রবীন্দ্রনাথের বিলাতী সুরের গান ভাঙার প্রেরণা

আগে থেকেই ঠাকুর পরিবার উপযুক্ত হয়ে ছিল এ-কাজে

অনুরাধা পালচৌধুরী
অন্যের সুরে কথা বসাবার হাতেখড়ি রবীন্দ্রনাথের হয়েছে বিলাত যাবার আগেই ‘জ্যোতিদাদা'র অধীনে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পিয়ানোয় ছুটে চলা সুরগুলিকে কথায় বেঁধে ফেলার আংশিক দায়িত্ব পড়েছিল কিশোর রবির উপরে। ‘জীবনস্মৃতি’তে তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘এক সময়ে পিয়ানো বাজাইয়া জ্যোতিদাদা নূতন নূতন সুর তৈরি করায় মাতিয়াছিলেন। …আমি ও অক্ষয়বাবু তাঁহার সেই সদ্যোজাত সুরগুলিকে কথা দিয়া বাঁধিয়া রাখিবার চেষ্টায় নিযুক্ত ছিলাম। গান বাঁধিবার শিক্ষানবিসি এইরূপে আমার আরম্ভ হইয়াছিল।”

১৮৮০ খৃস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে বিলাত থেকে দেশে ফিরে রবীন্দ্রনাথ ‘বাল্মীকিপ্রতিভা' গীতিনাট্যের রচনায় মেতে উঠলেন এবং সেই সূত্রে দেশীবিদেশী সুরের গান ভাঙলেন। এর পিছনেও প্রধান অনুপ্রেরণা হলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, আর বিশেষ সহায় হল ঠাকুরবাড়ির তৎকালীন গীতিনাট্যপ্রবাহের পরিবেশ।

এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য যে শুধু ঠাকুর-পরিবারে নয়, সারা কলকাতা এবং তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সে সময় ইয়োরোপীয় আদর্শে নাচ, গান ও শখের থিয়েটারের পরিবেশ গড়ে উঠেছিল। কলকাতায় প্রথম বিলাতী থিয়েটার স্থাপিত হয় ১৭৭৫ খৃস্টাব্দে। শুধু যে ইংরেজরাই এসব অভিনয় বা গান-বাজনায় অংশগ্রহণ করতেন তা নয়, ইটালিয়ান ও জার্মান শিল্পীও অনেক ছিলেন। উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে ধনী বাঙালী পরিবারগুলিতে বিদেশী থিয়েটারের প্রতি বিশেষ উৎসাহ দেখা যায়। বিশেষ করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ইটালিয়ান ‘অপেরা'র অভিনয়। অপেরা বলতে বোঝায় এক ধরনের নাটক যাতে পাত্রপাত্রীর সমস্ত কথাবার্তা সুরে রচিত অথাৎ এককথায় যাকে বলা যেতে পারে ‘গীতনাটক'। অপেরার অনুকরণে বাংলাভাষায় গীতনাটক রচনা ও অভিনয়ের প্রবল ঝোঁক দেখা দিল যুবকমহলে। তার ফলে শখের থিয়েটারের বদলে সৃষ্টি হল পেশাদারী 'ন্যাশনাল থিয়েটার', বিদেশী পেশাদারী নাটক ও অপেরার দলের অনুকরণে।

১৮৭৯ খৃস্টাব্দে এই দল বাংলার প্রথম গীতনাটক 'কামিনীকুঞ্জ' অভিনয় করেন। এই নতুন ধরনের পুরোপুরি গীতনাটক বাংলার দর্শকসমাজে বিশেষ সাড়া জাগায়।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরপরিবার ছিল সে যুগের কলকাতায় শিক্ষিত ধনীদের অন্যতম। গীতনাটকের ঢেউ এসে সেখানেও পৌঁছেছিল যথাসময়ে। রবীন্দ্রনাথ যখন বিলাতে তখন জ্যোতিরিন্দ্রনাথের উৎসাহে স্বর্ণকুমারী দেবীর রচিত ‘বসন্তোৎসব’ গীতনাটক অভিনীত হয়েছে ঠাকুরবাড়ির ‘বিদ্বজ্জনসমাগম-সভা’র আমন্ত্রিত অতিথিদের সামনে। জানা যায়, পুরোপুরি অপেরা জাতীয় গীতনাটকের ছাঁদে রচিত হয় এই নাটক। সময় বিচার করলে দেখা যায় ১৮৭৯ খৃস্টাব্দে পুস্তকাকারে প্রকাশিত এই নাটক ‘কামিনীকুঞ্জ'-এর সমসাময়িক। স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা সরলা দেবী লিখেছেন – “রবীন্দ্রনাথের বিলাতনিবাসকালেই আমার মায়ের রচিত ‘বসন্তোৎসব’ গীতনাটোর অভিনয় জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অধ্যক্ষতায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সঙ্গীতের এক মহাহিল্লোলে হিল্লোলিত হয়ে উঠেছিল বাড়ি তখন।"

রবীন্দ্রনাথ দেশে ফিরেই দেখলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথের রচিত 'মানময়ী' নাটকের অভিনয়ের আয়োজন চলেছে। অভিনয়ে তিনিও অংশগ্রহণ করলেন। ১৮৮০ খৃস্টাব্দে পুস্তকাকারে প্রকাশিত এই নাটকের সবশেষের গানটি তাঁরই রচনা— গানটি হলা ‘আয় তবে সহচরী হাতে হাতে ধরি ধরি’। দেখা যায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মনে সে সময় খাটি অপেরাজাতীয় গীতনাট্য রচনার দিকেই বেশী ঝোঁক ছিল। ফলে রবীন্দ্রনাথ দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে গীতনাট্য রচনার কাজে উদ্বোধিত করলেন এবং নিজে সক্রিয়ভাবে নিয়োজিত হলেন এর সুরসৃষ্টিতে। পর পর দু'বছরে (১৮৮১ এবং ১৮৮২ খৃস্টাব্দে) দুটি গীতনাটা রচিত হল – প্রথমটি ‘বাল্মীকিপ্রতিভা' ও দ্বিতীয়টি 'কালমৃগয়া'। এ-দু’টির রচনাকাল সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ 'জীবনস্মৃতি'তে লিখেছেন- “বাল্মীকিপ্রতিভা ও কালমৃগয়া যে-উৎসাহে লিখিয়াছিলাম সে-উৎসাহে আর-কিছু রচনা করি নাই। ওই দুটি গ্রন্থে আমাদের সেই সময়কার একটা সংগীতের উত্তেজনা প্রকাশ পাইয়াছে। জ্যোতিদাদা তখন প্রত্যহই প্রায় সমস্তদিন ওস্তাদি গানগুলাকে পিয়ানো যন্ত্রের মধ্যে ফেলিয়া তাহাদিগকে যথেচ্ছা মন্থন করিতে প্রবৃত্ত ছিলেন।”

বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় রচিত 'জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি'তে এ-কথারই সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন "জ্যোতিবাবুর কাছেই শুনিলাম যে ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’র প্রায় সব গানের সুরই জ্যোতিবাবুর সংযোজিত।”

তবে অবশ্য বলাই বাহুল্য যে বিলাতী সুরের ভাঙাগানগুলি রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব সংযোজন। সদ্য বিলাত প্রত্যাগত তরুণ রবীন্দ্রনাথের মনে নতুন শেখা প্রিয় বিদেশী সুরগুলিকে গীতনাট্যের কাজে লাগাবার ইচ্ছা হওয়া একান্তই স্বাভাবিক। বিশেষ করে গীতনাট্যের সংঘাতবহুল ঘটনা ও নানাধরনের মানবিক ভাবপ্রকাশের পক্ষে বিদেশী সংগীতকেই তিনি বেশী উপযোগী মনে করেছেন। এর সমর্থন দেখা যায় ‘জীবনস্মৃতি’তে – “য়ুরোপের সংগীত যেন মানুষের বাস্তবজীবনের সঙ্গে বিচিত্রভাবে জড়িত। তাই দেখিতে পাই, সকল রকমেরই ঘটনা ও বর্ণনা আশ্রয় করিয়া য়ুরোপে গানের সুর খাটানো চলে।”

এখানে মনে রাখা দরকার যে ঠাকুরপরিবারে বিদেশী সুরে কথা বসাবার দৃষ্টান্ত কিন্তু “বাল্মীকিপ্রতিভা'তেই প্রথম নয়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের 'সরোজিনী (১৮৭৫) ও 'অশ্রুমতী’ (১৮৭৯) নাটকদুটিতে দুটি বিদেশী সুরের গান পাওয়া যায়। গান দুটি ‘দ্যাখরে জগৎ মেলিয়ে নয়ন’ ও ‘প্রেমের কথা আর বোলো না।’ দ্বিতীয় গানটির সুরকে ইটালিয়ান ঝিঁঝিঁট' নামকরণ করে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ রাগশ্রেণীতে তুলবার চেষ্টা করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের এই বয়সে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁর মনে গানরচনার যে পথ ও আদর্শ নির্দেশ করেছিলেন, পরবর্তী বাকি জীবনে তার প্রভাব সব সময়েই দেখা গেছে।

উপরোক্ত বিষয়গুলি বিবেচনা করলে বোঝা যায় যে, যে সময় রবীন্দ্রনাথ বিদেশ থেকে ফিরে বিলাতী সুরে গান ভাঙতে আরম্ভ করেন, তার বেশ কিছুদিন আগে থেকে ঠাকুরপরিবারে এ কাজের উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি হয়েই ছিল। পরিবারের ভিতরে ('বসন্তোৎসব') এবং বাইরে (কামিনীকুঞ্জ) গীতনাট্য রচনার আবহাওয়া এবং তাগিদ তাঁকে সব দিক থেকে অনুপ্রাণিত করেছিল।

(ঋণ – বিলাতীগানভাঙা রবীন্দ্রসঙ্গীত / অনুরাধা পালচৌধুরী)

Developed by DXDasia