‘স্বাধীনতা হীনতায়’ বাঁচতে চাননি রঙ্গলাল

বিস্মৃতপ্রায় কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্কে দু-চার কথা

কবি রঙ্গলালের বয়স যখন আট বছর, তখন তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। সে সময় যে সামাজিক অবস্থা ছিল তাতে তাঁর মাকে সন্তান লালনপালনের জন্য আসতে হয়েছিল বাপের বাড়িতে। তাঁর বয়স যখন নয় বছর, বড় মামা নিয়ে এসেছিলেন কলকাতার খিদিরপুরে। মামা রামকমল ছিলেন ফোর্ট উইলিয়ামের দেওয়ান। সেখানেই তাঁর উচ্চশিক্ষা শুরু হয়। যখন কবির বয়স মাত্র চোদ্দ বছর তখন তাঁর বিয়ে হয় হুগলির ফুলিয়া গ্রামে। ষোল বছর বয়সে কবির মা মারা যান। তারপর তাঁর জীবন যুদ্ধ শুরু হয় নতুন করে। মা মারা যাওয়ার পর রঙ্গলাল বেশ মুষড়ে পড়েছিলেন। মাতুলালয়ে মানুষ হলেও মা-ই ছিলেন তাঁর সব। মা’কে হারানোর কিছুদিন পর শোক ভুলতে তিনি কাশী যাত্রা করেন। পরবর্তীকালে তিনি ‘কাশীযাত্রা’ নামে বইও লেখেন।

 

বাকুলিয়া হুগলির এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম। এখানেই কবি রঙ্গলালের জন্ম হয়। যে আঁতুড়ঘরে কবির জন্ম হয়েছিল সেটা আজও আছে কিন্তু পরিত্যক্ত। বর্ধিষ্ণু গ্রামগুলোর অধিকাংশই তৎকালীন সময়ে গড়ে উঠেছিল নদীর তীরে। বাকুলিয়াও তাই। গ্রামের পাশে ছিল বেহুলা নদী, যে নদীর কথা পাওয়া যায় মনসা মঙ্গল কাব্যে। বাকুলিয়ার পাশে রয়েছে ছোটনেকুয়া, তিলডাঙা, চাঁপাতলা, আলিসাগোড়। এখানে মনসামঙ্গলের বহু নিদর্শন পাওয়া যায় এখনও। পরবর্তীকালে বেহুলা নদীর গতিপথ হারিয়ে যায়। এখন এটা দেকল বিল নামে পরিচিত। পূর্ব বর্ধমানের কাছে উর্বর কৃষিজমির মাঠ। আর রয়েছে নিমপাহাড়ের শেষ নিদর্শন। বাংলার সুবেদার দারা সুজার আমলের বহু ইতিহাস জড়িয়ে এই গ্রামে।

‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে
কে বাঁচিতে চায়
দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে
কে পরিবে পায়’
এই হলেন রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। অনেকে বলেন ‘মহাকবি’। তিনি আসলে ছিলেন ঈশ্বর গুপ্তের ভাবশিষ্য। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান রোমান্টিক কাব্যে। কবি প্রথম জীবনে ছিলেন কবিগানের দলে ছিলেন, কবিগান রচনা করতেন। নিজের দলও তৈরি করেছিলেন। একসময় তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। অধ্যাপনা ছেড়ে তিনি ওড়িশায় যান স্পেশাল ডেপুটি কালেক্টর হয়ে। কিছুদিন পরে কটকের ডেপুটি কালেক্টর হন তিনি। একসময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হন রঙ্গলাল। ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য শুরু হয়, চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। তাঁর ‘কাঞ্চী কাবেরী’, ‘শূর সুন্দরী’ বাংলা সাহিত্যে অমর সৃষ্টি। রাজপুত জাতির ইতিহাস অবলম্বনে তিনি লিখেছিলেন ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’। সাহিত্য সমালোচকরা বলেন, এই কাব্যই বুঝিয়ে দিয়েছিল বাংলা সাহিত্যে রঙ্গলাল যুগের সূচনা হয়েছে। তাঁর কাব্যের মূল সুরে ছিল দেশপ্রীতি, দেশভক্তি। নারীর দুঃখ দুর্দশা বোঝাতে তিনি কলম ধরেছিলেন। আর এজন্যই লিখেছিলেন, 'যৌবনে যুবতী যথা পতিহীন হয়/সকল সম্পদ হত ব্যাকুল হৃদয়।'

রঙ্গলালের ‘কর্মদেবী’, ‘শূর সুন্দরী’ নারীর প্রণয় মহিমা সবসময় সমর্থন করেছে। তাঁকে বলা হয় যুগসন্ধির কবি। ইতিহাস ও ধর্মকে একসূত্রে বেঁধে তিনি যে সাহিত্য রচনা করেছিলেন তা অমর সৃষ্টি। ছন্দপ্রয়োগে তিনি প্রাচীনপন্থী হলেও চিন্তা ও মননে বিপ্লব এনেছিলেন।

যে গর্ভগৃহে কবির জন্ম হয়েছিল বাকুলিয়ার সেই গৃহ আজও পড়ে আছে অবহেলায়। ‘বাকুলিয়ার ইতিবৃত্ত’-এর লেখক অসীম কুমার ভট্টাচার্য গর্ভগৃহ রক্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সরকারি উদ্যোগও দরকার। বর্ধমানের কালনা অথবা হুগলির গুপ্তিপাড়া স্টেশনে নেমে যাওয়া যায় বাকুলিয়ায়। এখন অপেক্ষা, রঙ্গলালের জন্মভিটে কতদিনে সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়, তারই।

Developed by DXDasia