রবীন্দ্রনাথ ও রামানুজন

এক সূত্রে বাঁধা গণিতের কবি ও বিশ্বকবি। কী তাঁদের মিলিয়ে দিল ২৫শে বৈশাখে?

গল্পটা অনেকের জানা। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের ক্লাস চলছে। অধ্যাপক আর্থার বেরি একজন ভারতীয় ছাত্রকে ডেকে বোর্ডে এলিপ্টিকাল ইন্টিগ্রালস-এর কঠিন অংক কষতে দিলেন। ছাত্রটি নির্দ্বিধায় অধ্যাপকের হাত থেকে খড়িটি নিলেন। বোর্ডের সামনে গিয়ে কোনও স্টেপ না লিখে নির্ভুল উত্তরটুকু খসখস করে লিখে দিলেন। অধ্যাপক অথবা বাকি ছাত্ররা তখনও জানেন না কী হতে পারে অংকের ফল বা কত ধাপ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছতে হবে। অধ্যাপক জিজ্ঞেস করলেন, উত্তরটা জানলে কী করে? ছাত্রটি উত্তর দিল – ইট জাস্ট কেম টু মি। ছাত্রটি হলেন সর্বকালের গণিত বিস্ময় শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার রামানুজন। তাঁর কাছে গণিতের সমাধান আসতো স্বজ্ঞা বা ইনটিউশনের ভিতর দিয়ে। পাশ্চাত্যে তাঁর চিন্তাকে উপস্থাপনের পদ্ধতি রামানুজনের জানা ছিল না। সে ভার নিয়েছিলেন তাঁর শিক্ষক জি এইচ হার্ডি এবং সহপাঠী লিটলউড। হার্ডির কাছে তাঁকে শিখতে হয়েছিল কীভাবে সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে ইউরোপিয় গাণিতিক প্রমাণ পদ্ধতি বিন্যস্ত করতে হয়।

‘এইভাবে বাকি বিকেলটা কেটে গেল এবং যখন রাত হল আমি একা ছাদের ওপর বসেছিলাম ও নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম, পাশ্চাত্যের মানুষের থেকে অনেক পাহাড় এবং সমুদ্র দ্বারা বিচ্ছিন্ন এক ভিন্ন জাতির মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আমার কবিতাগুলি কেন পাশ্চাত্যের দ্বারা স্বীকৃত ও সম্মানিত হল…’- নোবেল সম্মান পাওয়ার খবর আসার পর এমন প্রশ্নই বিদ্ধ করেছিল রবীন্দ্রনাথকে।

ধর্ম নিয়ে এখন খুব শোরগোল চলছে আশপাশে। আমরা একটু চোখ রাখি ১৯৩০-এ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রদত্ত হিবার্ট বক্তৃতামালার দিকে। ‘দ্য রিলিজিয়ন অব ম্যান’। কবি বলছেন, মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হল প্রকৃতির কাছ থেকে এবং জন্মসূত্রে পাওয়া জৈবিক অস্তিত্বের সীমাকে অতিক্রম করে যাওয়া। চেতনার জগতের এই সীমা অতিক্রম করেই মানুষ তার মানব-দেবতার, বিশ্বমানবের উপস্থিতি উপলব্ধি করতে পারে। পাশ্চাত্যের সামনে তিনি বলছেন প্রাচ্যের ধ্যান এবং যোগে নিবিষ্ট ঋষিদের কথা, যাঁরা স্বজ্ঞার মাধ্যমে তাঁদের পরমকে উপলব্ধি করতে পারেন। এখন এই মানবদেবতার ধারণাতে কিভাবে পৌঁছলেন তিনি? পৌঁছনোর পথ বা স্টেপগুলি কি পাশ্চাত্যের কাছে চেনা কোনও ছক? কবি বলছেন, ‘কোনো দার্শনিক বিশ্লেষণের ফলশ্রুতিতে এই মানবদেবতার ধারণা আমার মধ্যে গড়ে ওঠেনি। শিশুকাল থেকেই আমার মনের প্রবহমান এমন একটি ভাব হঠাৎই একদিন আমার দিব্যদৃষ্টির সম্মুখে স্পষ্ট রূপে উদ্ভাসিত হয়েছিল। আমার প্রাণ হঠাৎই জেগে উঠেছিল। সেই দিনের অভিজ্ঞতায় আমার এই বিশ্বাস দৃঢ়মূল হয়েছিল আমাদের মধ্যে আপাত প্রতীয়মান নিরন্তর পরিবর্তন ঘটে চললেও আমাদের অজ্ঞাতে আমাদের সত্তার গভীরে এক ও অনন্ত মানব ঐক্যের বোধ বিরাজ করছে।’

তাহলে কীভাবে পেলেন মানবদেবতার উপলব্ধি? কোন পথ ধরে? কবির উত্তর হবে, ‘ইট জাস্ট কেম টু মি’। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কোনও হার্ডি বা লিটলউড ছিল না। বা বলা যায় উপনিষদের বাণী এবং বাউল-ফকিরদের ভাব সম্মিলনের বার্তাকে পাশ্চাত্যের কাছে বোধগম্য করে তুলতে তাঁর কাউকে দরকার পড়েনি। তাহলে এই একান্ত আধ্যাত্মিক ইনটিউশনকে কী ভাবে তিনি রাঁধলেন ভাবের রান্নাঘরে যে পাশ্চাত্য চেটেপুটে খেল?

এই মহাবিশ্বকে ‘মানুষের বিশ্ব’ রূপে প্রকাশ করা সেই রন্ধন প্রণালীর প্রথম ধাপ। আইনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তর্কে উঠে আসে সেইসব জরুরি কথা। আইনস্টাইন সত্য ও সুন্দরের মধ্যে ‘সত্য’-কে মানুষের চেতনা নিরপেক্ষ একটি ধারণা হিসেবে দেখেন। মানে, মানুষের চেতনাকে বাদ দিয়েও ‘সত্য’ থাকবে। কিন্তু ‘সুন্দর’ থাকবে তখনই, যখন মানুষের মন উপস্থিত থাকবে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বলেন, সত্য, সুন্দর সব কিছুর অস্তিত্বই মানুষের চেতনার উপর নির্ভরশীল। মানবচেতনার বাইরে কোনও কিছুর সত্যতার কথা আমরা যখনই বলতে যাই, ঠিক তখনই তা আমার চেতনার অন্তর্গত হয়ে যায়। এই ভাবনার সুর আমরা লক্ষ্য করি এক আধুনিক বৃটিশ ভাববাদীর চিন্তায়। বিশপ জর্জ বার্কলে। তাঁর সাফ কথা, কোনও কিছু অস্তিত্ববান মানেই তাকে কেউ না কেউ না কেউ প্রত্যক্ষ করছে। সমালোচকরা জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে যখন একটা টেবিল তালাবন্ধ ঘরে পড়ে আছে, কেউ টেবিলটিকে দেখছে না, তা বলে কি টেবিলটার অস্তিত্ব নেই। বার্কলে সাহেব বললেন, কেউ দেখছে না কে বললো? ঈশ্বর আছেন, জগতের সব কিছুই তাঁর প্রত্যক্ষের আওতায়। অতঃপর টেবিল বেচারা ‘বেঁচে’ গেল। আর রবীন্দ্রনাথ আইনস্টাইনকে বললেন, ‘হ্যাঁ, ব্যক্তি মনের বাইরে পড়ে রইল টেবিলটা, বিশ্বমানবমনের বাইরে নয়’। তাহলে বার্কলে সাহেবের ঈশ্বরকে রবীন্দ্রনাথ রিপ্লেস করলেন ‘বিশ্বমানবমন’ দিয়ে।

আবার রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন, ‘ একেবারেই মানুষের কোনও অপেক্ষা নেই, এমন কোনও সত্য বস্তু যদিও বা থাকে, আমাদের কাছে তা একেবারেই না থাকা’; তখন আবার তাঁর রান্নায় যে সুগন্ধী মশলার ঘ্রাণ পাই তাঁর নাম ইমান্যুয়েল কান্ট। জার্মান এই দার্শনিকের ভাবকে সরল করে বলি, আমরা যা জানি তা হল আমাদের ‘আপন মনের মাধুরী মিশায়ে’ রচিত বস্তু জগৎ। কারণ আমাদের বোধশক্তির মধ্যে নানা প্রকার ছাঁচ আছে। বস্তু জগৎ যেন ক্ষীরের ঢেলা, আমাদের বোধশক্তির কাছে এসে জ্ঞানের বিচিত্র ছাঁচে সে নিজেকে গড়ে তোলে।

তো ‘মানুষের জগৎ’-এর প্রাণ প্রতিষ্ঠা হল। পাশ্চাত্য খানিকটা নিজেদের ভাবজগতের পরিচিত স্বাদ পেয়ে বসলো নড়ে চড়ে। এইবার মানুষের চেতনাকে মানবদেবতাকে স্পর্শ করতে হবে। রবি ঠাকুর ফিরে গেলেন ছেলেবেলায়। মেট্রোপলিটন শহরে প্রকৃতিকে না পাওয়ার বিরহের কথা বললেন। কিন্তু প্রকৃতি কেন? উপনিষদের কবিদের উত্তরাধিকারী বললেন, প্রকৃতির ভিতর মানুষ সংগীত খুঁজে পেয়েছে, নিজে সুর সৃষ্টি করার সাহস ও সামর্থ্য লাভ করেছে। সংগীতের সরগম সংখ্যায় সীমিত, কিন্তু তা দিয়ে অসীম সংখ্যক সুর সৃষ্টি করা যায়। সংগীতের ভিতর দিয়ে ব্যক্তিমানুষ কেবল নয়, সমগ্র মানবসত্তা আত্মপ্রকাশ করে। প্রকৃতির থেকে পাওয়া শিল্প এবং সংগীতের ভিতর দিয়েই আপাত প্রতীয়মান জগতকে অতিক্রম করে সাক্ষাৎ পাওয়া যায় বিশ্বমানব মনের। নিজের ভিতরেই আবিষ্কার করা যায়।

গণিতের কবি রামানুজনের কাছে নিজের প্রতিভাকে পাশ্চাত্যের সামনে তুলে ধরার পথটি ছিল অজানা। তাই তাঁর হেঁশেল সামলেছিলেন হার্ডিরা। আর বিশ্বকবির নিজের চিন্তাকে প্রতীচ্যের ভাবনার টেবিলে পৌঁছতে রান্নাঘরে কাউকে সেভাবে নিযুক্ত করতে হয়নি। কারণ তাঁর চিন্তার দ্বারে খানিকটা অলক্ষ্যেই দাঁড়িয়েছিলেন বার্কলে, কান্ট, ব্র্যাডলের মতো পারদর্শী রাঁধুনিরা। কবি চান বা না চান তাঁরা ‘সাহায্যের’ হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।  

সূত্র – দ্য মান হু নিউ ইনফিনিটি, রবার্ট ক্যানিগেল
      রামানুজনঃ গণিত ও নিয়তি, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
      দ্য নোবেল প্রাইজ অ্যাকসেপটেন্স স্পিচ, রবীন্দ্রনাথ টেগোর
      দ্য রিলিজিয়ন অফ ম্যান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      ডায়ালগ বিটউইন হাইলাস অ্যান্ড ফিলোনাস, জর্জ বার্কলে
      ক্রিটিক অফ পিওর রিজন, ইমান্যুয়েল কান্ট
      রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের সংলাপ  

 

Developed by DXDasia