
মাটি পাখি আকাশ মাঠ ভালোবাসা আর উন্নয়নের কথা
লালসিংয়ের খেত ভরা বাসমতী ধান। এবার শীতে অতিথিদের সুগন্ধী চাল খাওয়াবে। সবুজ খেতের মাঝে দাঁড়িয়ে তার সুবাস নিলাম। বুক ভরে গেল। আকাশ ভরে তখন কালো মেঘের প্রবল উপস্থিতি। ধানগাছের কী প্রবল আহ্লাদ। বৃষ্টি হবে। বৃষ্টি হবে। টিয়ার ঝাঁক, বকের দল ঘরপানে উড়াল দিল। ওই তো বক্সা অরণ্যের স্কাইলাইন। ক্রমে সবুজ থেকে কালচে সবুজ হয়ে আসছে। জলদ মেঘের খেলা। মনটা হালকা হয়ে এল।
সারাদিন বাইক সওয়ারি হয়ে দৌড়েছি। বন,নদী ডিমা, চা বাগান পার হয়ে। একদিন গিয়েছিলাম নিমতি বনবস্তিতে। বাসিন্দারা রাভা। সঙ্গী হরিহর নাগবংশী। আমাদের যা কাজ, মানে প্রান্তিক মানুষের কথা বৃহৎ জগতের গোচরে আনা, তাদের ভাষায়, তাদের মতো করে। সাংবাদিকতারই কাজ। তবে সাংবাদিকরা প্রান্তিক মানুষ। যেমন এখানে হরিহর। চা-বাগানের আদিবাসী পরিবারের ছেলে। ও একটা খবর করেছে। রাভা বনবস্তিতে নির্মল বাংলা মিশনে পায়খানা বানিয়ে দেওয়ার নামে স্রেফ তিনটে দেওয়াল তুলে, একটা গর্ত করে পাইপ বসিয়ে দিয়ে চলে গেছে ঠিকাদার। রাভা পঞ্চায়েত সদস্য পঞ্চায়েত অফিসে গিয়ে দেখে শুনে, ‘সব ঠিক হ্যায়’, বলেছেন, বিলও পাশ হয়ে গিয়েছে। ‘ভিডিও ভলান্টিয়ার্সের কমিউনিটি করস্পন্ডেন্ট’ হরিহর ভিডিও ছবি করে, বাইট নিয়ে, স্টোরি করে হইচই বাঁধাল। জয়েন্ট বিডিও থেকে জেলা পরিষদের সভাধিপতি পর্যন্ত ছুটল বনবাসীদের সঙ্গে নিয়ে। ফল ফলতে শুরু করেছে তার পর। আমাদের তো আর সমস্যা দেখালে হয় না, সমাধানের চেষ্টাও করতে হয় ন্যায়ের পথে, সাংবিধানিক রাস্তায়।
সারাদিন এমনকি রাত পর্যন্ত তাই চা-বাগান আর বনবস্তিতে টহল মারা। শোনা, বোঝা, সমাধানের রাস্তা খোঁজা, সমাধান হয়েছে এমন সমস্যাগুলো ভিডিও নিউজের মাধ্যমে দেখিয়ে আরও সমস্যার সমাধানে উৎসাহিত করা। এ যাত্রায় কোচবিহার ঘুরে আলিপুরদুয়ারের বক্সার রাজাভাতখাওয়ায়। লালসিং-এর ‘হামরো হোম’ বা আমার বাড়িতে উঠেছি। এখান থেকেই ঘুরে বেড়ানো চা-বাগান আর বনবস্তিতে। কাজের কথা থাক, লালসিং-এর কথা বলি। লালসিং ভুজেল। নেপালি মানুষ। গারো বনবস্তির বাসিন্দা। বহুযুগ ধরে তাদের বসবাস বক্সা অরণ্যে।
ডুয়ার্সে বেশ কিছুকাল হল হোম-স্টে’র চল হয়েছে। এখন তো যত্রতত্র। তার মাঝে ফাঁকিও রয়েছে বিস্তর। আদিবাসীদের জমি বেনামে কিনে শহুরে বাবুরাও বানিয়ে ফেলেছে ‘হোম স্টে,’ নামেই, ভূমিপুত্র-কন্যারা সেখানে পাহাড়াদার, রান্না করে, বাসন মাজে, ঘরদোর সাফসুতরো রাখে। লালসিং অন্য মানুষ। বনের অধিকার নিয়ে তার লড়াই, বনবস্তির বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে। গ্রামের ছোটরা যাতে ইংরেজি শিখতে পারে তার জন্য স্কুল খুলেছে। দেখতে দেখতে তা কত বড় হয়ে গেল। এর পিছনে একটা কাহিনি রয়েছে। সে কাহিনি ব্যর্থতার আবার সাফলেরও বটে।
রাজ্যে তখন ‘মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ’ বেশ প্রচার পেয়েছে। ওঁর ও সে কথা মনে ধরল। বড় মেয়ে বিশাখাকে ভরতি করলেন কালচিনির নেপালি মাধ্যম স্কুলে। দিনে দিনে তার হাল আর কহতব্য নয়। দার্জিলিঙেও নেপালি মাধ্যমের দিন গিয়েছে। মেয়ে মাধ্যমিক দেবে। শুনে এলাম অঙ্কের বই আসেনি। বিজ্ঞান বই বাংলা থেকে আক্ষরিক অনুবাদ। বোঝে সাধ্য কা্র। বাঙালি বাঙলা মাধ্যমকেই ব্রাত্য করতে বসেছে। আর তার সরকারের নেপালি ভাষার জন্য মন কাঁদবে, তা কি হয়েছে কোথাও!ফলত স্কুল পত্তন। বনঘেরা বনগ্রামে ‘অকল্যান্ড পাবলিক স্কুল।’ ছোট মেয়ে প্রিয়াংসিও এই স্কুলেই পড়ে।
ছবির মতো দেখতে স্কুলটির উলটোদিকেই বিবর্ণ প্রাইমারি স্কুলটি। সেখানেও ছোটরা আসে। শিক্ষকরা আসেন কিংবা আসেন না। গা-ঘেঁষা রান্নাঘরটি দেওয়াল ভাঙা। হাতির দল এসে দেওয়াল ভেঙে সেই যে চাল-ডাল-নুন খেয়ে গেছে, তার পর আর তার দিকে নজর নেই কারও। পাবলিক স্কুলের টিচারও টাই ঝোলায়, ইউনিফর্ম পরে।
এই দৃশ্য যুগপৎ ভালোলাগার, আবার মন খারাপেরও।
আর নিখাদ আনন্দের খবরটাও জানিয়ে রাখি। নিমতি রাভা বনবস্তিতে ৩৩টি ঘরে পাকা টয়লেট তৈরি হয়ে গিয়েছে। এক চা-বাগানের আদিবাসী যুবক রাভা জনজাতির মানুষকে সঙ্গে নিয়ে করে দেখাল বটে।
