ঋত্বিক ঘটকের দিদি সম্প্রীতি ও যমজ বোন প্রতীতি : মেঘে ঢাকা দুই প্রতিভা

সম্প্রীতি ঘটক ও প্রতীতি ঘটকের কথা

দাদাকে নিয়ে গর্বের শেষ ছিল না মিনিট সাতেকের ছোটো বোনটির। দুজনের ডাক নামও ছিল বেশ মজার—ভবা ও ভবি। দাদার বিমূর্ত জীবন ঘিরে আক্ষেপও কিছু কম ছিল না বোনের। সেকারণেই দাদাকে নিয়ে ‘ঋত্বিককে শেষ ভালোবাসা’ লিখতে বসে আগুনপাখির মতো ঘোষণা করেন “যারা ঐ বিশাল বিস্ময়কর মহান প্রতিভাধর মানুষটির প্রতি অতীতে অবহেলা-অযত্ন করেছেন, আর তাঁর কৃতির বিনিময়ে আজ ভোগ করছেন অনেক ধরনের সরকারি সুবিধা, তাঁরা ভুল করেছেন এবং সে ভুলের জন্য নিশ্চয় আজ অনুতপ্তও। …১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর থেকে আজ এ লেখা পর্যন্ত তারা কেউ-ই তাঁর সঙ্গে ছিলেন না, অতএব কোনো বিষয়ে কারুর যদি কিছু বলার থাকে, তাঁকে বিরুদ্ধ-মত হাজির করতে হবে প্রমাণসহ। … আমি ঋত্বিকের যমজ বোন অর্থাৎ আমি ছিলাম তাঁর সব থেকে বড় আস্থা বা নির্ভরতা…” । একই স্ফুলিঙ্গের সন্তান তাঁরা, আজীবন দাদার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হেঁটেছিলেন যিনি, বাংলার সমাজ-শিল্প-সংস্কৃতির দুনিয়ায় উজ্জ্বলতার এক অনন্য উদাহরণ হয়েও যিনি পরিচিত হলেন না সেভাবে, তিনি নিজেই নিজের পরিচিতি লেখেন এইভাবে

“সে কবেকার কথা। ১৯২৫ সালের হেমন্ত-কার্তিকের শিশির-ভেজা মধ্যরাতে ৪ নভেম্বর ঢাকা শহরে দু’টি ছেলে-মেয়ের জন্ম হয়েছিল। এদেরই একজন পরবর্তী জীবনে কিংবদন্তি ঋত্বিক ঘটক, অন্যজন সাত মিনিটের ছোটো বোন। অত্যন্ত কৃতী পরিবারের সবচেয়ে অকৃতী অধম সেই যমজ বোনই আমি—প্রতীতি।”

প্রতীতি দেবী

ঢাকার ২ নম্বর, ঋষিকেশ দাস লেনের ঝুলনবাড়িতে জন্ম হয় সুরেশচন্দ্র ঘটক ও ইন্দুবালা দেবীর নয় সন্তানের কনিষ্ঠ দুই- ঋত্বিক আর প্রতীতির। প্রতীতি ঘটক ওরফে প্রতীতি দত্ত। পরিবারের অধিকাংশ ব্যক্তি অনেকের মতোই বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু পরে নিজের দেশে ফিরে আসেন প্রতীতি। তাঁর বিয়ে হয় ভাষা সংগ্রামী ও পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পুত্র সঞ্জীব দত্তের সঙ্গে। পুত্র রাহুল দত্ত ও কন্যা আরমা দত্তকে নিয়ে বাংলাদেশেই থেকে যান তিনি। তাঁর চোখের সামনে ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ কুমিল্লার নিজ বাসভবন থেকে পাক হানাদার বাহিনী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তাঁর ছো্টো ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও বাংলাদেশ গড়ে ওঠার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে রয়েছে প্রতীতি দেবীর পিতৃগৃহ ও শ্বশুরবাড়ির পরিবার। তিনি নিজেও নানা সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঋত্বিক ঘটক-এর বানানো প্রত্যেকটি ছবির সঙ্গেই তিনি পরোক্ষভাবে জড়িয়ে ছিলেন। এমনকী ঋত্বিক চেয়েছিলেন সিনেমা বানানোয় তাঁকে সাহায্য করুন প্রতীতি কিন্তু সংসার সামতে গিয়ে তা হয়ে ওঠেনি। নিজের বন্ধুবান্ধব-সহকর্মীদের সঙ্গে বোনের পরিচয় করাতেন- ‘এই আমার ইন্টারন্যাশনাল পেয়ার। মাতৃজঠর থেকে পৃথিবি ভ্রমণের জন্য দুজনে একত্রে ল্যান্ড করেছি’।

আর একটি ঘটনার কথা না বললেই নয়, ১৯৭২ সাল। ঋত্বিক এসেছেন বাংলাদেশে। ভাই-বোন দুজনে মিলে গেছেন কুমিল্লায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত কুমিল্লার একটা জলার ধার থেকে প্রতীতি কুড়িয়ে পান ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ বইটি। তা দেখেই ঋত্বিক এই কাহিনি নিয়ে সিনেমা তৈরির কথা মনস্থির করেন। স্ক্রিপ্ট লেখার সময়, হাতের কাছে ছিল না কাগজ। প্রতীতির কাছ থেকে চেয়ে নেন তাঁর ইস্ত্রি করা সাদা শাড়ি। সেই শাড়ির ওপরই পেন দিয়ে লিখতে শুরু করেন সিনেমাটির স্ক্রিপ্ট। দাদার মতই বাংলাদেশ অন্তঃপ্রাণ ছিলেন। ২০২০ সালে ৯৫ বছর বয়সে, ঢাকার একটি হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সামান্য হলেও প্রতীতি দেবী জীবদ্দশায় পরিচিত হয়েছিলেন নিজ কাজের জন্য। কিন্তু, তাঁর এবং ঋত্বিকের থেকে বছর ১৪-র বড়ো দিদি সম্প্রীতি দেবী কখনই প্রচারের আলোয় আসেননি অথচ রীতিমত অসাধ্য সাধন করে গিয়েছেন! ১৯১১ সালের ২০ মে তাঁর জন্ম। প্রগতিশীল ঘটক পরিবারে শিল্প-সাহিত্যের আবহেই তাঁর বেড়ে ওঠা। স্বনামধন্য শিল্পী ও ভাস্কর দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী তাঁকে নিজে থেকে ছাত্রী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। ১৯২৯ সালে ক্ষিতীশচন্দ্র রায়ের সঙ্গে বিয়ের পর সংসার পাতেন মধ্যপ্রদেশের বৈকুন্ঠপুরে। সংসার সামলানোর পাশাপাশি চালিয়ে যান শিল্পচর্চা। বাড়ির দেওয়ালকে ক্যানভাস বানিয়ে হরিণশিশুর সঙ্গে শকুন্তলা ও দুই সখী, হরপার্বতীর যুগলমূর্তি ইত্যাদি ফ্রেস্কো পদ্ধতির কাজ করতেন। ১৯৩৩ সালে অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস-এ জুরি-নির্বাচিত বিশেষ বিভাগে নন্দলাল বসু, অতুল বসু সহ আরও নামী শিল্পীদের কাজের পাশাপাশি প্রদর্শিত হয়েছিল তাঁর আঁকা ‘রাত্রি ও ধরিত্রী’। ‘পূজারী’ নামে একটি হাতে লেখা পত্রিকাও সম্পাদনা করেছিলেন কিছুদিন।

সম্প্রীতি দেবী

১৯৬২ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা হয় ‘ইন্দো কন্টিনেন্টাল আর্টিস্টস সোসাইটি’। এই শিল্পী-সংগঠনের মাধ্যমেই শিল্পচর্চার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সম্প্রীতি দেবীর নাম উঠে আসে। স্থানীয়, স্বল্পপরিচিত শিল্পীদের প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে তাঁদের এগিয়ে আনার উদ্দেশ্য নিয়ে এই সংগঠন কাজ করত। ‘ইন্দো কন্টিনেন্টাল আর্টিস্টস সোসাইটি’-র মুখপত্র হিসেবে ‘আর্টিস্ট’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে— যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন সম্প্রীতি দেবী ও লোকেশ ঘটক— তাঁর আর এক ভাই। শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ জানিয়েছিলেন রামকিঙ্কর বেজ, নন্দলাল বসু প্রমুখ। ঋত্বিক ঘটকও যুক্ত ছিলেন এই পত্রিকার সঙ্গে। পরে এর নাম হয় ‘আর্টিস্ট’স ওন’। ও সি গঙ্গোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী, অনিলকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, প্রদ্যোৎ ঘোষ, মীরা মুখোপাধ্যায়ও লিখতেন এ পত্রিকায়। বিদেশি লেখকদের মধ্যে জেমস এল কোনেন বা নরম্যান স্মিথ-এর লেখা এই পত্রিকায় আন্তর্জাতিক মাত্রা যোগ করেছিল। শিল্পের জগতে অপেক্ষাকৃত অল্প-পরিচিত যে শিল্পীদের আর্থিক এবং অস্তিত্বের সঙ্কটের মুখোমুখি হতে হয়, তাঁদের কথা তুলে আনতেন এই পত্রিকার সম্পাদকগোষ্ঠী। পটুয়া বসন্ত জানা বা চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যের মতো স্বশিক্ষিত, বা একদা ‘অল্পখ্যাত’ শিল্পীকে নিয়ে লেখা প্রকাশ করেছিল ‘আর্টিস্ট’স ওন’। সম্প্রীতি দেবী পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি কলকাতার অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস-এর সদস্য হয়েছেন, বাংলার ‘জাতীয় কলাকেন্দ্র’-র শিল্পবিভাগের ‘চেয়ারম্যান’-এর দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন পর, ১৯৯২ সালে ৮০ বছর বয়সে ইন্দো কন্টিনেন্টাল আর্ট সোসাইটি-র কাজ নতুন করে শুরু করার উদ্যোগ নেন সম্প্রীতি দেবী। ১৯৯৩-তে নিউ জার্সিতে সোসাইটির পক্ষ থেকে একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে অন্যান্য প্রবাসী ভারতীয় শিল্পীদের কাজের সঙ্গে তাঁর ‘ভগবান সিতারি অ্যাট দ্য এজ অব নাইনটি সিক্স’— এক বৃদ্ধ সেতারশিল্পীর প্যাস্টেল-প্রতিকৃতিও স্থান পেয়েছিল। ২০০৬-এর জুলাই মাসে সম্প্রীতি দেবী প্রয়াত হন। তাঁর জীবন ও কাজের সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন-সহ ‘আর্টিস্ট’স ওন’ পত্রিকা থেকে নির্বাচিত কিছু প্রবন্ধের একটি সঙ্কলন প্রকাশ করেন চান্দ্রেয়ী নিয়োগী, ২০০৭-এ। ২০১০-১১ সালে তাঁর শতবর্ষ উপলক্ষে পরিবারের উত্তরপ্রজন্মের সদস্যদের উদ্যোগে ‘সম্প্রীতি স্মরণিকা’ নামে একটি পুস্তিকাও প্রকাশিত হয়।

তথ্যসূত্রঃ

‘ঋত্বিককে শেষ ভালোবাসা’ – প্রতীতি দেবী (সাহিত্য প্রকাশ প্রকাশনা, বাংলাদেশ)

প্রথম আলো

www.filmfree.org

পৃথা কুণ্ডু, আনন্দবাজার পত্রিকা

Developed by DXDasia