
গৃহীত হবে কি মায়ার পদত্যাগ পত্র?
বহেনজি মায়াবতী রাজ্যসভা থেকে তাঁর ইস্তফাপত্র জমা দিয়েছেন। কারণ তাঁকে নাকি রাজ্যসভায় কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। ইস্তফার চিঠিটা অবশ্য নিয়মমাফিক এক লাইনের বদলে ৩ পাতার। ফলে তা গৃহীত হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।
ঠিক কথা, রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান পি জে কুরিয়েন মঙ্গলবার মায়াবতীকে তাঁর ইচ্ছামতো বিস্তারিত ভাবে কথা বলতে দেননি। কেন দেননি? কারণ মায়াবতী আলোচনার জন্য কোনও নোটিস দেননি। লোকসভা বা রাজ্যসভার নিয়ম হল, কেউ কোনও বিষয়ে আলোচনার জন্য নোটিস দিলে, এবং সরকার রাজি থাকলে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সব আলোচনা মুলতুবি করে সেই বিষয়টা নিয়ে আলোচনার নোটিস দিলে, এবং সরকার রাজি হলে, সেই আলোচনাই হয়। কিন্তু নোটিস না থাকায় মায়াবতী তিন মিনিট বলার পর নিয়মমতো তাঁকে থামতে বলেন কুরিয়েন, যিনি কংগ্রেসের সাংসদ। তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে তৎক্ষণাৎ রাজ্যসভা ছেড়ে বেরিয়ে যান মায়াবতী। সঙ্গে যান অন্য বিরোধীরাও। পরে সাংবাদিকদের বহেনজি বলেন, দেশের কোটি কোটি দলিত, সংখ্যালঘু ও শোষিত মানুষের নিপীড়নের কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, বলতে দেওয়া হয়নি। আপনারা জানেন, আমি নিজেও দলিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। যখন বলতে দেওয়া হল না, তখনই পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
দলিত নেত্রীর পক্ষে ইস্যুটা বেশ ভাল। ২০১৪ থেকে রাজ্যের নির্বাচনে তাঁর হাল ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। সে বছর রাজ্যের লোকসভার ৮০টি আসনের একটাও জেতেননি তিনি। এবছর বিধানসভাতেও তিনি এত আসন জিততে পারেননি যে পরের বছর তাঁর রাজ্যসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিজের দলের ভোটে আবার রাজ্যসভায় জিতে আসতে পারেন। জিততে হলে সাহায্য চাইতে হবে সমাজবাদীদের। সমাজবাদীরা আবার বাবা কাকা ও ছেলে (মুলায়ম সিং যাদব শিবপাল যাদব ও অখিলেশ যাদব), এই দুই শিবিরে বিভক্ত। কাজেই এই সময় দলিতদের কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না বলে হইচই তোলা মায়াবতীর রাজনীতির জন্য বেশ ভাল। কিন্তু, প্রশ্ন হল, এই ধরণের রাজনীতি কি দেশের পক্ষে মঙ্গলজনক?
রাজ্যসভায় সিপিএম বা কংগ্রেসও মায়াবতীর পাশে দাঁড়িয়েছিল। কেন? না সরকার বিভিন্ন জরুরি বিষয় তাঁদের তুলতে দিচ্ছেন না। না দিলে সেটা অবশ্যই অন্যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল? মঙ্গলবার ছিল সংসদের বাদল অধিবেশন দ্বিতীয় দিন। রাজ্যসভায় হাজির ছিলেন বসপা নেত্রী। সেখানে বিজেপিকে দলিত এবং সংখ্যালঘু বিরোধী বলে উল্লেখ করেন তিনি। দেশের সর্বত্র গোরক্ষকদের তাণ্ডব নিয়েও নরেন্দ্র মোদি সরকারের সমালোচনা করেন। বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দলিত ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর অত্যাচার শুরু হয়েছে। দেশের সর্বত্র জাঁকিয়ে বসেছে জাতিবাদ ও পুঁজিবাদ। বলেন, হায়দরাবাদের দলিত ছাত্র রোহিত ভেমুলাকে দিয়েই নৃশংসতার সূত্রপাত, এখন গোরক্ষকরা তা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। শাহরানপুর প্রসঙ্গও ছিল, যেখানে মহারাণা প্রতাপের জন্মবার্ষিকীতে দলিত ও রাজপুতদের মধ্যে সঙ্ঘর্ষ বেধেছিল। এরপর নিজের শোচনীয় হার মেনে নিতে না পেরে যে কথা তিনি আগেও বহুবার বলেছেন, সেই ভোটযন্ত্রে কারচুপির প্রসঙ্গ তোলেন। এইবার রে রে করে ওঠেন বিজেপি সাংসদরা। উঠে দাড়ান মন্ত্রীরাও। আগেও বাধা দিচ্ছিলেন তাঁরা। এবার শুরু হয়ে যায় প্রবল চেঁচামেচি। সেই সময় মায়াবতীকে থামতে বলেন ডেপুটি চেয়ারম্যান। তাতেই ক্ষুব্ধ হয়ে সরকারকে দোষারোপ করে বেরিয়ে যান তিনি।
এতেই শুরু হয়ে গিয়েছে তাকদুমাদুম। সমাজের দুর্বল মানুষদের নিয়ে তাঁকে সংসদে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না, এ অতি গুরুতর অভিযোগ। কিন্তু ঘটনা যা ঘটেছে তা কি সত্যিই তাই? সংসদের কিছু নিয়মকানুন আছে, আর কিছু ঘটনা বহুদিন ধরে ঘটে আসছে। আপনারা কারচুপি করে ক্ষমতায় এসেছেন, এ কথা বললে যে কোনও আমলে যে কোনও সরকারের সদস্যরা হইচই করতেন। সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে বিতর্কিত কথা বললে সভা সব সময়েই অশান্ত হয়ে ওঠে। নতুন কিছু নয়। তা নিয়ে ওয়াকআউটও নতুন কিছু নয়। সংসদ স্তব্ধ করে দেওয়া, বিশেষত দিনের পর দিন, উচিত কিনা তা অন্য প্রসঙ্গ। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি এই ধরণের আচরণের সমালোচনা করেছেন। অতীতেও এমন সমালোচনা অনেক হয়েছে। কিন্তু এখনকার শাসক পক্ষ বা বিরোধী পক্ষ, উভয়েই একাজ বহুবার করেছে।
কিন্তু সংসদের ভেতরের স্বাভাবিক সোরগোল, বাদানুবাদকে কেন্দ্র করে পদত্যাগ করা বোধহয় খুব শোভন নয়। কেউ কোনও সময়ে ভাবাবেগের কারণে কিছু করলে, তার অর্থ তবু বোঝা যায়। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক কারণে সংসদের ভেতরের ঘটনাকে এ ভাবে ব্যবহার করা কোনও সুনজির তৈরি করল না।
