রবি ঠাকুরের বাঘ শিকার

দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের অভিযান

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মাঝেমধ্যেই জমিদারির কাজ ছেড়ে বেরিয়ে পড়তেন হিমালয়ের পথে। সেবার হিমালয়ে যাওয়ার আগে জমিদারি দেখার দায়িত্ব দিয়ে গেলেন পঞ্চম ছেলে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর। দেবেন্দ্রনাথ ছেলেকে বলে গেলেন – কলকাতায় বসে জমিদারি দেখা চলবে না। যেতে হবে শিলাইদহে।

সে সময়ে শিলাইদহের জমিদারিতে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে গোলমাল চলছিল। যাই হোক, পিতার আদেশমত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ চললেন শিলাইদহ। সঙ্গে নিলেন ছোটো ভাই রবিকে। সদ্য আড়াই মাস আগে দেবেন্দ্রনাথের সাথে শিলাইদহ থেকে ঘুরে গেছিলেন রবি। তাও আবার চললেন। কারণ শাসনহীন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ছিল রবি ঠাকুরের কাছে খুবই আদরের। রবি জানতেন শিলাইদহে তাঁকে শাসন করার কেউ নেই। বেশ মজা হবে।

রবি ও তার জ্যোতিদাদা পৌঁছোলেন শিলাইদহ। উঠলেন শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে। বয়সের পার্থক্য থাকলেও 'জ্যোতিদাদা'র সঙ্গে রবির সম্পর্কটা ছিল অনেকটাই বন্ধুর মত।

শিলাইদহে ছোট্ট রবি অনেকটা সময় কবিতা লিখতেন। কবিতা লেখার পাশাপাশি রবি বের হতেন ঘোড়ায় চড়ে। আর ঘুরে বেড়াতেন শিলাইদহের এদিকসেদিক। জ্যোতিদাদা নিজেও ঘোড়ায় চড়া খুব পছন্দ করতেন। জ্যোতিদাদা চড়তেন বড় ঘোড়ায় আর রবি চড়তেন টাট্টু ঘোড়ায়। ঘোড়ায় চড়ে রবি সোজা চলে যেতেন শিলাইদহের রথতলার বড়ো মাঠে। মাঠটি ছিল রবির খুব প্রিয় জায়গা।

শিলাইদহের নামকরা শিকারী ছিলেন বিশ্বনাথ। তিনি মাঝেমাঝেই আসতেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথের কাছে। বিশ্বনাথ শিকারীর কাছে শিকারের গল্প শুনে শুনে শিকারের প্রতি প্রবল আগ্রহ তৈরি হয় দু'ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথের মনে।

শিলাইদহের জঙ্গলে তখন মাঝে মাঝে বাঘ পড়ত। বিশ্বনাথ শিকারী একদিন এসে দু'ভাইকে খবর দিল যে শিলাইদহের জঙ্গলে বাঘ এসেছে। বাঘ-শিকারের ইচ্ছা  জ্যোতিদাদার মনে আগে থেকেই ছিল। ব্যাস! বন্দুক বাগিয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তৈরি হলেন বাঘ শিকারের জন্য। সাথে নিলেন ছোট্ট রবিকেও।

শিলাইদহের ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের আলো ছায়াতে বাঘ চোখেই দেখা যায় না। একটা মোটা বাঁশগাছের গায়ে কঞ্চি কেটে কেটে মইয়ের মতো বানানো হল। তৈরি হল মাচা। জ্যোতিদাদা সেই মাচায় উঠলেন বন্দুক হাতে। ভালো বন্দুক চালাতে জানতেন জ্যোতিদাদা।

এদিকে রবির পায়ে জুতো নেই। শিকারী বিশ্বনাথ ইশারা করলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে। জ্যোতিদাদা অনেকক্ষণ বাঘ দেখতেই পেলেন না। অনেকক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে শেষকালে ঝোপের মধ্যে বাঘের গায়ের একটা দাগ দেখতে পেলেন জ্যোতিদাদা। ছুঁড়লেন গুলি। গুলি গিয়ে কোনোভাবে লাগল বাঘের শিরদাঁড়ায়। ব্যস। বাঘের অবস্থা খারাপ। বাঘ আর উঠতে পারল না।

আরও একবার বাঘ এসেছিল শিলাইদহের জঙ্গলে। সেবারও দু'ভাই বের হলেন বাঘ শিকারে। তবে এবার বাঘের খোঁজে তাঁরা বের হলেন হাতির পিঠে চড়ে।

রবি ঠাকুর, জ্যোতিদাদা আর সাথে বিশ্বনাথ শিকারী। বিশ্বনাথ শিকারীর ভাই চামরুর কাছে ছোট্ট রবি মাঝেমাঝেই শিকারের গল্প শুনতেন। চামরু একদিন রবিকে বলেছিলেন, অনেক সময় বাঘ লাফিয়ে হাতির পিঠে চড়ে এবং শিকার ধরে।

হাতির পিঠে বাঘ শিকার করতে যাওয়ার সময় রবির মনে পড়ল সেই গল্প। তাঁদের হাতির ওপরও বাঘ আক্রমণ করতে পারে ভেবে বেশ ভয় পেলেন ছোট্ট রবি। কিন্তু  ভয় করাটা চেপে রাখলেন লজ্জায়। আর বেপরোয়া একটা  ভাব দেখিয়ে  এদিক ওদিক তাকাতে থাকলেন। আর এমন হাবভাব করতে লাগলেন যেন বাঘটাকে একবার দেখতে পেলে হয়!

তাঁদের হাতি ধীরেধীরে ঢুকে পড়ল গভীর জঙ্গলের মধ্যে। হঠাৎ থমকে দাঁড়াল হাতি। মাহুত কিছু বুঝতে পারার আগেই জ্যোতিদাদা বাঘটাকে লক্ষ করে গুলি ছুঁড়লেন। সাথে সাথে বাঘটা ঝোপের ভিতর থেকে দিল এক বিরাট লাফ। খোলা মাঠের ভিতর দিয়ে দুপুরবেলার রোদে বাঘ লাগাল দৌড়। মাঠে ফসল ছিল না । সেই ছুটন্ত বাঘকে হাতির পিঠ থেকে দেখলেন রবি ও তাঁর জ্যোতিদাদা। দেখতে দেখতে বাঘ মিলিয়ে গেল দূরে… বহু দূরে…

Developed by DXDasia