বিপ্লবী বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা

কেবল স্বাধীনতা সংগ্রামই নয় বিজ্ঞানসাধনার ভিতর দিয়েও নিজের বিপ্লব জারি রেখেছিলেন মেঘনাদ

প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় মেঘনাদ সাহা বিপ্লবী স্বদেশী আন্দোলনকারী নেতৃত্ববৃন্দের সংস্পর্শে আসেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু এবং শৈলেন ঘোষ। অবশ্য বিপ্লবীদের গূঢ় আন্দোলনপন্থার কারণে ইতিহাসবিদগণের পক্ষে মেঘনাদ সাহার বিপ্লবী আন্দোলনের বিস্তারিত জানা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। সেই সময় বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের স্বাধীনতা আন্দোলনে তৎকালীন আইরিশ রিভোলিউশনারী সিন ফেইন পার্টির স্বাধীনতা আন্দোলন অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলো। জার্মানির সহায়তায় আইরিশ অভ্যুত্থানকারীরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বেশ কিছু গুপ্ত সংগঠন তৈরি করেছিলো।

সিন ফেইন বাঙালিদের মধ্যে আলোড়ন তুলেছিলো কারণ শত্রুপক্ষ ছিলো একই –ব্রিটিশ, যারা এই দুটি জাতির মধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে উপনিবেশ কায়েম করে রেখেছিলো। আইরিশ ন্যাশনালিষ্ট পার্টির আন্দোলন নানা দিক থেকেই উপমহাদেশীয় গান্ধীবাদী আন্দোলনের সাথে তুলনীয় ছিলো। মেঘনাদ সাহা এই ধরনেরই সংগঠন অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তরের সাথে জড়িত ছিলেন।

বিপ্লবী গোষ্ঠীতে যোগ দিয়ে যতীন্দ্রনাথ মুখার্জী (বাঘা যতীন নামে অধিক পরিচিত) এবং পুলিন দাসের মতো নেতার সংস্পর্শে এসে তরুণ মেঘনাদ সাহা সশস্ত্র প্রতিরোধে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। এবং এর ফলে ব্রিটিশদের নানাবিধ চাপে তাঁর জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে যায়। একটি ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্যে একজন পদার্থবিদের এ ধরনের বিপ্লবের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া খুবই বিরল ঘটনা।

বাঙালিদের সংগঠন অনুশীলন সমিতির সাথে ১৯১৫ এর দিকে পাঞ্জাবের বিপ্লবী সংগঠন গদর পার্টির বেশ ঘনিষ্ট সম্পর্ক তৈরি হয়। তবে এই দলটির কর্মকান্ড পরিচালিত হত কানাডা ও সানফ্রান্সিসকো প্রবাসী বিভিন্ন বিপ্লবী নেতার মাধ্যমে। বার্লিনে অবস্থিত গদর বাহিনীর কিছু সদস্য বাঘা যতীনকে অবহিত করেন যে জার্মানীর কাইজার উইলহেম ভারতীয় বিপ্লবীদের প্রতি সহানুভুতিশীল এবং জার্মানী এই বিপ্লবীদের অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করতে আগ্রহী। এই কর্মকাণ্ডের তদারকিতে ইন্ডিয়ান রেভোলিউশন কমিটি নামে বার্লিনে একটি সংগঠন তৈরি হয়। কাইজারের মারফত বাঘা যতীন জানতে পারেন হেনরী নামের অস্ত্রবাহী একটি জাহাজ সিঙ্গাপুর থেকে ফিলিপাইন হয়ে সুন্দরবনে ভিড়বে।
মেঘনাদ সাহা এবং যাদুগোপাল মুখার্জীকে এই জাহাজ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে নিয়ে আসার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে ১৯১৫ এর ২ জুন, হেনরী যখন সাংহাইয়ের বন্দরে ভেড়ে, তখন বৃটিশ এবং ফরাসী বাহিনী জাহাজটিতে তল্লাশি চালিয়ে সব অস্ত্র উদ্ধার করে নিয়ে যায়। জাহাজটি সুন্দরবনে না গিয়ে জার্মানিতে ফিরে যায় এবং মেঘনাদ সাহা খালি হাতে ফিরে আসেন।

১৯১৯ সালটি শুধু মেঘনাদ সাহার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এ বছরটি ভারতীয় মুক্তিকামী আন্দোলনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার ঠিক পর-পরই এইবছর বৃটিশ শাসকগোষ্ঠী বিতর্কিত রাওলাট আইন জারি করে। এই আইনের আওয়ায় যে কোন ব্যক্তিকে সন্দেহের বশে এবং কোনো রকম আপিল করার সুযোগ প্রদান ছাড়াই আটক করে রাখা যাবে এবং তাদের আইনি সুবিধাবঞ্চিত করা যাবে। এই আইনের বিরুদ্ধে সারা ভারতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে আন্দোলনের তীব্রতা বাংলা এবং পাঞ্জাবেই সবচেয়ে বেশী দেখা যায়। এই আইনের প্রেক্ষিতেই মহাত্মা গান্ধী সত্যাগ্রহ চালু করেন। ব্রিটিশ সরকার সেই সময় যেখানে সম্ভব হয়েছে কঠোরভাবে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করেছে।

১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসারের জালিয়ানওয়ালাবাগে একটি নৃশংস ঘটনা ঘটে। কর্নেল রেজিনাল্ড ডায়ের নিরস্ত্র জনগণের উপর নির্বিচারে গুলি করার আদেশ দিলে প্রচুর প্রাণহানি ঘটে। মেঘনাদ সাহা এর প্রতিবাদে লেখালেখি করেন। বিদ্যমান নৃশংসতায় মনোবল হারিয়ে তিনি পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করেন। নিজের জ্ঞান দিয়ে তিনি ভারতের উন্নয়নকল্পে মনোনিবেশ করেন।
মেঘনাদ সাহা ভারতবর্ষের নানাবিধ সমস্যা যেমন: নদী ব্যবস্থাপনা, রেলওয়ে পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ভারতের বিদ্যুৎব্যবস্থা এসব নিয়ে লেখালেখি করেন এবং ভারতজুড়ে এসব বিষয়ে সাংস্কৃতিক সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেন। তাঁর সারা জীবনের অন্যতম প্রেরণা ছিলো জাতির জন্য বিজ্ঞান সচেতনতা এবং বিজ্ঞানের মাধ্যমেই জাতির স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা। ১৯৩১ সালে তিনি Academy of Sciences of the United Provinces of Agra and Oudh প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩২ সালে তিনি এর প্রেসিডেন্ট নিয়োজিত হন।

মানবীয়করণে বিজ্ঞানের ভুমিকা মেঘনাদ সাহার আরেকটি অনুপ্রেরণা ছিলো। একাডেমির প্রেসিডেন্ট পদ নেওয়ার দুই বছরের মাথায় তিনি Indian Science News Association প্রতিষ্ঠা করেন। এই এসোসিয়েশনের সহায়তায় তিনি Science and Culture নামে একটি জার্নাল প্রকাশ করেন। ১৯৫৬ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি একই জার্নালের সম্পাদক হিসেবে কাজ করে গেছেন। প্রখ্যাত ব্রিটিশ জার্নাল Nature এর আদলে গঠিত এই জার্নালটিতে বিজ্ঞানের সামাজিক অবদানসমূহ তুলে ধরা হতো এবং অজ্ঞানতা ও কুসংস্কার দূর করে সাধারণ মানুষের মাঝে বিজ্ঞানের ধারনা প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস চালানো হতো। সাহা আশা করেছিলেন এই জার্নালের লেখাগুলোতে সাধারণভাষায় গবেষনাপত্র প্রকাশ করা হবে যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হবে এবং বিজ্ঞান প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভারতের সমস্যাগুলো এই জার্নালের গবেষণাপত্রে উঠে আসবে। এর মাধ্যমে তিনি চেয়েছিলেন ভারতীয় সমাজে সাংস্কৃতিক এবং মানবীয় চর্চা বৃদ্ধি পাবে, জাত-পাতের সমস্যা দূর হবে, মানুষের মধ্যে সমতা তৈরি হবে এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির গঠনমূলক সমালোচনা উঠে আসবে।

Scince and Culture জার্নালটির প্রথম ভলিউমে মেঘনাদ সাহার নিজেরই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রকাশ পায়। এর মধ্যে রয়েছে “Ultimate constituents of matters” যাতে সমসাময়িক নিউক্লিয় পদার্থ বিজ্ঞান, বোরের এটমিক মডেল এবং তেজস্ক্রিয়তা বিষয়ক অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। “The march towards abosolute zero” তে জার্মানীতে নার্নস্টয়ের গবেষনাগারে থাকাকালীন তাঁর পোস্টডক্টরাল কাজকর্ম তুলে ধরেন। “The existence of free magnetic poles” এ ব্রিটিশ পদার্থবিদ পল ডিরাকের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার ধারনা এবং একক চৌম্বক মেরুর অস্তিত্বের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এবং “Spectra of comets” গবেষনাপত্রে সাহার প্রাথমিক গবেষক জীবনের জোতিঃপদার্থবিদ্যার বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয় যাতে তাঁর ধুমকেতুর বর্ণালী বিষয়ক গবেষনা উঠে আসে।

এই জর্নালের সম্পাদকীয়তে তিনি খোলা মনে ভারতীয় সরকারের বিজ্ঞান বিষয়ক নীতিমালার সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে তিনি ভারতের স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর বিভিন্ন উদ্যোগের সমালোচনা করেন। তিনি মনে করতেন নেহেরু বিজ্ঞান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠার জন্য খুবই তাড়াহুড়া করছেন এবং এটি করতে গিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি, ভারতের উপযোগী প্রযুক্তির প্রতি জোর দিচ্ছেন না। নেহেরু একজন স্বপ্নদ্রষ্টা কিন্তু তাঁর বৈজ্ঞানিক দক্ষতার অভাবের কথা সাহা তাঁর সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া সাহা একেবারে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অংশ থেকে থেকে উঠে আসা মানুষ তাই তাঁর পক্ষে সাধারণ মানুষের চিন্তাধারা, প্রয়োজনীয়তা এসব উপলব্ধি করা সহজ, কিন্তু অভিজাত পারিবারিক ইতিহাসের নেহেরুর পক্ষে সাধারণের প্রয়োজনীয় সবকিছু উপলব্ধি করা সহজ নয়। এসবের ফলের সাহার সাথে নেহেরুর তিক্ততাও তৈরি হয়।

ভারতীয় অন্যান্য স্বনামধন্য গবেষকের তুলনায় সাহার জীবনে ছিলো অনেক নাটকীয় মোড়। তিনি হতদরিদ্র, অশিক্ষিত এবং নিন্মবর্ণের পরিবার থেকে দুঃখ-কষ্টের কষাঘাতে জর্জরিত হতে হতে বড় হয়েছেন। তারপরেও তিনি নিজেকে ভারতীয় ‘ভদ্রসমাজে’ প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন যথেষ্ট প্রভাবের সাথে। তিনি শুধু একাডেমিক দিক থেকেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন নি বরং একজন সাংগঠক হিসেবে বিজ্ঞানকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সারা ভারতের মানুষের মাঝে।

মেঘনাদ সাহার বিপ্লবী চরিত্রটি বাঙালি নেতৃত্বের দ্বারা প্রভাবিত ছিলো, যারা গান্ধীবাদী আন্দোলনের বিপরীতে সশস্ত্র সংগ্রামে উদ্বু্দ্ধ হয়েছিলো। সাহার বেড়ে ওঠার সময়কালীন রাজনৈতিক ও বৃদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ তাঁর ক্যারিয়ারে প্রবলভাবে ছাপ রেখে গিয়েছিলো। তাঁর চারিত্রিক বৈচিত্র্য তাঁর জীবনযাত্রার বৈচিত্র্য থেকেই উঠে এসেছে। বাঙ্গালী ও ভারতীয় তরুণ সমাজের কাছে তিনিই হতে পারেন সবচেয়ে কাছের উদাহরণ এবং সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

(‘মুক্তমনা’ ব্লগ থেকে বেঙ্গলেনসিস-এর রচনার নির্বাচিত অংশ)

Developed by DXDasia