
সাইকোথেরাপির অভিনব দিগন্ত খুলেছে রবিরশ্মি স্টাডি সার্কেল
রবীন্দ্রসংগীত। বাঙালির চিরন্তন আবেগের সঙ্গে ধ্রুপদী ভারতীয় সাধনার আশ্চর্য সমাহার। রবি ঠাকুরের বিচিত্র সৃষ্টির মধ্যে এই মাধ্যমটিই এলিট থেকে সাবলটার্ন – সব রকমের মানুষই কানেক্ট করতে পারেন সবথেকে বেশি। দুঃখে, আনন্দে, বিরহে, যন্ত্রণায় – যখনই আমরা রবি ঠাকুরের গান শুনি, মনে হয় যেন, কী আশ্চর্য, আমার মনের কথাটি এত বছর আগে রবীন্দ্রনাথ এত সুন্দরভাবে বলে গিয়েছেন। তার পাশাপাশি সুরের সঙ্গে কথার সংযোগে দিয়ে গেছেন উত্তরণের বার্তাও। সেই উত্তরণের পথকে অনুসরণ করে মানসিক বৈকল্যের থেকেও পাওয়া যায় মুক্তি, মনকে সুস্থ করতে ওষুধের থেকেও বেশি উপযোগী হয়ে উঠতে পারে, সেটা হাতে কলমে প্রয়োগ করে দেখাচ্ছে রবিরশ্মি স্টাডি সার্কেল। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, মানসিক চিকিৎসায় রবীন্দ্রসংগীতকে সফলভাবে ব্যবহার করে আসছেন তাঁরা।
২০১৫ সালে একটি স্টাডি সার্কেল হিসেবে ‘রবিরশ্মি’ তৈরি হয়েছিল। রবীন্দ্রসংগীতের মধ্যে মনোচিকিৎসার উপকরণ কিভাবে লুকিয়ে আছে, সেটাই তাঁদের গবেষণার বিষয়। ‘রবিরশ্মি’-র গবেষকদের মতে, চেতনা সবসময়েই মুক্ত। চেতনার তিনটে স্তর আছে – মূর্ত, রাগ, এবং সারস্বত। ক্ষেত্রবিশেষে ব্যক্তি এবং পরিস্থিতি এই স্তরগুলোকে প্রভাবিত করে। এই চেতনাকে অনুধাবন করা একটা যাত্রা – অসম্পূর্ণ থেকে সম্পূর্ণে যাওয়ার বৃত্তাকার পথ। রবীন্দ্রনাথ চেতনার প্রবাহকে পালটে দেওয়ার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেও জানিয়েছিলেন, গানের মাধ্যমে খুব সহজেই এই চেতনার পরিবর্তনকে বুঝে ফেলা যায়। সেই সূত্র ধরেই বিভিন্ন রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বিশ্লেষণ করে ‘রবিরশ্মি’-র গবেষকরা এমন কিছু পদ্ধতি খুঁজে পেয়েছেন, যা দিয়ে মনস্তত্ত্বের বিভিন্ন সমস্যাকে নির্মূল করে ফেলা সম্ভব। রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি রবি ঠাকুরের নাটক, ছবি, নৃত্যকেও তাঁরা চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করে থাকেন।
রবিরশ্মি স্টাডি সার্কেলের সঙ্গে যুক্ত আছেন ডাক্তার, শিক্ষক, অধ্যাপক, নাট্যকর্মী, সমাজকর্মী, নৃত্যশিল্পী, গায়ক ইত্যাদি সৃজনশীল এবং মননশীল পেশার মানুষজনেরা। রাবীন্দ্রিক সাইকোথেরাপিস্ট ডঃ দেবদুলাল দত্ত রায় বর্তমানে এই স্টাডি সার্কেলের সভাপতি। তাঁদের চিকিৎসা পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য হল, এখানে কোনো প্রথাগত ডাক্তার-রোগী সম্পর্ক নেই, কোনো চাপিয়ে দেওয়া নেই। যেমন রাবীন্দ্রিক ড্রয়িং থেরাপির কথাই ধরা যাক। ক্লায়েন্ট কী ছবি আঁকবেন, কীভাবে ছবি আঁকবেন, তার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা থাকে না। ফলে কোনো চাপও থাকে না। ছবি আঁকতে আঁকতে মন শান্ত হয়ে যায়। রবিরশ্মির গবেষকরা দেখিয়েছেন, ছবি আঁকা শরীরকে শান্ত রাখে, রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে এবং মস্তিষ্কের রাসায়নিক নিঃসরণকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে অবসাদের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিও নির্মূল হয়ে যায়। রবিরশ্মির তরফ থেকে কিছুদিন পরপরই ইন্টার্যাক্টিভ সেশনের ব্যবস্থা করা হয়, যাতে তাঁরা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে পারেন। রবীন্দ্র সৃজনের সঙ্গে মানুষকে অনেক বেশি করে যুক্ত করার পাশাপাশি তাঁদের গবেষণাকে সমাজের উপকারে প্রয়োগ করতে মাঝেমাঝেই তাঁরা ছবি আঁকা, গান, বাজনা, নাটকের অনুষ্ঠানের আয়োজনও করে থাকেন। গত ৯ ডিসেম্বর একটি আলোচনাসভার আয়োজন করেছিলেন রবিরশ্মি কর্তৃপক্ষ। রাবীন্দ্রিক মনোচিকিৎসাকে আরও উন্নত করে তোলাই ছিল এই আলোচনাসভার উদ্দেশ্য। “রবীন্দ্রসংগীত ও আবেগের নিয়ন্ত্রণ”, “শেকসপিয়ার এবং রবীন্দ্রনাথ”, “রাবীন্দ্রিক মনোচিকিৎসায় আত্মস্বীকৃতি”-এর মতো নানা বিষয় নিয়ে আলোচনায় সমৃদ্ধ হন গবেষক, ছাত্র এবং জিজ্ঞাসু মানুষেরা।
