রাজারহাট পাখিরালয় ও আমার ছবি তোলা

৫টা থেকে ৮.৩০টা পর্যন্ত খাবার জোগাড়ে ব্যস্ত পাখিদের দেখা পেলাম সব থেকে বেশি

সালটা ২০০৬। সবেমাত্র পাখির নেশা আমাকে টানছে। ইতিমধ্যে পাখির ছবি তোলার হাতেখড়িও হয়ে গিয়েছে আমার বাগানে, রবীন্দ্রসরোবরে ও বনবিতান গিয়ে বেশ কিছু পাখির ছবি তুলে। হঠাৎ একদিন একটি মেসেজ আসে ফোনে। ‘রাজারহাটে পাখি, প্রজাপতি ও ফড়িং দেখতে চান? চলে আসুন ক্যামেরা নিয়ে। যোগ দিন পাখি বিশারদ শুভঙ্কর পাত্রের সঙ্গে।’ এটিই রাজারহাটের পাখিরালয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়।

ব্লাক ব্রেস্টেড ওয়েভার (মেল)

 

ব্লাক ব্রেস্টেড ওয়েভার(ফিমেল)

 

ব্লু থ্রোট

দিনটি ছিল রবিবার। ছবি তোলার জন্য সঙ্গে নিলাম টামারোন ২০০-৫০০এন এম লেন্সের নিকন ডি ৭০০০ ক্যামেরা। এছাড়া সঙ্গে রাখলাম আমার লাকি ফুজি-এস আর ২৫ ছোট ক্যামেরাটিও। আমরা তিনবন্ধু রওনা হলাম রাজারহাটের উদ্দেশ্যে। সকালের শান্ত স্নিগ্ধ আলোয় হাওয়া বইছে ধীরে ধীরে। ছুটি আমেজে শহরবাসীর ঘুম ভাঙছে দেরিতে। ফলে রাস্তায় লোকজন ও যানবাহনের ব্যস্ততা নেই বললেই চলে। ইকো পার্কেরটি যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে গাড়িটি ঘুরতেই রাস্তার দু’ধারে দেখা মিলল দুটি প্যাঁচার স্ট্যাচু, স্বাগত জানাচ্ছে পাখি-প্রেমিকদের।

কমন স্নাইপ

 

 

কটনপিগমিগুস

জলাভূমি আর বড় বড় ঘাসের ঘন সবুজ জঙ্গল। সেই সময় রাজারহাটে অঞ্চল আরও বিস্তৃত ছিল। আমরা এগিয়ে চললাম জলাশয়ের দিকে। আনন্দ ও উত্তেজনায় আমার হার্টবিট তখন দ্রুতগতিতে চলছে। আমাদের অনেক আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন শুভঙ্করবাবু। ব্যাগ থেকে ক্যামেরাটি বের করে তাঁর সঙ্গে এগিয়ে চললাম। ডানদিকে এগোতেই চোখে পড়ল ‘ফ্যাজেন টেল জাকানা’র। ঝিলের জলের উপর থাকা জলজ জঙ্গলের মধ্যে বসে আছে। সময়টা প্রজননের। এই সময় এরা রাজারহাটে আসে ডিম পাড়তে। জলের উপর জঙ্গলের মধ্যেই ডিম পাড়ে এরা। তারপর বাচ্চাটি একটু উড়তে শিখলেই পাড়ি দেয় দূর-দূরান্তে। তারপর দেখলাম তিনটি ‘কটনপিগমিগুস’ দেখলাম এ-ঝিল ও-ঝিল সাঁতরে বেড়াচ্ছে।

লং-টেল স্রাইক

 

 

ফ্যাজেন টেল জাকানা

প্রেজেনটেলের ছবি ক্যামেরা বন্দি করে এবার চলল রাস্তার উল্টোদিক, ঘাসের জঙ্গলে। দেখা হল তিন-চারটে ট্রাইকালার মুনিয়া, স্কেলি ব্রেস্টেড মুনিয়া, সাইবেরিয়ান স্টোন চার্ট-র সঙ্গে। পাখিগুলি দল বেঁধে উড়ে বেড়াচ্ছে।

রেড আভাডাভাট

রাজারহাটে চেনাজানা পাখিদের সঙ্গে বেশ কিছু পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা ঘটে। কমন স্নাইপ, ব্লাক ব্রেস্টেড ওয়েভার, ইউরেশিয়ান কুকু, লং-টেল স্রাইক, সাইবেরিয়ান স্টোন চার্ট, লাইন নেক এর মত পরিযায়ী পাখির দেখা পাওয়া যায়। এখানকার স্থানী বাসিন্দা বলা যায় ‘প্লেনপ্রিনিয়া’; ‘জাইটুন সিস্টকোলা’; ‘স্ট্রবেরি ফ্রিঞ্চ’ পাখিদের। প্লেনপ্রিনিয়া পাখিটিকে দেখি একটা একটা করে ঘাস ঠোঁটে নিয়ে যাচ্ছে বাসা বাঁধার জন্য। মুনিয়াগুলির রং খুব আকর্ষণীয়। মুনিয়াদের দেখা মেলে জুন থেকে সেপ্টম্বর মাসে। এই সময় এদের প্রজননের সময়। হিমালয় অঞ্চলের লংট্রেল পাখিটিরও দেখা মেলে এখানে।

স্কালি ব্রেস্টেড মুনিয়া

 

সাইবেরিয়ান স্টোন চার্ট

 

রাজারহাটে পাখির ছবি তুলতে গেলে খুব সাবধানে। বড় গামবুট বা স্পোর্টস জুতো। জল, কাদামাটি, জলাশয় এবং ঘাসের জঙ্গলে কখন শুয়ে, কখন কাদায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। কখনও খারাপ আবহাওয়ার জন্য ফিরেও আসতে হতে পারে খালি হাতে। একবার তো ‘ব্লু থ্রোট’ পাখিটির ছবি তুলতে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ হামাগুড়ি দিতে হল আমাদের। কিন্তু সব কষ্টই দূর হয়ে যায় যখন চোখের সামনে দেখি নানারঙের পাখিদের। যেন শিল্পী রং-তুলি দিয়ে তাদের রাঙিয়ে দিয়েছে। দেখলাম ছোট ‘প্লেন পিনিয়া’ পাখিটি ঘাসের উপর বসে আপন মনে গান গাইছে। ছোট বড় নানা রঙের পাখিদের মেলা। তাদের নানারকমের আচরণ।

প্লেন পিনিয়া

 

ট্রাইকালার মুনিয়া

 

হোয়াইট ওয়াগটেল

রাজারহাটে ছবি তোলার আদর্শ সময় সকাল ৫টা থেকে ৮.৩০টা পর্যন্ত। মাত্র উদয় হওয়া সূর্যের আলোতে আহার জোগাড়ে ব্যস্ত পাখিদের এই দেখা পেলাম সব থেকে বেশি। বেলা বাড়ার সঙ্গে তাপ বাড়ে। সেই সময় পাখির দল বিশ্রাম নেয় বাসায়।

জাইটুন সিস্টকোলা

এরপর থেকে রাজারহাটে এবং ঘাসের জঙ্গলে পাখিদের ছবি তোলা ভালোবাসা থেকে অভ্যাসে পরিণত হল। সময় পেলেই ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পরি রাজাহাটের পাখির দেখতে। পাখিরাও নিরাশ করে না। প্রতিবারই দেখা মেলে নতুন পুরনো অনেক পাখির। রাজারহাটেই আমি পেয়েছি রুডি বেস্ট্রেড ক্রাক, ওয়াটার কক, গ্রে-হেডেড সোমপেন, জাকানা, ব্লু-থ্রটেড, পেন্টিংকোল, ইয়োল ব্রিটান’র মত নানা রংয়ের পাখি। রাজারহাট পাখিদের প্রাকৃতিক বাসস্থান। কিন্তু যেভাবে কংক্রিটের লম্বা লম্বা দেওয়ার গ্রাস করছে রাজারহাটকে, কত দিন থাকবে এই পাখিদের আলয়? প্রশ্ন ওঠে মনে। দেখা মিলবে কি তাদের পরের বছর?

Developed by DXDasia