষ্কার পান। ভেতরে কবিত্ব না থাকলে যে উক্তি করা যায় না সেটা ইংরেজিতেই সেটা রেখে দেবার লোভ সামলাতে পারছি না … ‘a sunset in a poem has always been more real to me than a sunset in a film’

Developed by DXDasia