
কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী-কে নিয়ে দু’চার কথা
কুতুবউদ্দিন আহমেদ
পারিবারিকভাবে ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে বিহারীলালের সঙ্গে বেশ দহরম-মহরম ছিল; বিষয়টি সকলেরই জানা। এ সম্পর্কে বিহারীলাল গবেষক অধ্যাপক শান্তিরঞ্জন ভৌমিক লিখেছেন : “জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির সঙ্গে বিহারীলালের একটি নিবিড় সম্পর্ক ছিল। দেবেন্দ্রনাথ তাকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বিহারীলালের ঘনিষ্ঠতা ছিল। দার্শনিক কবি দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিহারীলালের ‘সঙ্গীত শতক’ পাঠে মুগ্ধ হন এবং তার সাথে স্বতপ্রবৃত্ত হয়ে আলাপ করেন। তাদের এ আলাপক্রমে গাঢ় বন্ধুত্বে পরিণত হয়।”
আরেকটি সূত্রে পাওয়া যায় : ‘রবীন্দ্রনাথ দেখেন তাহাদের বাড়িতে বিহারীলাল সকলের প্রশংসার পাত্র; দ্বিজেন্দ্রনাথের কাছে তাহার দ্বার অবারিত, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাহাকে বন্ধুর ন্যায় দেখেন। এমনকি অন্তপুরে নতুন বৌঠান কবিকে নিমন্ত্রণ করিয়া খাওয়ান। তাহার জন্যে আসন বুনেন, তাহার কবিতা সশ্রদ্ধভাবে আবৃত্তি করেন। কবির সম্মান ও সমাদর সর্বত্র। কাদম্বরী দেবী ছিলেন বিহারীলালের বিমুগ্ধ ভক্ত।’ [কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী ও বাংলা গীতি কবিতার ধারা : বিষ্ণুপদ পাণ্ডা]
ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে বিহারীলালের এই সম্পর্ক ক্রমে এতটাই গাঢ় হয়ে উঠেছিল যে, তা আর সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ থাকল না। তরুণ রবীন্দ্রনাথ থেকে পরিণত রবীন্দ্রনাথও বিহারীলালে মুগ্ধ ছিলেন। এই মুগ্ধতা থেকেই একদা রবীন্দ্রনাথ বিহারীলালের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কে জড়ালেন। পরবর্তীতে দৃশ্যমান হয়েছে যে, এই সম্পর্ক স্থাপন রবীন্দ্রনাথের পুরো জীবনের অন্যতম একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। যত বড় আশা নিয়ে সম্পর্কটি স্থাপন করেছিলেন তার চেয়ে বড় আঘাত তাকে সইতে হয়েছে বাংলা ভাষার এই মহান কবিকে। বড় মেয়ে মাধুরীলতার বিয়ে হয় কবি বিহারীলালের পুত্র শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীর সাথে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মেধাবী ছাত্রটি কবির সাথে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভদ্রতাটুকুও বজায় রাখেননি। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বড় ও মেজোর একসাথে বসবাসকালে এ কলহের সূত্রপাত। শরৎ বনাম সত্যেনের মধ্যে কলহটাই শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথে এসে অর্পিত হয়। রবীন্দ্র-শরৎ এর মনোমালিন্য এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল যে, শ্রদ্ধেয় শ্বশুরকে কক্ষে ঢুকতে দেখেও চেয়ার ছেড়ে ওঠা দূরের কথা টেবিলের উপর থেকে পাও নামাতেন না।
রবীন্দ্রনাথ একটা সময় বিহারীলালে উদ্বেলিত হয়েছিলেন। উদ্বেলিত হয়ে তাকে গুরুমর্যাদায় অভিসিক্ত করেছেন; ‘ভোরের পাখি’ অভিধা দান করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মত মহৎ কবি যাকে গুরু বলে স্বীকার করেছেন; যার প্রতি এতোটা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন; স্বভাবতই সাহিত্যসমঝদারের চোখ গিয়ে পড়েছে তার ওপর। রবীন্দ্রনাথের এ দুর্নিবার আগ্রহ ব্যতীত কি সাহিত্যবিশ্লেষকবৃন্দ বিহারীলাল নিয়ে এতটা সময় ব্যয় করতেন? তারা কি বিহারীলালকে বাংলা কবিতার ইতিহাসে এতোটা ফোকাস করতেন?
বিহারীলালের প্রায় সমসাময়িক কবি বা বলা যায় বিহারীলালের কিছুটা হলেও জ্যেষ্ঠ কবি মাইকেলকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা রহস্যময়। মাইকেল বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ নিশ্চুপ থেকেছেন সারাজীবন। অথচ মাইকেল বাংলা কবিতার একাই একটি যুগ নির্মাণ করেছেন। মাইকেলই বাংলা কবিতার ধারাকে জাতে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। অথচ রবীন্দ্রনাথ দুর্বল কবি বিহারীলালকে নিয়ে ছিলেন কতটা সরব। তার এতটা মুখরতার কারণেই সমালোচকেরা রবীন্দ্রকাব্যে বিহারীলালের প্রভাব খুঁজে পান।
আরও পড়ুন
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ
বিহারীলালকে উচ্চে তুলে ধরতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ কখনও কখনও মাইকেলকে ছোট করতে বা কটাক্ষ করতে পিছপা হননি। তিনি বলেছেন, ‘বিহারীলাল তখনকার ইংরেজি ভাষায় নব্য-শিক্ষিত কবিদের ন্যায় যুদ্ধ বর্ণনাসঙ্কুল মহাকাব্য, উদ্দীপনামূলপূর্ণ দেশানুরাগমূলক কবিতা লিখিলেন না এবং পুরাতন কবিদিগের ন্যায় পৌরাণিক উপন্যাসের দিকে গেলেন না। তিনি নিভৃতে বসিয়া নিজের মনে নিজের মনের কথা বলিলেন।’ মন্তব্যটি দ্বারা রবীন্দ্রনাথ বিহারীলালকে উঁচুতে তুলে ধরেছেন ঠিক কিন্তু আবার একইসঙ্গে স্পষ্টত মাইকেলকে কটাক্ষ করেছেন।
অথচ এই বিহারীলাল সম্পর্কে প্রখ্যাত পণ্ডিত প্রমথনাথ বিশী বলেছেন, ‘তিনি নব্য রোমান্টিক কবিগণের অগ্রণী আর বাঙালি মাইনর (অপ্রধান) কবিগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।’ ড. তারাপদ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘বাংলা সাহিত্যে বিহারীলাল সার্থক কবি খ্যাতিতে স্মরণীয় নন।’ ড. শশীভূষণ দাশগুপ্ত বলেন, ‘তিনি যে বঙ্গ-সাহিত্যে বা বঙ্গ কবিতারাজ্যে একটি স্পষ্ট যুগান্তর ঘটাইয়াছিলেন, এমন বলা যায় না।’
বিহারীলাল চক্রবর্তী বাংলা ভাষার একজন কবি; সন্দেহ নেই। বাংলা কবিতার ইতিহাসে তাঁর স্থান নিশ্চয় আছে। এই লেখাটিতে তাকে ছোট করার কোনরূপ উদ্দেশ্য নেই। তা সম্ভবও নয়। প্রকৃত কবিকে কখনও দু’ একটি প্রবন্ধ বা নিবন্ধ লিখে ছোট করা যায় না। প্রকৃত সত্য একসময় বেরিয়ে আসে।
বিহারীলাল পৃথিবীতে এসেছিলেন আধুনিক বাংলা কবিতার একেবারেই উষালগ্নে। তাঁর সম্মুখে গুরুত্বপূর্ণ কোন রোলমডেল ছিল না। কাউকে অনুকরণ বা অনুসরণ করে লেখা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাই তিনি যা লিখেছেন সবই মৌলিক। বাংলা কবিতায় তাঁর অবদান নেহাৎ কম নয়। তাঁর বেশ কয়েকজন শিষ্য ছিল যারা বাংলা কবিতায় যথেষ্ট অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এদের মধ্যে প্রধানতম নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথ; যার বহুবর্ণিল উজ্জ্বল প্রভা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিক। মহান রবীন্দ্রনাথ বিভিন্নভাবে গুরু বিহারীলালের অবদান স্বীকার করেছেন। বাংলা ভাষার আরেক স্মরণীয় কবি অক্ষয়কুমার বড়ালও তাঁর একজন যোগ্য শিষ্য। কবি অক্ষয়কুমার বড়াল তাঁর গুরুর জয়গান গেয়েছেন এভাবে :
‘এসেছিলে শুধু গায়িতে প্রভাতী,
না ফুটিতে ঊষা, না পোহাতে রাতি,
আধারে আলোকে প্রেমে মোহে গাঁথি,
কুহুরিলে ধীরে ধীরে
ঘুমঘোরে প্রাণী ভাবি স্বপ্নবাণী
ঘুমাইল পার্শ্ব ফিরে।’
(ঋণ – দৈনিক ইনকিলাব)
