
বাকিদের চোখে যে বিজ্ঞাপন অবান্তর, উদ্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে তাই হয়ে উঠবে খাজানার সুলুকসন্ধান
বিজ্ঞাপন মারিবেন না- গেরস্থবাড়ির দেওয়ালে এই সাবধানবাণী তো যুগযুগান্তর ধরে দৃশ্যমান হচ্ছে। কিন্তু মজার বিষয়, যা জনস্বার্থে প্রচারিত সরকারি বিজ্ঞাপন নয়, বৃহৎ ব্র্যান্ডের ঝাঁ চকচকে বিজ্ঞাপন নয়, সেইসব নেহাতই অনার্য অনভিজাত বিজ্ঞাপনরা ঠাঁই পাবে কোথায়? কর্পোরেশনের দেওয়াল তো তাদের কাছে স্বর্গ; এছাড়াও আছে বাসের দেওয়াল, লোকাল ট্রেনের দেওয়াল, সেসবই বা বাদ যাবে কেন? খবরের কাগজের ভেতরের পাতা এবং বিজ্ঞাপনী ক্রোড়পত্রও আছে। নিত্যপথযাত্রীদের চোখে পড়ে দেওয়ালজোড়া এসব বিজ্ঞাপন, কিন্তু এইসমস্ত বিজ্ঞাপন তো সকলের জন্য নয়। এদের বয়ান, এদের গড়ন এসবই বলে দেয় আদতে এসব বিজ্ঞাপন নির্দিষ্ট কিছু মানুষের জন্য। জনপরিসরে উন্মুক্ত হয়ে থাকা এসব বিজ্ঞাপনের পিছনে যে ব্যবসায়িক উদ্যোগ তার লক্ষ্য তো বিশেষ ধাঁচের কিছু মানুষ। তারা এই বিজ্ঞাপনকে ঠিক খুঁজে নেন। বাকিদের কাছে যা হাস্য উদ্রেককারী বলে মনে হবে, ব্যক্তিবিশেষে তাই হয়ে উঠবে জরুরি। বাকিদের চোখে যে বিজ্ঞাপন অবান্তর, উদ্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে তাই হয়ে উঠবে খাজানার সুলুকসন্ধান।
আগের পর্বে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পথের কাঁটা'-র উল্লেখ ছিল, যেখানে এক সুপারি কিলার সাংকেতিক ভাষায় খবরের কাগজের ভেতরের পাতায় এককোণে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। এমন অভিনব অপরাধের ব্যবসার বিজ্ঞাপন বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যায় কি? সাম্প্রতিককালে সোশ্যাল মিডিয়াতে জনপ্রিয় হয়েছিল একটি বিজ্ঞাপন যেখানে স্পষ্টাস্পষ্টি জানিয়ে দেওয়া ছিল যে "এখানে খুনের অর্ডার নেওয়া হয়"। শুধু তাই নয়, চরম নীতিবোধসম্পন্ন এই খুনি মরার আগে শেষ ইচ্ছাপূরণ করেন, খুনের থেকে বেশি মূল্য ধার্য করেন হাত পা ভাঙার জন্য, এবং 'আত্বীয়'কে খুনের সুপারি দেওয়া হলে সাধারণ খুনের থেকে ঢের বেশি পারিশ্রমিক চান এবং খুনের আগে 'অগ্রীম' টাকা নেন না। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এমন বিজ্ঞাপন নিয়ে রসিকতাই হয়েছিল বেশি, তবে এমন ভয়াবহ বিজ্ঞাপনের অন্তর্নিহিত রহস্য কী হতে পারে তা নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায়নি কেউই। তার কারণ এজাতীয় বিজ্ঞাপনের ভাষ্যে জেগে থাকে বিশ্বায়ন এবং পুঁজিবাদের বিপ্রতীপের এক অনন্য চরাচর, যেখানে বিজ্ঞাপনের ক্ষমতা প্রদর্শন নেই, পণ্যসংস্কৃতির আস্ফালন নেই। আছে গেরিলা রোমাঞ্চ, গোপন গোপন খেলা। এই বিজ্ঞাপনের বানান ভুলও তাই নির্মল ঠেকে এই কর্পোরেটের দাপটে বিধ্বস্ত সময়ের মানুষের কাছে।
দেওয়াললিখনের সঙ্গে সঙ্গেই দেওয়ালবিজ্ঞাপনও রীতিমত জরুরি। 'নেশা মুক্তি কেন্দ্র'-র বিজ্ঞাপন এ শহরের দেওয়াল যতটা সদর্পে দখল করে রাখে, ততটা রাজনৈতিক দেওয়াললিখনও পারেনা। এই কেন্দ্রগুলি আদপে কোথায় দৃশ্যমান হয় কেউ জানে না, এইসব কেন্দ্রে সাতদিনের মধ্যে নেশাড়ু মানুষকে কারণসুধা এবং অন্যান্য নেশার দ্রব্য থেকে বিরত করার যে গাধা পিটিয়ে ঘোড়া বানানো মার্কা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় তার বাস্তবতা সম্পর্কেও কেউ ওয়াকিবহাল নয়। একটি ঠিকানা, একটি ফোন নাম্বার এবং কোনো বিশেষজ্ঞের নাম জ্বলজ্বল করে এইসব বিজ্ঞাপনে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোন শাখার বিশেষজ্ঞ তিনি তাও উল্লিখিত থাকে এসব বিজ্ঞাপনে।
প্রসঙ্গত অর্শ ভগন্দর ফিশচুলা বা যৌনরোগ সারানোর সাকিনেরও সন্ধান থাকে এসব বিজ্ঞাপনে। উনিশ শতকের বাংলায় পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিদ্যা যখন এসে পৌঁছেছিল তখন বঙ্গমানসে বহু রোগ সম্পর্কে প্রাচীন ধোঁয়াশা কেটেছিল। কিন্তু তাও বেশ কিছু রোগ এখনও গণপরিসরে স্পর্শকাতর হয়ে রয়েছে। সেসব রোগের চিকিৎসার বিজ্ঞাপনও এইসব নন-এলিট দেওয়ালে আশ্রয় নেয়।
এরপরেই আসে জ্যোতিষীদের বিজ্ঞাপনের প্রসঙ্গ। জীবনের জটিলতম সমস্যা থেকে সহজ সমাধানের রাস্তা বাতলানো হয় এসব বিজ্ঞাপনে। গেছোদাদাকে পাকড়াতে পারলেই জীবন জলবৎতরলং। ডায়মন্ডহারবার, রাণাঘাট, তিব্বত-বিষয় খানিক এরকমই। বশীকরণ এবং এজাতীয় নানাবিধ তারিকায় নানানরকম অভাবমোচন এবং সাফল্যলাভের পথনির্দেশ থাকে এইসব বিজ্ঞাপনে। বাসে বা লোকাল ট্রেনেও এর দেখা মেলে। দৈনন্দিনতার ক্লেশ বহন করে যারা ডেলি প্যাসেঞ্জারি করেন তাদের সামনে এইসব বিজ্ঞাপনের ডালি খুলে দেওয়া কিন্তু পুঁজিনির্ভর বিজ্ঞাপন জগৎসুলভ নয়। বুজরুকি হোক, ভন্ডামি হোক, কিন্তু এই বিজ্ঞাপনগুলির পেছনে কোনো করাল বহুজাতিক দাঁতনখ নেই। আর্থসামাজিকভাবে পীড়িত মধ্যবিত্তের কাছে এই বিজ্ঞাপন যেন সুলভে স্বপ্নপূরণের হাতছানি।
খবরের কাগজের ভেতরের পাতায় পাত্র-পাত্রী এবং নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণাকে সরাসরি বিজ্ঞাপনের আওতায় ফেলা যাবে না। তবে এইসব পাতায় চোখ বোলালে বিবিধ কর্মকান্ডের আভাস পাওয়া যায়। এখানেই ফ্রেন্ডশিপ ক্লাব এবং মাসাজ পার্লারের বিজ্ঞাপনও পাওয়া যাবে। যৌনতা নিয়ে অজস্র ট্যাবু যেখানে জমা আছে, সেখানে খানিক ছদ্মবেশে এমন ঢালাও দেহব্যবসার এবং যৌনসুখ পাইয়ে দেওয়ার পরিষেবার বিজ্ঞাপন প্রমাণ করে ছাইচাপা শহুরে লিবিডোর আগুন ধিকিধিকি জ্বলছেই। ফুকো সাহেব এইসব বিজ্ঞাপন থেকে বাঙালির ইতিহাসের নতুন কোনো সূত্র খুঁজে পেতে পারতেন।
এইসব বিজ্ঞাপনের ভাষার মধ্যেও কোনো আভিজাত্য নেই। তবে সম্প্রতি একটি মোবাইল কোম্পানি যেভাবে বাংলার প্রথম সারির দৈনিকগুলির প্রথম পাতায় বিজ্ঞাপন দিয়ে খুল্লমখুল্লা বাংলা ভাষার শ্রাদ্ধ করল, তাতে বলতে হয় এইসব অনালোকিত বিজ্ঞাপনের ভাষা আদতে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধই করছে। এই ধরনের বিজ্ঞাপনের ভাষা অতীতে কেমন ছিল তা নিয়ে আলোচনার চেষ্টা হবে পরবর্তী কিস্তিতে।
