
ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরষ্কারের মঞ্চ থেকে প্রতিবাদ
‘আমরা একটা অসহিষ্ণু সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনার ওপর সমানে উদ্দেশ্যমূলক ভাবে আঘাত করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ ভয়ংকর হতে পারে। সব লেখক, নাগরিককে প্রতিবাদে আসতে হবে। না-হলে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে।’- জ্ঞানপীঠ পুরষ্কার গ্রহণ করে একথা বললেন শঙ্খ ঘোষ।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের সময়ও কথায়-কবিতায় তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন। সে বছর শাসক দলের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পত্রিকা-র শারদ সংখ্যায় যে কবিতাটি লিখেছিলেন, তাকে প্রতিবাদপত্র বললে অত্যুক্তি হবে না। পরিবর্তনের সরকার ক্ষমতায় আসার পর যখন রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠল, তথনও একই রকম সরব এবং তৎপর তিনি। এবারও শাসকদলের মুখপত্রের শারদে যে কবিতাটি প্রকাশিত হয়, তার দৃশ্যকল্প খানিকটা এইরকম-একটি মেয়ের শ্লীলতাহানি হচ্ছে, তার বাবা জনে জনে সাহায্য প্রার্থনা করছেন। কিন্তু কেউই দেখতে পাচ্ছে না যে অন্যায় হয়েছে। এভাবেই বারবার নিজের প্রতিবাদ নিজের মতো করে ব্যক্ত করেছেন তিনি। বিরুদ্ধ মত সত্ত্বেও তাঁর সমালোচনাকে সসম্মানে ধারণ করেছে রাজনৈতিক পত্রিকাগুলি। অতীতে এমার্জেন্সি এবং অন্যান্য প্রতিকূল অবস্থায় আমরা তাঁর এই অবস্থান লক্ষ্য করেছি। রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক দল ক্ষমতার আধার, এ নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। একই যুক্তিতে শঙ্খ ঘোষ ক্ষমতার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতি-ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক স্তম্ভ। বিভিন্ন সামাজিক এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সময় তাঁর ‘নৈতিক চয়ন’ তাঁকে সর্বসাধারণের ‘বিবেক’ হিসেবে গড়ে তুলেছে। সেই অবস্থানের সূত্র ধরেই জ্ঞানপীঠ পুরষ্কারের মঞ্চ থেকে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের ধর্মীয় মেরুকরণের নীতিকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করলেন তিনি।
কবির সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। কবি তথাকথিত সমাজ এবং রাজনীতি নিয়ে আদৌ কোনও আলোচনার উপক্রম করবেন কিনা তা নিয়েও তাত্ত্বিক লড়াই আছে। কিন্তু শঙ্খবাবুর উদ্বেগ তাত্ত্বিক মিনার থেকে নেমে এসে সমসময়ের সাধারণ মানুষের উদ্বেগ। বিশেষ এক সামাজিক, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মানুষকে নিক্ষিপ্ত হতে হয় পৃথিবীতে। তার কোনওটাই তার নিজের হাতে থাকে না। সে কেবল পারে তাকে যে পৃথিবীটা দেওয়া হয়েছে সেটাকে পালটানোর চেষ্টা করতে। কবি সেই আদর্শ ‘সুন্দর’-এর কাছে পৌঁছতে চান যেখানে সব মানুষ পরস্পরের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজের মতটিকে প্রকাশ করতে পারবে। কে কী খাবে, পরবে, পড়বে এবং কীভাবে জীবন কাটাবে তা নিয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতার চোখরাঙানি থাকবে না।
এই বিশেষ সূত্রটি স্বীকার করলে, কবিরা কখনওই নিজের কাঙ্খিত জগতে পৌঁছতে পারেন না। কেননা কাঙ্খিত আর প্রাপ্ত-র মধ্যেকার শূন্যস্থানেই শিল্পীসত্তার উদ্বেগ। এখানেই কী থেমে যাবে লড়াই। ক্ষমতার নতুন মেরুকরণের নীতির কাছে কি হার মানতেই হবে? ভিতর ভিতর যন্ত্রণা পেলেও অনেককেই আজকাল ‘রাজকবি’, স্বভাব কবি’, ‘প্রোফেশনাল কবি’-র দায়িত্ব পালন করতে হয়। শঙ্খবাবুর সে জ্বালা নেই। তাই সাধারণ মানুষের উদ্বেগকে ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরষ্কারের সরকারি মঞ্চ থেকে উচ্চারণ করতে কোনও দ্বিধাও নেই তাঁর।
