হযবরল আদালতে ঋতব্রতর বিচার

ওঁ দাস ক্যাপিটাল, ক্রিং সারপ্লাস ভ্যালু, ঠক অ্যান্টি ডুরিং

বেজায় গরম।গাছতলায় বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছি। ঘাসের উপর রুমালটা ছিল সেটা দিয়ে মুখ মুছতে গিয়ে দেখি রুমালতো আর রুমাল নেই, সেটা একটা দিব্বি গোলগাল সেলিম হয়ে জুলু জুলু করে আমার দিকে তাকিয়ে লেজ নাড়ছে আর হাসছে। আমি বললাম, কী মুসকিল, ছিল রুমাল হয়ে গেল সেলিম। সেলিম বলল, এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে, আমাদের পার্টিতে এমন হামেসাই হচ্ছে। ছিল বিড়ি হয়ে গেল ফাইফ ফিফটি ফাইভ। ছিল আলিমুদ্দিন হয়ে গেল সেলিমউদ্দিন। এমন তো হয়েই চলেছে। এমন সময় একটা হাফ প্যান্ট পরা লোক, খালি গায়ে পৈতে, হাতে কমণ্ডলু, কপালে লাল টিপ, প্রায় সাদা চুল, সামনে এসে গম গম করে বলে উঠল, মাত্তারা মাত্তারা। আমি বললাম, উনি কে? সেলিম বলল, সেকি! উনাকে চেনেন না? উনি হলেন আমাদের পার্টির জটায়ু। উনি সব জানেন। উনার আর একটা গুণ হল উনি সব জিনিসের নামকরণ করেন। উনার হাতের ঘড়ির নাম ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা’, উনার আন্ডার প্যান্টের নাম ‘দীর্ঘজীবী’, চাকরের নাম ‘ডিক্টেটরশিপ অফ দ্য প্রলেতারিয়েত’, উনার বাথরুমের নাম ‘পার্টি কংগ্রেস’, উনি জটায়ুবৌদিকে আদর করে ‘প্লেনাম’ বলে ডাকেন….এই রকম আর কি! হাজার হাজার বছর ধরে উনি কখনও আলিমুদ্দিনে কখনও একেজি ভবনে বাস করছেন। প্রস্তর যুগে উনার নাম ছিল প্রকাশ।মানুষ যখন লোহা আবিষ্কার করে কাস্তে বানাতে শিখল, তখন উনার নাম ছিল কারাত। এই ভাবে হাজার হাজার বছর পরে এখন উনি জটায়ু। এখন আর তেমন দেখতে পান না চোখে। তবে গন্ধ শুঁকে সব বুঝতে পারেন। দেখুন আমি প্রশ্ন করছি, উনি কেমন উত্তর দেন। আপনি শুধু দেখে যান। এই বলে সেলিম গোঁফ নেড়ে বলল, স্যার আকাশটা কেমন?

জটায়ুঃ (ঘন ঘন গন্ধ শুঁকে) টক টক গন্ধ।

সেলিমঃ বাতাস?

জটায়ুঃ ঋতব্রতর নোজার গন্ধ পাচ্ছি, নিশ্চয় ব্যাটা ধারে পাশে কোথাও লুকিয়ে আছে ব্যাটা। ক্যাডারদের বল সব ঝোপ ঝাড় খুঁজে দেখতে।

বলতেই হ্যারারারারা হ্যারারারারা করে এক দল শজারু বিভিন্ন দিকে ছুটে গেল। কিছু ক্ষণ বাদে শজারুর দল একটা কাককে ধরে নিয়ে এসে জটায়ুর সামনে রাখল। এমন সময় গাছের কোটর থেকে সুরুৎ করে একটা প্যাঁচা বেরিয়ে এসে আমাকে দেখে এক গাল হেসে বলল, আমি পলিটব্যুরো, জটায়ু স্যারের এখন হুকো খাওয়ার সময় হয়েছে, তাই দিতে এলাম।জটায়ু হুকো পেয়ে মনের আনন্দে সেই হুকোয় টান দিচ্ছে। কাকটা পা দুটি জোড়া করে প্রণামের ভঙ্গিমায় জটায়ুর দিকে তাকিয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছে। শজারুর দল চারি দিক ঘিরে রেখেছে যাতে কাকটা পালিয়ে যেতে না পারে।

এমন সময় প্যাঁচাটা জটায়ুর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, কই ঋতব্রতর হিসেবটা শুনবে নাকি? জটায়ু এই কথা শুনে কাকটার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ঋতব্রতরে কাল রাত থেকে আমি শুধু তোর কথা ভেবেছি আর কেঁদেছিরে। প্যাঁচাটা বলে উঠল, স্যার তাড়াতাড়ি করুন, জটায়ু বৌদি বলেছে বিচার যেন স্বচ্ছ এবং তড়াতাড়ি হয়। তা শুনে জটায়ু বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ পড় কী কী অভিযোগ আছে। প্যাঁচাটা আবার গাছের কোটরে সেঁধিয়ে গেল। কিছু ক্ষণ পর ফের ফিরে এল হাতে একটা স্লেট নিয়ে। প্যাঁচাটা বলল, হিসেবটা মন দিয়ে শোন, এর মধ্যে একটু ভগ্নাংশ টগ্নাংশ আছে। কাল পার্টির ইঁদুর ইউনিটের সভায় দেখেছি, ছুঁচোরা কেউ বোঝার ভান করে মাথা নাড়লেও, ইঁদুররা কিচ কিচ করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। ধেরে ইঁদুররা দাবি করেছে তাদের বোঝার জন্য ‘সহজ ঋতব্রত’ নাম দিয়ে ‘ছাত্র বন্ধু’ বার করতে হবে। জটায়ু বলল, সে সব পরে হবে এখন তুমি পড়।

প্যাঁচাটা কিছু ক্ষণ ঝিমিয়ে নিয়ে তার পর পড়তে শুরু করল।ওঁ দাস ক্যাপিটাল, ক্রিং সারপ্লাস ভ্যালু, ঠক অ্যান্টি ডুরিং, ওঁ হোয়াটিজটুবিডান, কট হাউটুবিএগুডকমিউনিস্ট স্বাহা!জটায়ু বলল, কাম টু দ্য পয়েন্ট। প্যাঁচা বলল, এই যে এসে গেছি,  এক নম্বর অভিযোগ, ঋতব্রত এক টানা মোট নয় পূর্ণ ৬৭-র ১১ ঘণ্টা পার্টির দেওয়া সজনে গাছের আবাসন ছেড়ে পাশের পাড়ার আম আবাসনের ৭ পূর্ণ তিনের নয় জন কাকিনির সঙ্গে ইয়ে টিয়ে করেছে। জটায়ু বলল, ইয়ে কী? প্যাঁচা বলল, ওসব কথা আমাদের পার্টিতে বলা বারণ। ইয়ে মানে ওই যাকে বলে টিয়ে। মানে ইন্টু পিন্টু।

জটায়ুঃ ওহ! তাই বল! কোথা থেকে জানা গেল এই তথ্য?

প্যাঁচাঃ ওই একটি হলে আলিমুদ্দিন আয়োজিত প্রগতিশীল লেনিন স্মৃতি লুডো কমপিটিশন চলছিল। সেখানে দর্শকদের মধ্যে একদল কাদাখোঁচা ছিল। তারা পষ্ট দেখেছে।

দুই নম্বর অভিযোগ, দুই পূর্ণ তিনের সাত জন কাকিনিকে নিয়ে ঋতব্রত বিজেপি অফিসের দিকে কোমল চোখে তাকিয়ে ছিল। খবর আছে ওরা ওদের বিস্কুট টিস্কুট খেতে দিয়েছে।

খবর আছে সেই বিস্কুট খেয়ে ঋতব্রত জয়শ্রী-জটায়ু বলে হেসেছে। খবর আছে ওটা ব্যাঙ্গের হাসি ছিল। এই ব্যাপারে ওই গাছে বসবাসকারী লাল পিঁপড়েররা পার্টির কাছে এমন রিপোর্টই দিয়েছে।

এই শুনে জটায়ু বলল, তাহলে আর দেরি কেন বিচারটা হয়ে যাক বেলা থাকতা থাকতে। প্যাঁচাটা বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ শুভস্য শীগ্রম। হয়ে যাক। এই বলে প্যাঁচাটা ফের গাছের কোটরে ঢুকে পড়ল। ফিরে এল একটা মাঙ্কি ক্যাপ নিয়ে। তার পর সেটা জটায়ুকে পরিয়ে দিতে দিতে বলল, এই নাও বিচারপতির টুপি পরে নাও। এবার রায় দান হবে। ঋতব্রত নামের সেই কাকটা কী যেন একটা বলার চেষ্টা করল। অমনি সেলিম আর শজারুগুলো হৈ হৈ বাধিয়ে এমন করল ঋতব্রতর কথা আর শোনা গেল না। হঠাৎ জটায়ু চেঁচিয়ে বলল, চুপ চুপ রায় দিচ্ছি। সবাই চুপ। জটায়ু বলল, সব পক্ষের মতামত শুনে, (নিজের হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে), আমার হাতের এই গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা ঘড়িতে যখন ১২টা বাজল, তখন আমি ঘোষণা করছি, কাদাখোঁচা এবং পিপড়েদের সাক্ষী অনুযায়ী ঋতব্রতর অপরাধ প্রমাণিত। পার্টি ওকে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট দিচ্ছে। ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট মানে, আলিমুদ্দিনের আন্ডারগ্রাউন্ড ঘরে কুড়ি হাজার ‘দাস ক্যাপিটাল’ চাপা দিয়ে আটকে রাখা হবে ঋতব্রতকে আগামী ২০ বছর। ক্যাপিটালের ছোঁয়ায় এক দিন ও শুদ্ধ হয়ে উঠবে। এই সব কথা যখন চলছে তখন হঠাৎ হৈ হৈ শুরু হয়ে গেল, সবাই বলতে শুরু করল ঋতব্রত পালিয়েছে। তার পর দেখলাম সেলিম, জটায়ু, শজারু সবাই ছুটছে ঋতব্রতকে ধরতে। এসব দেখে প্যাঁচাটা্ আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, বিকেলে এস, আমাদের ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে ‘হও ধরমেতে ধীর’-এর সুরে একটা নতুন গান লিখেছি শোনাব। খারাপ লাগবে না। এই বলে প্যাঁচাটাও গাছের কোটরে ঢুকে পড়ল।

Developed by DXDasia