রুই-কাতলার দরে বিক্রি হবে ইলিশ

কাকদ্বীপের গবেষণাগারে কঠিন ‘সাধনায়’ বিজ্ঞানীরা

আর ক'টা বছর অপেক্ষা করুন কাতলা, মৃগেল, রুইয়ের দরে বিক্রি হবে ইলিশ। আর হয়তো হাজার,দু হাজারে কিনতে হবে না, এমনকি হাপিত্যেশ করে তাকিয়ে থাকতে হবে না বর্ষাকালের দিকে। সারাবছর ইলিশ পাবেন বাজারে। কাকদ্বীপে গবেষণাগারে পরীক্ষা -নিরীক্ষা চলছে। বিজ্ঞানীদের মতে একেবারে শেষ ধাপে পৌঁছে গেছেন তাঁরা। 

নোনা জলের পুকুরে চাষ করে ইলিশকে প্রতিপালন করা যাচ্ছে, যেদিন মাছচাষীরা পুকুরে উৎপাদন করতে পারবেন, সেদিনই সার্থক হবে এই প্রচেষ্টা। কাকদ্বীপের যে গবেষণাগারে ইলিশ প্রতিপালন হচ্ছে তা কেন্দ্রীয় সরকারের। কেন্দ্রীয় নোনাজল জীব পালন অনুসন্ধান সংস্থার প্রধান বিজ্ঞানী ড. দেবাশিস দে। বছর পাঁচেক আগে যখন গভীর সমুদ্রে ইলিশ মিলছিল না তখন তাঁর মনে হয়েছিল নোনাজলের পুকুরে মাছ চাষ করা যায় কিনা তা নিয়ে পরীক্ষা -নিরীক্ষার। ইলিশের চাহিদার জন্য মৎস্যজীবীরা ছোট ঘেরের জাল ফেলেন। তাতে ছোট মাছ উঠে আসে। আমরা যাকে বলি, খোকা ইলিশ। মাছ বড় হওয়ার আগে ধরা পড়ে জালে। সরকারি নিষেধ মানেন না মৎস্যজীবীরা। নজরদারির ফাঁক গলে  সমুদ্র থেকে খোকা ইলিশ ধরেন তাঁরা। তাই মনে করা হচ্ছিল মাছ কমছে সমুদ্রে।

মাথায় তো এল, কিন্তু ইলিশের মতো এমন স্পর্শকাতর মাছ বাঁচিয়ে রাখে সমুদ্র থেকে পুকুরে আনবেন কি করে তা নিয়েই প্রথমে শুরু হল ভাবনা,কারণ ইলিশ সমুদ্রের জল থেকে উপরে তুললেই মারা যাবে, দেহে সামান্য আঘাত লাগলেই সব শেষ। বিজ্ঞানী দেবাশিস দে প্রথমে ঠিক করলেন, যে জলে বা যে পরিবেশে মাছ বেঁচে থাকে তা নিয়ে আগে গবেষণা চালাতে হবে। বেঁচে থাকার জন্য জলে কতটা পরিমাণ অক্সিজেন থাকে, কোন তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে পারে,জলে পিএইচ বা লবণের পরিমাণ ঠিক কতটা থাকলে গভীর সমুদ্র থেকে কাকদ্বীপের পুকুরে আনা যাবে,এসব নিয়ে প্রথমে গবেষণা শুরু হল। গবেষণায় দেখা গেল সমুদ্র থেকে মাছ হয়তো বাঁচিয়ে রাখা যাবে কিন্তু দু থেকে আড়াই ঘণ্টা।তার মধ্যে তাকে নিজের পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে হবে। কাকদ্বীপের কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের মুখ্য বিজ্ঞানী ড.দেবাশিস দে বলছিলেন, পুকুরে এরপর অনুকুল পরিবেশ তৈরি করা হল। সমুদ্রের বা নদীর নোনাজল ঢোকানো হল সেখানে। বদ্ধ পুকুরে খেলানো হল ঢেউ। মৎস্যজীবীদের কাছ থেকে ইলিশ নিয়ে পেট কেটে দেখা হল সে কি খেয়ে বেঁচে থাকে। সেই সব জু প্ল্যাঙ্কটন বা খাবার তৈরি করা হল গবেষণাগারে। এরপর শুরু হল সমুদ্র থেকে মাছ আনার চেষ্টা। সমুদ্রে মৎস্যজীবীদের সঙ্গে নিয়ে গেলেন হাঁড়ি, তার মধ্যে অনুকুল পরিবেশ তৈরি করা হল জলের মধ্যে মিশিয়ে দেওয়া হল গ্লুকোজ। জালে মাছ ধরার পর জলের ওপরে না তুলে জলের ভেতরেই তা রাখা হল হাঁড়ির মধ্যে। একদিনের চেষ্টায় এই কঠিন কাজ সম্ভব হয় নি, অনেক চেষ্টার পর একদিন এল সেই শুভদিন, ইলিশ বাঁচানো সম্ভব হল। এরপর বড় করার পালা। তারপর প্রজনন। পুকুরে মাছের জন্ম দিতে পারলে বাঙালির পাতে যে সস্তায় ইলিশ পড়বে তা বুঝেছিলেন দেবাশিস দে। আর এটাই এখন তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। এই কঠিন পরীক্ষারও শেষ ধাপে পৌঁছে গিয়েছে তাঁর টিম। পুকুরে মাছ বড় হচ্ছে। পেটে ডিম এসেছে। এবার প্রজননের পালা। এই পরীক্ষাতে উতরে যেতে হবে জ্ঞানীদের,দিনরাত তাই এক হয়ে গেছে তাদের কাছে।

ড. দেবাশিস দে বলছিলেন, রুই, কাতলা, মৃগেল একসময় ছিল নোনাজলের মাছ, মিঠে জলে চাষের উপযোগী করতে সময় লেগেছে ৪০ বছর। রুই,কাতলা মিঠে জলে হচ্ছে বলে বাঙালি স্বাদ মিটছে, আর ইলিশ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে মাত্র ৪ বছর। কেন্দ্রীয় সরকার এজন্য যাবতীয় উদ্যোগ নিচ্ছ, ফলে দ্রুত পুকুরে আসবে আসল ইলিশ। যার স্বাদ, গন্ধ একই থাকবে। সম্ভাবত নোনাজলের পুকুরে ইলিশ চাষ নিয়ে গবেষণা বিশ্বে এই প্রথম। আর এই প্রচেষ্টার প্রধান এক বাঙালি,যাঁর পাতে ইলিশ না পড়লে মনে হয়,মাছ খেলাম না এ বছর। আজকাল বলা হয়, পুকুরে বা বিলে অথবা ভেড়িতে ইলিশ চাষ হচ্ছে। এভাবে ইলিশ বাঁচিয়ে কখনই সম্ভব নয়।  সমুদ্রে ইলিশের মতো মাছ পাওয়া যায়। নাম চাঁপালি। দেখতে হুবহু ইলিশ। গন্ধও তেমন। সেই মাছ চাষ হচ্ছে মিঠে জলে, বলা হচ্ছে ইলিশ। তার স্বাদ কি ইলিশের মতো হতে পারে? চাঁপালি তো কখনও ইলিশ হয়ে উঠতে পারে না। ইলিশ নিয়ে গবেষণায় বহু নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আর তাতে বাঙালির বহু প্রাচীন ধারণার অবসান হবে।

Developed by DXDasia