
তখতটা এখন তাঁদের পারিবারিক। তবু বসলে ওজন তো বাড়বেই
রাহুল গান্ধী বদলে গিয়েছেন। ধারণাটা শুধু কংগ্রেসেই নয়, দানা বাঁধছে বিজেপিতেও। নরেন্দ্র মোদির লোকেরাও বলছেন, দেখেশুনে মনে হচ্ছে ‘পাপ্পু’ বড় হয়ে গিয়েছে। সুখবর নয় তাঁদের জন্য।
গুজরাট ভোটের ফল বোরনোর আগেই রাহুল বসে যাবেন কংগ্রেস সভাপতির তখতে। তখতটা এখন তাঁদের পারিবারিক। তবু বসলে ওজন তো বাড়বেই। এখনও অবধি তো কংগ্রেসই জাতীয় স্তরে প্রধান বিরোধী দল। সংসদের দশ শতাংশ আসন না–পাওয়ায় এবার বিরোধী নেতার তকমা জোটেনি মল্লিকার্জুণ খাড়গের ভাগ্যে। কিন্তু পরের বার সংখ্যাটা কিছুটা অন্তত বাড়ারই কথা। তখন বিরোধী নেতা হিসাবেই সংসদে ঢুকবেন রাহুল গান্ধী। প্রধানমন্ত্রী না–হলেও ছায়া প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাবেন। কংগ্রেসের মতো দলে বা সংসদে এসব তকমা নেহাত তকমা নয়। সঠিক লোকের হাতে পড়লে তা বেশ ওজনদার হয়ে দাঁড়ায়।
রাহুল এর আগেও কয়েকবার নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বিষয়টা দাঁড়ায়নি। এবার গুজরাট বিধানসভা ভোটের আগে তিনি একটা নতুন ছাঁচে নিজেকে ঢেলেছেন। বামঘেঁষা, কিন্তু জঙ্গি সেকুলার–লিবারেল নয়, এমন একটা ভাবমূর্তি তৈরি করতে চাইছেন তিনি। গুজরাট বিধানসভা ভোটের জন্য দলের লোকেদের কতগুলো নির্দেশ দিয়েছেন যা বেশ চিত্তাকর্য়ক। যেমন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি বুঝতে পেরেছেন, গুজরাটে জনপ্রিয়তায় তিনি মোদিকে ছুঁতে পারবেন না। ফলে মোদিকে ‘মওত কী সওদাগর’ বলে উল্লেখ করে সোনিয়া গান্ধী যে ভুল করেছিলেন, তা করতে রাজি নন রাহুল। অতীতের রাহুল এতটা পরিণত ছিলেন না।
আবার দলকে খুব কিছু ‘সেকুলার’ হিসাবে তুলে ধরতেও আগ্রহী নয় রাহুল। তিনি যখন মন্দিরে মন্দিরে যাচ্ছেন তখন তিনি অযোধ্যায় রামমন্দিরের পক্ষে কি না, এই জাতীয় প্রশ্ন যে উঠবে তা তাঁর জানা। দলের লোকেদের তিনি বলেছেন, এই ধরণের কোনও প্রশ্নের জবাব না–দিতে। এমনকি ‘লিবারেল’ সাজার ইচ্ছাও তাঁর নেই। তাই ‘পদ্মাবতী’ নিয়েও দলের নেতাদের মুখ খুলতে বারণ করেছেন। পরিবর্তে যে সব বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলেছেন, সেগুলো হল সামাজিক উন্নয়ন, স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা। তাছাড়া নোট বাতিল ও জিএসটি তো আছেই। উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, জমি অধিগ্রহণ বা সরকারি সুবিধা পাওয়া নিয়ে আদানি গোষ্ঠী, টাটা গোষ্ঠী ও আম্বানিদের তাক করে তিনি প্রচার চালাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে। গুজরাতে এর প্রতিক্রিয়া কী হবে জানা নেই, তবে এভাবে রাহুল যে নিজের একটা বামপন্থী ভাবমবর্তি গড়ে তুলছেন তাতে সংশয় নেই।
এর পিছনে কি প্রশান্ত কিশোরের কোনও অবদান আছে? সেই প্রশান্ত কিশোর, যিনি ২০১৪–র লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির প্রচারের পরিকল্পনাকার ছিলেন। কংগ্রেসের লোকেরা বলছেন, গুজরাট নির্বাচনে পর্দার আড়াল থেকে কংগ্রেস তথা রাহুল গান্ধীর জন্য কাজ করে চলেছেন তিনি। সেইসঙ্গে প্রতিনিয়ত রাহুলকে পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। গুজরাটে রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে রাহুলের চা খাওয়ার ছবির সঙ্গে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর একটি ছবি পোস্ট করা হয়েছে। ছবিটি ভাইরালও হয়েছে। অনেকে বলছেন, এর পেছনেও রয়েছে প্রশান্তের হাত। তাঁর লোকজনেরা সমীক্ষা চালিয়ে ইস্যু ও প্রচার কৌশল ঠিক করেছেন, আর রাহুল তা অনুসরণ করছেন। এবং একেবারে ঠিকঠাকভাবে অনুসরণ করছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ২০১৪–র প্রচারে মোদিও ঠিক তাই করেছিলেন।
রাহুল গুজরাট জিতবেন, এমন কথা এখনও অবধি কেউ ভাবছেন না। তিনি কংগ্রেস সভাপতি পদে বসার পরেপরেই গুজরাটে বাজেভাবে হেরে গেলে তাঁর ভাবমূর্তি ধাক্কা খাবে। তবে তিনি যে একটা মরা দলকে চাঙ্গা করতে পারেন, সেটা গুজরাতে প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, তিনি তাঁর বাবার মতো হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মৌলবাদীদের তুষ্ট করার পথে হাঁটতে পারেন। সেই রাস্তায় না–চললেই সম্ভবত ভাল করবেন তিনি।
