
পাহাড়ি পথের পাশে চারদিক আলো করে ফুটে থাকা এক ফুল
বসন্তের শেষ থেকে গ্রীষ্ম, এই সময় পাহাড়ের রং বদলে যায়। রং বদলে দেয় রডোডেনড্রন। পাহাড়ের উষ্ণতম দিনগুলোয় পাহাড়ের কোলে সে অপরূপা, অদ্বিতীয়া। তার শোভা দেখে মন রোমান্টিক হতে বাধ্য। যাঁরা পাহাড় অথবা প্রকৃতিপ্রেমী, তাঁদের কাছে দার্জিলিং থেকে সিকিম এই সময় আলাদা আকর্ষণের, বড়ো আদরের। ‘প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে অরুণকিরণে তুচ্ছ/উদ্ধত যত শাখার শিখরে রডোডেনড্রন গুচ্ছ।’ ‘শেষের কবিতা’য় লাবণ্য’র প্রেমে হাবুডুবু খেতে নিবারণ চক্রবর্তীর বকলমে অমিত রায় কী আর এমনি এমনি এ লাইন লিখেছিল! এছাড়াও বুদ্ধদেব বসু’র ‘রডোডেনড্রনগুচ্ছ’, মহীনের ঘোড়াগুলির ঝরা সময়ের গান ‘তোমায় দিলাম’ হয়ে এই ফুল দেশ-বিদেশের সাহিত্যচেতনায় জায়গা করে নিয়েছে। জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ উপন্যাসে ডাবলিন উপসাগরের ধারে এক এলাকায় ঝরে-পড়া রডোডেনড্রনের মাঝে লিওপোল্ড ব্লুম বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল নায়িকা মলি ব্লুমকে।

সাদা রডোডেনড্রন
যাঁরা পাহাড় অথবা প্রকৃতিপ্রেমী, তাঁদের কাছে দার্জিলিং থেকে সিকিম এই সময় আলাদা আকর্ষণের, বড়ো আদরের। ‘প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে অরুণকিরণে তুচ্ছ/উদ্ধত যত শাখার শিখরে রডোডেনড্রন গুচ্ছ।’ ‘শেষের কবিতা’য় লাবণ্য’র প্রেমে হাবুডুবু খেতে নিবারণ চক্রবর্তীর বকলমে অমিত রায় কী আর এমনি এমনি এ লাইন লিখেছিল!
উত্তরবঙ্গ, অসম, সিকিম, নেপাল আর তিব্বতে ছড়িয়ে থাকা হিমালয়ের প্রকৃতির কোলে অপূর্ব এই ফুল অদ্ভুত এক মায়াময় আবেশে জড়ায়। পাহাড়ি পথের পাশে চারদিক আলো করে ফুটে থাকে। এক গোলাপ ছাড়া আর রডোডেনড্রনই একমাত্র ফুল যা ইউরোপে সাড়া ফেলেছিল। ফুলের রং টকটকে লাল অথবা গোলাপি। সাদা রঙেরও পাওয়া যায়। তবে খুব বিরল। বাংলার পাহাড়ে সাদা খুব কমই। বাংলায় কোথায় সবচেয়ে বেশি পাব এই লাল ফুল?
দার্জিলিং শহরে মাঝে মাঝে কিছু জায়গায় এই ফুল ফুটে থাকে। সোনাদা বা তাকদার দিকে কিছু ফুল হয়তো পাওয়া যাবে। কিন্তু ফুলের মিছিল দেখতে উঠতে হবে আরও উপরে। সান্দাকফুর রাস্তায় ফুটে থাকে অজস্র রডোড্রেনড্রন। সেখানে বাঁকে বাঁকে সৌন্দর্য। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত এর খেলা চলে নিরন্তর। রং যেন মিশে যায় উপত্যকায়, কুয়াশায়। অনেক পর্যটককে বলতে শোনা যায়, এক বছর অপেক্ষা করা যায় এই ফুলের জন্য। এ ফুল এক বছর বেশি ফোটে, অন্য বছর কম। প্রকৃতি পাল্টে দেয় ফুলগুলো। বরফের সময় সাদা, অন্য সময় সবুজ। আর এই সময় রঙিন। স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘গুরাস’ অথবা ‘লালি গুরাস’। নেপাল, দার্জিলিং, ভুটান এবং সিকিমে দূর থেকে লালি গুরাসে ছাওয়া পাহাড়টিকে তখন দেখতে একেবারে লাল রঙের মনে হয়। সবচেয়ে বেশি গুরাস মেলে দার্জিলিংয়ের সান্দাকফু, সিকিমের হিলে, সোমবারিয়া, লাচেন, সোরেন এবং ভার্সেতে।
রডোডেনড্রন নামটির বাংলা মানে হলো গোলাপ গাছ! আদি ও অকৃত্রিম এশিয়ান ফুল হলেও রডোডেনড্রন নামটি ইউরোপীয়। নামটি এসেছে গ্রীক শব্দ থেকে। শব্দটির অর্থ হলো: “rodon” মানে গোলাপ এবং “Dendron” মানে গাছ। অর্থাৎ Rhododendron মানে গোলাপ গাছ। ওয়াইন ও অন্যান্য পানীয় তৈরি হয় এই ফুল থেকে। হিমাচলে রডোডেনড্রন স্থানীয়ভাবে ‘বুরানশ’ নামে পরিচিত।
জোসেফ ডালটন হুকার নামে ব্রিটিশি উদ্ভিদবিজ্ঞানী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ব্রিটিশ-বাংলায় এসে হিমালয়ের বুকে খুঁজে পেয়ে এই ফুলকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেন। দার্জিলিঙের হিমালয়, রোদ, কুয়াশা আর রডোডেনড্রন অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে হুকারের লেখায়। গবেষকদের মতে, দার্জিলিং থেকেই ইংল্যান্ডে পাড়ি দিয়েছিল রডোডেনড্রন –নিয়ে গিয়েছিলেন উদ্ভিদবিজ্ঞানী জোসেফ হুকার। হুকার পরে বলেছিলেন, এক গোলাপ ছাড়া আর রডোডেনড্রনই একমাত্র ফুল যা ইউরোপে সাড়া ফেলেছিল। এই রডোডেনড্রনের শাখা-প্রশাখায় যখন বিচিত্র রঙের বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরা বসে দুদণ্ড জিরিয়ে নেয়, নিসর্গচিত্র তৈরি হয়। মনপ্রাণ ভরে এই নিসর্গচিত্র উপভোগ করার জন্যই দার্জিলিং-এর সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যানে (Singalila National Park) এপিলের শুরুতে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রথম সিঙ্গালিলা রডোডেনড্রন ও পাখি উৎসব (1st Singalila Rhododendron & Bird Festival)।

অন্যান্য বছরগুলির তুলনায় এবছর স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তাড়াতাড়ি ফুটেছে রডোডেনড্রন । ফুলের প্যাটার্নের পরিবর্তন এবং অসময়ে এই ফুল ফুটতে দেখে গভীর চিন্তায় পরিবেশবিদরা। বিশ্বে উষ্ণায়নের সম্ভাবনা বাড়ছে বলেই ইঙ্গিত তাঁদের। রডোডেনড্রন নেপালের জাতীয় ফুল সেই সঙ্গে ভারতের হিমাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, ইউনাইটেড স্টেট-এর ওয়াসিংটন, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার রাজ্য-ফুল (state flower)। রডোডেনড্রন সিকিম ও উত্তরাখণ্ডের জাতীয় গাছ।
_____________
তথ্যঋণ :
উইকিপিডিয়া
মানবজমিন
আনন্দবাজার পত্রিকা
