বাংলায় ‘প্রবাদ’ শব্দটির পথিকৃৎ ছিলেন সাহেব জেমস লঙ্‌

বাংলা লোকসাহিত্যের অন্যতম অংশ ‘প্রবাদ’

গাছের শিকড়টা যেমন মাটির সঙ্গে জড়িত এবং তাহার অগ্রভাগ আকাশের দিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছে, তেমনি সর্বত্রই সাহিত্যের নিম্ন অংশ স্বদেশের মাটির মধ্যেই অনেক পরিমাণে জড়িত হইয়া ঢাকা থাকে; তাহা বিশেষরূপে সংকীর্ণরূপে দেশীয় স্থানীয়। তাহা কেবল দেশের জনসাধারণেরই উপভোগ্য ও আয়ত্তগম্য; সেখানে বাহিরের লোক প্রবেশের অধিকার পায় না। সাহিত্যের যে অংশ সার্বভৌমিক তাহা এই প্রাদেশিক নিম্নস্তরের থাকটার উপরে দাঁড়াইয়া আছে। এইরূপ নিম্নসাহিত্য এবং উচ্চ সাহিত্যের মধ্যে বরাবর ভিতরকার একটি যোগ আছে। যে অংশ আকাশের দিকে আছে তাহার ফুল-ফল ডাল-পালার সঙ্গে মাটির নিচেকার শিকড়গুলার তুলনা হয় না, তবু তত্ত্ববিদ্‌দের কাছে তাহাদের সাদৃশ্য ও সম্বন্ধ কিছুতেই ঘুচিবার নহে।

তথাকথিত ‘উচ্চ সাহিত্যে’র সঙ্গে ‘লোকসাহিত্যে’র যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তা বোঝাতে ‘গ্রাম্য সাহিত্য’ প্রবন্ধে এই কথাগুলোই লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। লোকসাহিত্য হল সেই সাহিত্য যা স্রষ্টার মুখে সৃষ্টি হয়ে মুখে মুখেই প্রসার লাভ করে, বিবর্তনকে স্বীকার করে এবং মানুষের অভিজ্ঞতাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে। শুধুমাত্র মধুসূদন-বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রের লিখিত সাহিত্যই নয়, মৌখিক তথা লৌকিকসাহিত্যও সমগ্র লোকসাহিত্যের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য জায়গার অধিকারী। আর এই মৌখিকসাহিত্য বা লোক সাহিত্যের অন্যতম একটি অংশ ‘প্রবাদ’ এবং বাংলায় এই ‘প্রবাদ’ শব্দটির প্রথম পথিকৃৎ কিন্তু একজন ইংরেজ ভাষা বিজ্ঞানী –  রেভারেণ্ড জেমস লঙ্‌।

এখন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রবাদের ব্যবহার নিতান্ত সীমিত হলেও দীর্ঘদিন পর্যন্ত প্রবাদের ব্যবহার ছিল সুদূরপ্রসারী। সেই ব্যবহারিক প্রয়োজনেই প্রবাদ চর্চায় বিশেষ উৎসাহ লক্ষ্য করা যেত প্রথম দিকে।

‘পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে।’

‘বিলাত ঘুরে মক্কা যাওয়া’

‘দুষ্ট গরুর চেয়ে শূণ্য গোয়াল ভালো’প্রবাদের জনপ্রিয়তার মূলে ছিল অভিজ্ঞতার সাযুজ্য। দীর্ঘদিনের প্রাত্যহিক ও সামাজিক জীবনের অভিজ্ঞতাই প্রবাদগুলিতে প্রতিফলিত হয়, তাই প্রবাদ সহজেই গ্রহণযোগ্যতা পায়। বাংলার প্রবাদ দীর্ঘকাল ধরে সংগৃহীত হয়ে আসছে এবং সংগৃহীত প্রবাদের সংখ্যা হাজারের বেশি। তবে যে পরিমান প্রবাদ সংগৃহীত হয়েছে, প্রবাদ সম্পর্কিত আলোচনা ও বিশ্লেষণ সে পরিমাণে হয়নি। বাঙালির আচরণগত বৈশিষ্ট্য, মানব চরিত্রের সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ব, ধর্মীয় জীবন ও ব্যবহারিক জীবনের নানা অজ্ঞাত, আকর্ষনীয় ও উল্লেখযোগ্য তথ্য জানা যেত প্রবাদ থেকে।

‘আকন্দে যদি মধু পাই তবে কেন পর্ব্বতে যাই’

‘চালে ফলে কুষ্মাণ্ড হরের মার গলায় গলগণ্ড’

‘আনিলাম মূলা পোঁদের হলো শুলা’

১৩০১ সালে রবীন্দ্রনাথের লেখা এবং ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বাংলার ছেলেভুলানো ছড়া’ নামক সুদীর্ঘ আলোচনাকে কেন্দ্র করেই বাংলা লোকসাহিত্য আলোচনার যথার্থ সচেতন সূত্রপাত হয়েছিল বলা চলে। বাংলা প্রবাদ চর্চার ইতিহাসে সবথেকে পুরোনো বই হল ‘কবিতা রত্নাকর’ (১৮২৫), যা ‘বঙ্গদূত’ পত্রিকার সম্পাদক নীলরতন হালদার কর্তৃক সংকলিত এবং শ্রীরামপুর থেকে প্রকাশিত। বইটিতে ২০৩টি সংস্কৃত প্রবাদের ইংরেজী ও বাংলা অর্থ দেওয়া হয়েছিল।

দীনবন্ধু মিত্র’র লেখা ‘নীলদর্পন’ নাটকের ইংরেজী অনুবাদের প্রকাশক ভারতপ্রেমিক জেমস লঙ্‌ সাহেবের নাম বাংলা প্রবাদ চর্চার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রতোভাবে যুক্ত। লঙ্‌ সাহেব সংকলিত বাংলা প্রবাদ বইটিই পরবর্তীকালে বাংলা প্রবাদ সংকলন ও সংগ্রহে বিশেষভাবে উৎসাহ দিয়েছিল। বাংলা প্রবাদ সংকলন প্রকাশে তাঁর একদিকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য প্রীতি, অন্যদিকে বিশেষভাবে লোক-সাহিত্যের একনিষ্ঠ অনুরাগী রূপে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। বাংলা প্রবাদ সংকলনে লঙ্‌ সাহেবকেই সর্বপ্রথম সুচিন্তিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে দেখা যায়। তিনিই এ ব্যাপারে প্রথম বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর স্বাক্ষর প্রদান করেন। তাছাড়া ইংরেজী ‘Proverb’ শবদটির অর্থে ‘প্রবাদ’ শব্দের ব্যবহারে জেমস লঙ্‌ সাহেবকেই প্রথম পথিকৃতের সম্মান দিতে হয়।  

জেমস লঙ্‌-এর জন্ম আয়ারল্যাণ্ডে। প্রথম জীবনে বেশ কিছুটা সময় রাশিয়ায় কাটানোর পর ১৮৩৯ খ্রীস্টাব্দে তিনি চার্চ অফ ইংল্যাণ্ড-এর নিম্নপদস্থ ধর্মযাজকের পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৮৪০-এ ভারতে আসেন মিশনারী রূপে এবং চার্চ মিশনারী সোসাইটির অধীন কলকাতায় মীর্জাপুরের একটি বিদ্যালয়ের দায়ত্বভার নেন। ১৮৪৮ সালে প্রণয়ন করেন ‘হ্যান্ড বুক অফ বেঙ্গল মিশনস’। লঙ্‌ ছিলেন ভাষা বিজ্ঞানের একজন একনিষ্ঠ ছাত্র এবং অনেকগুলি ইউরোপীয় ভাষায় তাঁর দক্ষতা ছিল। কলকাতায় এসে তিনি বাংলা ভাষাও বেশ রপ্ত করে নেন, একাধিক ভারতীয় ভাষায় তাঁর অধিকার জন্মায়। ১৮৫০ সালে লঙ্‌ ‘সত্যার্ণব’ নামে একটি বাংলা মাসিক পত্রিকাও সম্পাদনা করেন, যদিও খীষ্টধর্ম প্রচারের জন্যই পত্রিকাটি প্রকাশিত হত। ১৮৫১ সালে ২১ পৃষ্ঠার একটি বই ‘বেঙ্গলি প্রভার্বস্‌’ নামে প্রকাশ করেন। তাতে ১৭৬টি প্রবাদ ও সেগুলির প্রাসঙ্গিক টীকা ছাপা হয়েছিল। এই প্রথম লঙ্‌ প্রত্যক্ষভাবে বাংলা প্রবাদ চর্চার সঙ্গে যুক্ত হন। এর ষোল বছর পরে ১৮৬৮-তে তিনি ‘বেঙ্গলি সোসাল সাইয়েন্স অ্যাসোসিয়েশন’-এ ‘পপুলার বেঙ্গলি প্রভার্বস’ বিষয়ে একটি গবেষণা পত্র পাঠ করেন। এই বছরই লঙের ‘প্রভাবমালা’ প্রকাশিত হয়। ১৮৬৯-এ ‘প্রবাদমালা’র ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়।

প্রবাদ চর্চায় নিবেদিত প্রাণ রেভারেণ্ড লঙ্‌ প্রবাদের গুরুত্ব যে ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন তেমনটি সে যুগে অন্য কোনও ইউরোপীয় মিশনারীকে অনুধাবন করতে দেখা যায়নি। লঙ্‌ বুঝেছিলেন জনপ্রিয় চালু প্রবাদ থেকে জনমানসের পরিচয় লাভ সম্ভব। লঙ্‌ বিশ্বাস করতেন, “The genius spirit, and will of a nation are discovered in its proverbs.”

 

  তথ্যসূত্রঃ বাংলা লোকসাহিত্য চর্চার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, বরুণকুমার চক্রবর্তী

Developed by DXDasia