কালো টাকা ভালো টাকা

দেশের রাজনীতির সমীকরণে এই টাকা রাজনীতিতে একটা বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে। তার কিছুটা ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

লোকে বলে বটে টাকা কথা বলে। এখন দেখা যাচ্ছে, শুধু বলে না, সময় এলে ‘জয় হিন্দ’ বা ‘বন্দে মাতরম’-এর মতো জোট বাঁধার স্লোগানও হয়ে উঠতে পারে টাকা। একেকটা সময় আসে যখন সব মানুষ তাতে জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের জন্মের সময় এমন হয়েছিল। জরুরি অবস্থায় হয়েছিল। বোফোর্স নিয়েও হয়েছিল। ফের হল। এই টাকা বাতিলের ঘটনায়। টাকা বাতিলে অসুবিধায় পড়েননি এমন মানুষ খুঁজতে গেলে প্রধানমন্ত্রী বাদে আর কাউকে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। অবশ্য তাঁর কোনও অসুবিধাই হয়নি এমনটাও বোধ হয় বলা যাবে না। টাকা বা খুচরোর সমস্যায় হয়তো তাঁকে পড়তে হয়নি, তবে সংসদে তাঁকে এমন ভাষায় সমালোচনা শুনতে হচ্ছে সকাল বিকেল, মনে মনে ধরণি দ্বিধা হও বলছেন কি না কে জানে! এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে তিনি আগাম আঁচ করতে পারেননি, অবস্থা এতটা জটিল হয়ে উঠবে। এই গণ-দুর্ভোগ আরও এক দেড় মাস চললে, ইন্দিরা গান্ধির জরুরি অবস্থা জারির পরিণতি নরেন্দ্র মোদিরও হয় কি না দেখার আছে। এই জল কত দূর গড়াবে, এই মুহূর্তে কেউ জানে না। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবার আগে ময়দানে নেমেছেন, ধীরে ধীরে তাঁর পথে আসছেন অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও। দেশের রাজনীতির শক্তি-বিন্যাসে এই টাকা রাজনীতি একটা বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে। তার কিছুটা ইঙ্গিত এখনই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

টাকা বাতিলে বিজেপি কিছুটা হলেও বিপাকে পড়েছে। এটা ঠিক। কিন্তু, গোরু-রাজনীতি, দলিত হত্যা, দলের দলিত বিরোধী মুখ, জেএনইউ কাণ্ডে দেশ জুড়ে নিন্দিত হওয়া, গোমাংসের জিগির তুলে সংখ্যালঘু খুন, সব মিলিয়ে বিজেপি এবং সঙ্গী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো একটা কানা গলিতে ঢুকে পড়ছিল ক্রমেই। একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় দখল করে নিজেদের লোক বসানো, শিক্ষায় মাতব্বরি, বিজ্ঞান কংগ্রেসে পুষ্পক রথ ইত্যাদি হাবি জাবি বলে দলের সর্বোচ্চ নেতার হাসির খোরাক হয়ে ওঠা, দলটা যে  ভারতের মতো একটা বৈচিত্র্যময় বৃহৎ দেশ শাসনে অযোগ্য, এমন আলোচনাও কান পাতলে শোনা যাচ্ছিল। টাকা কিন্তু বিজেপিকে সেখান থেকে বের করে এনেছে। এই মুহূর্তে লাভ বলতে এটুকুই। সেটা অবশ্য কম নয়। গোরু রাজনীতি কি এখন বন্ধ আছে? মোটেই নয়। তবে টাকার চিৎকারে চাপা পড়ে গেছে। টাকার ঢেউ শান্ত হলে ফের ভেসে উঠবে এই সব ক্ষুদ্রতার রাজনীতি। ক্ষুদ্রতা কথা কেন বললাম? ভেবে দেখুন, ইন্দিরা গান্ধি তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বকালে টাকায় লিখে দেননি, ‘গরিবি হটাও’ স্লোগান। যতই সরকারের মুখ দিয়ে ওই কথা বলা হয়ে থাকুক, সেটা আসলে ছিল, কংগ্রেসের স্লোগান। মোদি কিন্তু স্বচ্ছ ভারতের প্রতীক পাঁচশো এবং দু’হাজারের নোটে ছাপিয়ে দিয়েছেন। এটাই ক্ষুদ্রতার রাজনীতি। এটাই নিচু মানের দলবাজি। বিজেপি প্রচার করা শুরু করেছে, যারাই সমালোচনা করছে, তারা সব কালো টাকার পক্ষে। আবার বিরোধীরাও বেশ কিছু প্রমাণ হাজির করে বলছে, বিজেপি-র কেউ কেউ এই সিদ্ধান্তের কথা জানত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই লখনউতে গিয়ে বিজেপি সভাপতির সম্পত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে, আমি ভালো, তুমি কালো, বিজেপির এই রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত এই দল নিজের পায়ে বলটা রাখতে পারে কি না দেখার আছে। কারণ, হাঁটু কাঁপার লক্ষণ চোখে পড়ছে। বল কি জালে জড়াবে? না আত্মঘাতী গোলে পয়েন্ট খোয়াবে? স্কোর জানতে আর একটু অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

Developed by DXDasia