মহারাজ, একি সাজে : কথাকলি নৃত্যের দিকপাল কলামণ্ডলম গৌতম

শ্মশান তো কতবার দেখেছি, গেছিও অনেকগুলো দিন তার আগে। কিন্তু সেদিনের যাত্রা ছিল অন্যরকম। দুটো দিন আগেই যাঁর সঙ্গে এত কথা বললাম আজ তাঁকেই দেখতে শ্মশানে যেতে হচ্ছে, এই বিস্ময় থেকে আমি তখনও অবধি বেরোতে পারছিলাম না। আমার সঙ্গে ছিলেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে কথাকলি নৃত্যের অধ্যাপক কলামণ্ডলম ভেঙ্কিট স্যার ও তাঁর পুত্র অভিরাম। অভিরামই গাড়ি চালাচ্ছিল। মহাশ্মশান রোড ধরে সোজা এগিয়ে বাঁদিকে শ্মশানের ভেতর ঢুকে গাড়ি রেখে আমরা তিনজনে ছুটলাম ইলেকট্রিক চুল্লির দিকে। ওপরের প্ল্যাটফর্মটায় উঠেই সেই দৃশ্য: বাংলার গর্ব, বাংলায় কথাকলি নৃত্যের দিকপাল কলামণ্ডলম গৌতম শায়িত। সদ্য সুরতহাল হয়ে এসে যে শুয়েছেন মুখের প্রশান্তি দেখে তা বোঝার উপায় নেই। ওঁর ডাকনাম রাজা। সত্যিই এক মহারাজার মতো গৌতমদা শ্মশানে তখন শুয়ে আছেন কিছুক্ষণ বাদে অগ্নিতে মিশে যাবেন বলে। সেদিন ওঁর জন্মদিনও বটে!

সেই দু-হাজার উনিশ সালের ৭ সেপ্টেম্বরের তিন-চার বছর আগে আমার কাছে সন্ধ্যাবেলায় একটা ফোন আসে। আমি যে সংস্থার সঙ্গে যুক্ত তাঁরা ফি-বছর একটা নৃত্যোৎসব করে থাকেন রথের সময়। তিনিও সুযোগ পেতে চান। ফেসবুকে ইতিমধ্যেই আমি তাঁর প্রোফাইল দেখেছি। শুধু ফেসবুকে কেন দু-হাজার পাঁচ-ছয় সাল নাগাদ ‘ইন্ডিয়া টুডে’ পত্রিকার কোনও এক সংখ্যায় কলকাতার কিছু কৃতী মানুষের ছবি ও পরিচিতি ছাপা হয়েছিল। সেই সংখ্যাতেও উনি ছিলেন। ছবিতে কলামণ্ডলম গৌতম- টাক-পড়া গোল মাথা, আদুর গা আর পরনে ধুতি। খুব মনে রাখার মতো চেহারা নয়, কিন্তু দারুণ একটা হাসি সারাক্ষণ মুখে লেগে। সুতরাং, ওপার থেকে উনি যতই সেদিন বিনীত কণ্ঠে নিজের পরিচয় দিন না কেন, আমি নাম শুনেই বুঝেছি কার ফোন আমার কাছে এসে পৌঁছেছে। তবে মুশকিল হল আমাদের যে অনুষ্ঠানের জন্য উনি ফোনটা করেছেন সেটি সদ্য শেষ হয়েছে। কিন্তু আমি সময় নিলাম না। দু-এক মাস পরেই জন্মাষ্টমী। বললাম, “আপনি ওই অনুষ্ঠানে পারফর্ম করবেন?” উনি স্বাভাবিকভাবেই তখন রাজি। এক কথায়।

জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠান আমার কাছে কোনওদিন ভুলতে না পারা একটা অভিজ্ঞতা। বিরাট। আমি এর আগে কখনও সামনে থেকে কোনও কথাকলি নৃত্যশিল্পী-কে দেখিনি সাজসজ্জা করতে। টিভিতে হয়তো দেখেছি কিংবা কোনও ডক্যুমেন্টারি ছবিতে, কিন্তু কাছ থেকে এই প্রথম। আর কলামণ্ডলম গৌতমের ‘মেক-আপ’ দেখা সৌভাগ্যও বটে। গৌতমদা ‘স্ত্রীবেশম’ পড়ছেন, নাচবেন ‘পুতনামোক্ষম’ পালা। ওঁর ছাত্র প্রলয় সেজেছে কৃষ্ণ। চালবাটা দিয়ে থুতনির কাছে ‘চুট্টি’ তৈরি করা থেকে প্রলয়কে সাজানো আর নিজের সাজা, প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টার সাজ নিজে হাতে করলেন গৌতমদা। আমি মুগ্ধ দর্শক। এত ধৈর্য কোনও মানুষের থাকতে পারে! গৌতমদার আরেকটি গুণ ছিল বিরতিহীন কথা বলে যেতে পারা। কথা বলতে পারলে উনি বোধহয় আর কিছু চাইতেন না। কত কথা বলে যাচ্ছিলেন গৌতমদা! কেরালা কলামণ্ডলমের কথা, পিয়ালদার সঙ্গে একসঙ্গে নাচের কথা, কলকাতার নৃত্যশিল্পীদের সঠিক মেন্টরশিপের কথা, কৃষ্ণ-পুতনার সম্পর্কের কথা এবং আশ্চর্যজনকভাবে ওঁর মৃত পিতার কথা। সেদিন বুঝিনি ওই অত ঘণ্টার মেক-আপের সময় আমার আর ওঁর আদান-প্রদান আসলে আমাদের মধ্যে একটা গভীর বন্ধুত্বের গোড়াপত্তন করছে।

এরপর থেকে প্রায়ই আমাদের দরকারে অদরকারে ফোনালাপ চলত এবং আমি অনেক সময়ই গৌতমদার বেহালার বাড়িতে যেখানে ওঁর ‘নাট্যলোক’ নৃত্যগোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড চলত, সেখানে পৌঁছে যেতাম। কখনও রিহার্সাল দেখতাম, কখনও হয়তো কোনও ইন্টারভিউ করতে গিয়েছি আর কখনও শুধুমাত্র নিখাদ আড্ডা মারতে উপস্থিত। বাচ্চা ছেলের মতো গৌতমদা কথাকলির নানা গল্প করতেন, ওঁর বইপত্তর দেখাতেন। একদিন এরকমও হয়েছে উনি বসে বসে মোহিনীআট্যম নৃত্য সম্পর্কে কথা বলছেন; হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে কলামণ্ডলম ঘরানার মোহিনীআট্যম আর ভারতী শিবাজির মোহিনীআট্যম-এর মধ্যে প্রাথমিক পার্থক্যটা ঠিক কোথায়, সেটা উনি নেচে আমায় বুঝিয়ে দিলেন! ভারতের সব রকম শাস্ত্রীয় নৃত্যেই ওঁর জ্ঞান ছিল মারাত্মক।

উনিশশো সাতানব্বই-আটানব্বই সাল নাগাদ কলকাতার দুটি ছেলে- গৌতম ঘোষাল আর পিয়াল ভট্টাচার্য কেরালার কলামণ্ডলমে কথাকলি নৃত্য প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। যত সহজে লেখা গেল তার থেকে বহু, বহুগুণ কঠিন কাজ ছিল সেটা। একে তো দক্ষিণ ভারতীয় ছাড়া সুযোগ পাওয়াই মুশকিল, খুব সম্ভবত এতগুলো বছরে পূর্ব ভারতের কেউ আজ অবধি কথাকলিতে আর কখনও সুযোগ পায়নি, তার ওপর সাতটা বছর ওখানকার ওই ভয়ঙ্কর কঠিন প্রায় মিলিটারিবৎ ট্রেনিং। সেসব যুদ্ধ জিতে গৌতমদারা যে শুধু সফলতার সঙ্গে কলামণ্ডলম থেকে পাশ করে বেরিয়েছিলেন তা নয়, ওখানকার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কিছু ঝামেলা হওয়ায় মালায়ালি ভাষা শিখে প্রতিটি বছর ওই মালায়ালিতেই পরীক্ষা দিয়ে প্রায় ফার্স্ট-সেকেন্ড হয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কলকাতায় ফিরলেন যখন তৎকালীন কলকাতার কথাকলি নৃত্যের যে একটা আলোহীন, নিস্তরঙ্গ অবস্থা সেটা যেন কিছুদিনের মধ্যেই গৌতম-পিয়াল এই বন্ধুদ্বয় বদলে দিতে চেষ্টা করলেন। কোথাও যেন রটে গেল বাঙালিরাও দক্ষিণ ভারতীয় নৃত্যশৈলি একেবারে দক্ষিণ ভারত থেকে শিখে আসতে পারে। কলকাতার কোনও তথাকথিত দক্ষিণ ভারতীয় নৃত্যশিক্ষক কেবলমাত্র সেসবের ধারক-বাহক হয়ে থাকতে পারে না। আমি পরবর্তীকালে অনেকবার বহু নৃত্যশিল্পীর কাছে শুনেছি গৌতমদা এবং পিয়ালদা কেরালা থেকে কোর্স শেষ করে ফিরে আসার পর রবীন্দ্রসদনে ‘কীচক বধম্’ পালা নৃত্যাভিনয় করেছিলেন। কলকাতায় যতবার যতগুলো শাস্ত্রীয় নৃত্যের আসর বসেছে সেই মণিপুরিতে প্রীতি পাটেল-শ্রুতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের যুগলবন্দি হোক, গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র ও গিরিজাদেবীর যুগলবন্দি হোক কিংবা অন্য স্মরণীয় কিছু, গৌতম-পিয়ালের ওই পালা সেই সবের মধ্যে একটি অন্যতম যুগান্তকারী নৃত্যের আসর ছিল। এবং কলকাতার পরবর্তী প্রজন্মের বহু শিল্পী বিশেষত কথাকলি শিখবে বলে মনস্থির করেছিল সেই অনুষ্ঠান দেখার পরেই!

জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠান আমার কাছে কোনওদিন ভুলতে না পারা একটা অভিজ্ঞতা। বিরাট। আমি এর আগে কখনও সামনে থেকে কোনও কথাকলি নৃত্যশিল্পী-কে দেখিনি সাজসজ্জা করতে। টিভিতে হয়তো দেখেছি কিংবা কোনও ডক্যুমেন্টারি ছবিতে, কিন্তু কাছ থেকে এই প্রথম। আর কলামণ্ডলম গৌতমের ‘মেক-আপ’ দেখা সৌভাগ্যও বটে।

তবে গৌতম ঘোষালের সঙ্গে পিয়াল ভট্টাচার্যের যৌথতা চিরস্থায়ী হয়নি। গৌতমদার বহু সম্পর্ক, বন্ধুত্ব বা কোলাবরেশন ভেঙে ভেঙে গেছে। গৌতম সম্পর্কের সূচনা জানতেন কিন্তু ও ব্যাপারে তাঁর ধৈর্য ছিল বাচ্চা ছেলের মতো। বেশিদিন যেন ধরে রাখতে পারতেন না। কিংবা এ-ও সম্ভব তাঁর মতো এমন অসীম প্রতিভাধরকে তাঁর সময়, তাঁর শহর কিংবা তাঁর সম্পর্ক- কেউ-ই কখনও অনুধাবন করে উঠতে পারেননি। নাহলে এমন সদাহাস্যময় এক ব্যক্তিত্বকে কেন বেছে নিতে হবে আত্মহননের পথ? সব চেয়ে বড়ো কথা কেন আমরা একবার টের পেলাম না উনি সে সময় ফেসবুকের দেওয়ালে যে কথাগুলো লিখে রেখে যাচ্ছেন সেগুলো আসলে গভীর বিরহের চিহ্ন? মৃত্যুর কয়েক দিন আগে শেয়ার করলেন নীরেন চক্রবর্তীর কবিতা, ‘যাবার বেলায়’ : “নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের বন্ধু যারা,/ তাদের আমি দেখছি, তবে/ দিচ্ছি না আর কাউকে সাড়া।/ ডাকছে তাড়া, ডেকেই যাচ্ছে, / বড্ড ভালো বাসত যে-যে,/ তাই বলে কি ফিরব নাকি, / ফিরতে ভীষণ ভয় করে যে।” শেষের দিন লিখলেন, “নো মোর ফাইট, নো মোর বেগিং, নো মোর কোয়ারেল/ ওনলি পিস রিসাইডস নাও অ্যান্ড হেন্সফোর্থ।” কার সঙ্গে আর ঝগড়া চাইলেন না গৌতমদা? কার কাছে, কীসের এত ভিক্ষা চাইতে হত? ঝগড়াই বা কেন? ওঁকে এমন চিরশান্তি দিয়ে কার কী লাভ হল? এত বিদেশ ট্যুর, এত অনুষ্ঠান, এত ছাত্রছাত্রী আর সমস্ত ক্রিয়েটিভিটির মধ্যে কোনও শুশ্রুষা কেন পেলেন না এমন প্রতিভাধর, গুণী একজন শিল্পী?

কলামণ্ডলম গৌতমের শেষ স্ক্রিপ্ট ছিল ‘গীতোপদেশম’। সেই জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে ওঁকে আমরা শ্রীমদ্ভগবতগীতা উপহার দিয়েছিলাম। বারবার আমায় বলতেন ওই গীতা থেকেই ‘গীতোপদেশম’। কথক আর কথাকলির অপূর্ব মেলবন্ধনের শৈলী। উনি ছাড়া বোধহয় এমনভাবে কেউ ভাবতে পারতেন না। ইউরোপ, দিল্লি, কলকাতার দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে যেতেন ‘গীতোপদেশম’ দেখে।

সেদিন কেওড়াতলা মহাশ্মশানের চুল্লিতে যখন তিনি প্রবেশ করেছেন তাঁর প্রিয় ছাত্রছাত্রী রম্যানী, প্রলয় আর দিব্যেন্দুর কান্নার উচ্চধ্বনি যখন শ্মশানের আকাশ-বাতাসকে কাঁদিয়ে তুলছে; আমি, অভিরাম আর কলামণ্ডলম ভেঙ্কিট স্যার বেরিয়ে আসছি। স্যারের চোখেও জল। একটা কথাই বললেন, “ও বড়ো অভিমানী ছিল। কিন্তু গৌতমের মতো শিল্পী আর হয়তো আসবে না। বিগ লস!”

(চলবে…)

_____
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও নানা শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর নতুন ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু।

Written by