
বিখ্যাত ক্রিকেটারের পয়া ব্যাট নিয়ে খেলতে নামাকে কার সাহস কুসংস্কার বলে
বিখ্যাত ক্রিকেটারের পয়া ব্যাট নিয়ে খেলতে নামাকে কার সাহস কুসংস্কার বলে! অথচ নির্দোষ দুই শালিক নিয়ে তো আমরা হাসাহাসি করেই থাকি। মাঝে মাঝে মনে হয়, কিছু ‘কুসংস্কার’ যদি থেকেই যায়, ক্ষতি কী? তাতে কারও বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া আটকাবে না। অবশ্যই ঝাড়ফুক, লোক ঠকানো বাবাদের কারসাজি, ডাইনি করা, ওঝাগিরিসহ নানা ধরনের মন্ত্র ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে এই কথা বলা হচ্ছে। চুল আঁচড়াতে গিয়ে চিরুনি পড়ে গেলে বাড়িতে যদি অতিথি আসে তো ভালো। আর যদি না আসে, তাতেই বা কার কী এসে যায়! যেটাকে আমরা কুসংস্কার বলি, সেটা আসলে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া স্মৃতি ও সম্ভাবনার প্রকাশ। একটা বই হাতে এল। পশ্চিমবঙ্গ তথ্য সংস্কৃতি বিভাগের ‘লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র’ প্রকাশিত, নাম, ‘নদিয়া’। তাতে একটি লেখার নাম, ‘লোকবিশ্বাস ও লোকসংস্কার’। লেখক, বরুণকুমার চক্রবর্তী। সেখানে বেশ কিছু লোকবিশ্বাস ও লোকসংস্কার সংকলিত করেছেন লেখক। তার কিছু আমাদের জানা, কিছু কিছু কেউ কেউ মানেন, অনেকে মানেনও না। তবে প্রকাশ্যে শহুরে লোক এসব স্বীকার করতে লজ্জাই পান। আবার অনেকেই এসবকে অশিক্ষার প্রকাশ বলে মনে করেন। বামপন্থীদের বড় অংশই এসবের ঘোর বিরুদ্ধে। প্রকৃতপক্ষে ভালো করে দেখলে দেখা যাবে, এই সব লোকবিশ্বাসে, যাকে ঠিক কবে থেকে কুসংস্কার বলা শুরু হল আমার জানা নেই, এক ধরনের নরম স্নেহ, ভালোবাসা, মমতার ছোঁয়া রয়েছে। এই যে লোকবিশ্বাস, মেয়েরা ভাত খেতে খেতে গান গাইলে দূরে বিয়ে হয়, এর মধ্যে সেই ছোঁয়া খুবই স্পষ্ট। বা, দুটো লন্ঠন বা হ্যারিকেন পাশাপাশি রাখতে নেই, ঝগড়া হয়। সেতো এমনিই হবে। একে তো সব ঘরে একটা করে হ্যারিকেন দেওয়া সম্ভব হয় না, তার উপর যদি পাশাপাশি দু’টো রাখা হয় তো ঝগড়া ছাড়া কী হবে!
বরুণকুমার চক্রবর্তীর সংকলন থেকে আরও কয়েকটি লোকবিশ্বাস এখানে উদ্ধৃত করা হল। যেমন দু’জন এক সঙ্গে একই কথা বলে উঠলে বাড়িতে অতিথি আসে। যানবাহনের সামনের চাকায় পা দিতে নেই, সেখানে বিশ্বকর্মার অধিষ্ঠান। রাতের বেলা গাছে উঠতে নেই। রাতের বেলা শিস দিতে নেই। নারকেল গাছে যদি নারকেল না ধরে তবে পূর্ণিমার রাতে নৌকা থেকে পেরেক চুরি করে এনে গাছে বিঁধলে ফল ধরবে। রবিবার বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কাটতে নেই, কারণ, রবিবার বাঁশগাছের জন্মদিন, ওই দিন বাঁশ কাটলে বাঁশঝাড় নির্মূল হওয়ার সম্ভাবনা। ঝড় উঠলে উঠোনে পিড়ি পেতে দিতে হয়, তাহলে ঝড় থেমে যায়। ভাঙা আয়নায় মুখ দেখলে দুঃখ বাড়ে। মাটিতে লোহা দিয়ে দাগ কাটলে চোর আসে। সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালার সময় ঘরে ঘুমোতে নেই। ঘরের চৌকাঠে বসতে নেই। কর্মকারের কামারশালায় লোহা ডোবানো যে জল, তা চুরি করে এনে পায়ে দিলে পায়ের ঝাঁঝর রোগ ও পা ফাটা রোগ ভালো হয়। সুরভিত অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম যত দিন না এসেছে, তত দিন ত্বকের যত্নের হয়তো এই ছিল নিদান।
অনেকেরই পরীক্ষার জন্য পয়া পেন থাকে। কারও থাকে পরীক্ষার লাকি জামা। কেউ পয়া ব্যাট ছাড়া মাঠেই নামেন না। মন্ত্রীরা নারকেল ফাটান। বিশিষ্ট বিজ্ঞানীকেও দেখা গেছে গ্রহণে কুটোটি মুখে না তুলতে। এসবও আসলে সেই আধুনিক ভাষায় কুসংস্কার-ই।
বরুণ কুমার চক্রবর্তীর সংকলনে যত লোকবিশ্বাসের কথা আছে, তার বেশির ভাগই হল, ‘না’। অমুক কোরো না, তমুক কোরো না। বোঝাই যায়, অনিশ্চয়তাময় জীবনে এসবই আসলে ছোট ছোট ‘ভরসা থাকুক’।
