
প্রিয়রঞ্জনের খাসতালুকে পুরভোটের রাজনৈতিক সমীকরণ কি? কার পাল্লা ভারি? জোট না তৃণমূল?
আগামী ১৪ মে রাজ্যের কয়েকটি পুরসভার ভোটের মধ্যে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ের চার পুরসভার পাশাপাশি উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ পুরসভাও রয়েছে। উত্তর দিনাজপুর জেলার সদর রায়গঞ্জও রয়েছে সেই পুর ভোটের তালিকায়। রায়গঞ্জে মোট ২৭টি ওয়ার্ডে ৯৪ জন প্রার্থী এই ভোটযুদ্ধে নেমেছেন। ৭২১৯২ জন ভোটার ৯৪ জন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ করবেন। নির্বাচিত হবেন ২৭ জন। কী হবে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির খাসতালুক হিসাবে এই পুরসভার ভোটে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে। তবে রাজনৈতিক সমীকরণ বলছে, রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস ২৭টি ওয়ার্ডের সর্বত্রই এককভাবে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছে। আর তার বিরুদ্ধে নেমেছে কংগ্রেস ও সিপিএমের জোট। অন্যদিকে বিজেপিও ২৪টি ওয়ার্ডে লড়াই শুরু করেছে। তবে কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়তে রাজি নয়। সিপিএম সেখানে ৯টি আসনে সরাসরি প্রার্থী দিয়েছে আর কংগ্রেস প্রার্থী দিয়েছে ১৭টি আসনে। একটি আসনে কংগ্রেসের প্রার্থীকে জোর করে তাদের দিকে নাম লিখিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ। কংগ্রেসের ভোট প্রচারে ঠাঁই পেয়েছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ছড়ানোর অভিযোগ।
কংগ্রেসের সঙ্গে সুর মিলিয়ে সিপিএমও তৃণমূলের বিরুদ্ধে শহর জুড়ে সন্ত্রাস, মারামারি, বোমাবাজির অভিযোগ তুলে প্রচারে নেমেছে। তবে কোমায় থাকা প্রাক্তন মন্ত্রী, রায়গঞ্জবাসীর কাছে সেন্টিমেন্ট হিসাবে থাকা প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির ছায়া এই ভোটে পড়বে। প্রিয়বাবুর স্ত্রী তথা প্রদেশ কংগ্রেস নেত্রী দীপা দাসমুন্সি সেই ভাবেই বোর্ড নিজের দখলে রাখতে দৌড়ে চলেছেন। তবে কংগ্রেস বিধায়ক তথা বিগত কংগ্রেস বোর্ডের চেয়ারম্যান মোহিত সেনগুপ্তের প্রভাব এই ভোটে দারুণভাবে প্রভাব ফেলবেই বলে মনে করেন স্থানীয় কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ। তাঁদের অভিযোগ, তৃণমূলের দল ভাঙানোর খেলা মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। তাছাড়া রায়গঞ্জ হল কংগ্রেসের দুর্গ, সেই দুর্গ তৃণমূল এত সহজে ভেঙে দিতে পারবে না বলেই জানাচ্ছেন সেখানকার কংগ্রেস নেতা পবিত্র আচার্য্য। তাঁর দাবি, বোর্ড কংগ্রেসেরই থাকছে। সন্ত্রাসের সঙ্গে মানুষ নেই। কংগ্রেসের অনেকে আবার বলছেন, এই ভোটে মূল লড়াই হচ্ছে মোহিত বনাম তৃণমূল। সিপিএমের নেতা অপূর্ব পালও দাবি করেন, ভোট অবাধ হলে তাঁদের জোট জিতছে। স্থানীয় সিপিএম নেতাদের বক্তব্য, সেখানকার সাংসদও বামেদের রয়েছে। রাজ্যের বিশিষ্ট সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম অনেক কাজ করেছেন তাঁর এলাকার জন্য। সেসবের প্রতিফলন পুরভোটে পড়বে। তৃণমূলের নেতারা অবশ্য সিপিএম ও কংগ্রেসের সব বক্তব্য উড়িয়ে দেন। তৃণমূলের নেতা অরিন্দম সরকার পরিষ্কারই বলেন, বিগত পুরসভার ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করেই তাঁরা ভোটে জিতেছিলেন। তৃণমূল জিতেছিল পাঁচটি আসনে। কিন্তু কংগ্রেস ভোটের আগের করা সমঝোতা ভেঙে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা নিজেরাই বোর্ড গঠন করে তৃণমূলকে বাদ দিয়ে। আর বোর্ড গঠনের পর তারা কাজ করেনি কিছুই। আর এখন প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে চলছে রায়গঞ্জ পুরসভা। বিগত ছমাস ধরে প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে চলতে থাকা রায়গঞ্জ পুরসভা এলাকার অনেক উন্নতি করিয়েছে তৃণমূল সরকারই। বিগত দিনে বাম বা কংগ্রেসের তরফে বাড়ি বাড়ি পরিশ্রুত পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা তা পারেনি। অথচ ছমাসের মধ্যে প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে বাড়ি বাড়ি পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। চারটে বায়ো টয়লেট চালু করা হয়েছে। বিগত দিনে কংগ্রেস দশ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রেখেছিল। কিন্তু প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে সেখানেও পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়েছে। এল ই ডি লাইটের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এত উন্নয়ন হয়েছে যে রায়গঞ্জের মানুষ এবারে পুর বোর্ড তৃণমূলের হাতে তুলে দেবেন বলেই দাবি করেন অরিন্দমবাবুরা। সেখানকার অন্য তৃণমূল নেতারাও বলেন, শিলিগুড়িতে বাম ও কংগ্রেসের হাতে কার্যত পুর বোর্ড তুলে দিয়ে সেখানকার মানুষ শিলিগুড়িকে যেভাবে উন্নয়নে পিছিয়ে দিয়েছেন রায়গঞ্জের মানুষ সেই ভুল করবেন না। শিলিগুড়িতেও প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে অনেক উন্নয়নের কাজ হয়েছিল। কিন্তু মানুষ তারপরও তৃণমূলকে বোর্ডে না এনে বিরাট ভুল যে করেছেন তা আজ বুঝতে পারছেন। রায়গঞ্জ সেই ভুল করবে না বলেই দাবি সেখানকার তৃণমূল নেতাদের। আর সন্ত্রাসের অভিযোগ সব কংগ্রেস ও সিপিএমের বানানো গল্প ছাড়া কিছুই নয় বলে তারা জানান। তৃণমূলের পাল্টা অভিযোগ, সন্ত্রাসের বাতাবরণ তো তৈরি করছে সিপিএম ও কংগ্রেস। এই রকম দাবি, পাল্টা দাবির সঙ্গে অনেক জল্পনার মাঝে কিন্তু বিজেপি চুপচাপ ভোটের প্রচার করছে। তারা কোনও মন্তব্য করছে না। বিজেপি নেতাদের কথায়, নীরব ভোটাররা চুপচাপ পদ্মফুলের দিকেই ছাপ দেবেন। এখন শেষমেশ কী হবে, তা ১৪ মে-র পরই বোঝা যাবে।
