জেলে চার ছাত্রীর অবমাননা এই শহরের লজ্জা

সার্চ এর নামে কার্যত অসৌজন্য আচরণের প্রতিবাদ জরুরি ছিল

আলিপুর মহিলা জেলে ছাত্রীদের জেলে ঢোকানোর সময় ‘সার্চ’-এর নামে  পোশাক খুলিয়ে অসম্মান করা হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে এই অসৌজন্য আচরণের যতটা প্রতিবাদ জরুরি ছিল, তার নামমাত্রও হয়নি। হলে ভালো হত। কারণ যা ঘটেছে, তা কার্যত শ্লীলতাহানি।

গণতন্ত্রের নিয়মই হল, চিরকাল কোনও একটি দল ক্ষমতায় থাকে না। ফলে বর্তমান সরকার যদি দোষী ওই মহিলা অফিসারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, তার সুফল হয়তো কোনও দিন তাঁরাও পাবেন। কারণ, পৃথিবীতে এমন কোনও সমাজ কখনও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, যেখানে প্রতিবাদের প্রয়োজন হবে না! আর প্রতিবাদ আন্দোলন থাকলে, জেলখানাও থাকবে।

একটা কথা এখানে বলা জরুরি। চার বামপন্থী মহিলার সঙ্গে জেলে সার্চের নামে যে অসভ্যতা করা হয়েছে, কম বয়েসে দীর্ঘদিন সাংবাদিক হিসেবে জেল কভার করার ফলে আমার জানা আছে, তা চলছে বহুকাল ধরেই। তবে, রাজনৈতিক কর্মী বা ভদ্রলোক বন্দিদের ক্ষেত্রে এটা করা হত না। তাদের ছাড় দেওয়া হত। জেলের চ্যালেঞ্জ গেট, যেখানে এই সার্চ হয়, সেখানে নিয়মিত সাধারণ বন্দিদের ধমকানো হয়, ভয় দেখানো হয়, চমকানো হয়, এবং এখানেই তাদের থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করা হয়, বাড়িতে লোক যাবে, না বাড়ির থেকে লোক এসে টাকা দিয়ে যাবে। জেলের তোলাবাজিটা শুরু হয় এই সার্চ গেট থেকেই। বাম ছাত্রীদের ধন্যবাদ, তাঁরা বিষয়টি সামনে এনেছেন। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য নয়, জেলের এই অমানবিক কাজকর্ম সাধারণ বন্দিদের ক্ষেত্রেও বন্ধ হওয়া উচিত। বিচারাধীন বন্দির মানবাধিকার রক্ষা যে কোনও সভ্য সমাজেই প্রাথমিক শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়।

এত যে ‘সার্চ’ হয়, তাহলে জেলে মদ, গাঁজা, অস্ত্র, মোবাইল ফোন নিয়মিত ঢুকছে কী করে? দুটি নির্দিষ্ট ঘটনা বলি। দুটোই ৯০ এর দশকের শেষের দিকের ঘটনা। প্রথমটা এক মেলায় হারিয়ে যাওয়া ১০ বছরের এক বাচ্চাকে নিয়ে। তার বয়স ১৮-র বেশি দেখিয়ে তাকে জুভেনাইল জেলে না পাঠিয়ে প্রেসিডেন্সি জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার পর প্রতি রাতে এই বাচ্চাটিকে নিলামে চড়ানো হত। একেক দিন একেক জন অপরাধী কিনে নিত বাচ্চাটিকে যৌন খিদে মেটাতে। তখন প্রেসিডেন্সি জেলের জেল সুপার ছিলেন দীপক চৌধুরি। পেশাগত সূত্রে আলাপ হলেও বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন ভদ্রলোক। জেলের এক ওয়ার্ডেনের থেকে খবরটা পাই। দিলীপবাবুকে নানা ভুল ভাল বুঝিয়ে ছেলেটির সঙ্গে জেলে গিয়ে দেখা করি। ওকে দিয়ে ওর নাম ঠিকানা লিখিয়ে নেই একটা সাদা কাগজে। খবরের সঙ্গে সেই চিরকুটটাও ছাপা হয় পরের দিন। খবর দেখে আসানসোল থেকে বাবা মা এসে বাচ্চাটিকে নিয়ে যান। দিলীপবাবুর সঙ্গে পরে দেখা হতে বলেছিলেন, ‘আমার জেলের বড্ড বদনাম করে দিলেন’। কিন্তু সম্পর্ক নষ্ট হয়নি। প্রশ্ন হল, এত যে সার্চ হয়, তাহলে তাহলে ‘দক্ষ’ অফিসারদের নজর এড়িয়ে বাচ্চাটা ঢুকল কী করে? এইযে এখন বলা হচ্ছে, ওই চার ছাত্রীর ক্ষেত্রে রুটিন সার্চ করতে গিয়ে কোনও এক অফিসার অতিসক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, ব্যাপারটা মোটেই অত সরল বলে মনে হয় না। যিনি এটা করেছেন, তিনি এটা জেনেই করেছেন যে, তিনি চার বামপন্থী ছাত্রীকে হেনস্তা করছেন। ভয়টা সেখানেই। প্রশ্নটাও সেখানেই।

দ্বিতীয় ঘটনা। আলিপুর জেলে তখন ইন্দিরা গান্ধি ফুটবল টুর্নামেন্ট হত প্রতি বছর। একবার ফাইনাল ম্যাচ হয়ে যাওয়ার পর খবর এল, কালীঘাটের শ্মশান স্বপন-সহ শহরের কয়েক জন কুখ্যাত গুণ্ডা ওই ফাইনাল ম্যাচ দেখতে জেলে বিশেষ অতিথি হয়ে এসেছিল। তথাকথিত দক্ষ অফিসারদের এত সার্চ সত্ত্বেও কী করে জেলে ঢুকল বাইরের কুখ্যাতরা? তখন জেল মন্ত্রী ছিলেন আরএসপির নেতা বিশ্বনাথ চৌধুরি। তিনি কিন্তু এই খবর বেরোনোর পরও কারও বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেননি।

সার্চের কতগুলো আধুনিক পদ্ধতি আছে। তার অন্যতম হল মেটাল ডিটেকটর। জেলে কেন মেটাল ডিটেকটর দিয়ে সার্চ করা হয় না? কারণ, যার মোবাইল ফোনটা আমি ধরতে চাই না, মেটাল ডিটেকটর সেটাও ধরে ফেলবে। বন্ধ হয়ে যাবে লেনদেনের ব্যবসা। সার্চের জায়গায় সাধারণ বন্দিদের নিয়মিত গালাগাল করা হয়, সঙ্গে লাথি চড় চাপাটিও থাকে। ওইখানে সিসিটিভি থাকলেই এটা ধরা পড়বে। ২০ কোটি টাকা দিয়ে জ্যামার বসানো হলেও, সার্চ গেটে কখনও সিসিটিভি বসানো হয় না। এই অমানবিকতা বন্ধে অবিলম্বে জেলে মেটাল ডিটেকটর এবং সার্চের জায়গায় সিসিটিভি-র ব্যবস্থা করা হোক।

জেল থেকে যাতে অপরাধী বন্দিরা মোবাইল ফোনে ‘অপারেট’ করতে না পারে তার জন্য বছর তিনেক আগে জেলে জ্যামার বসানো হয়েছিল। আলিপুর সেন্ট্রাল জেল, যার শুভ নাম আলিপুর সংশোধনাগার, সেখানে ২০ কোটি টাকা খরচ করে এই জ্যামার বসানো হয়। কিন্তু এই জ্যামার দীর্ঘদিন অকেজো হয়ে পড়ে থাকায় অপরাধীরা তার সুযোগ নিয়ে চলেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, যে মহিলা অফিসার চার বামপন্থী ছাত্রীর সঙ্গে এই ধরনের অসভ্যতা করেছেন তাকে নাকি বেশ ধমক টমক দেওয়া হয়েছে। মাননীয় কারামন্ত্রী দয়া করে শুনুন, এটা কিন্তু গোপনে ধমক দেওয়ার বিষয় নয়। কারা দপ্তরের উচিত বিবৃতি দিয়ে তাঁদের মতামত জানানো। কারণ সরকারী অভিমত প্রকাশ্যে না আসলে সরকার নিজেই ভুল বোঝা-বুঝির জায়গা তৈরি করে দিতে পারে।

Developed by DXDasia