কেন মীনের নয়ন নাহি দিলে /রাধা – কৃষ্ণলীলা মধুর লীলা /পলকে কেন ছেদ হানিলে?

তখন ঘনঘন যেতাম অনন্তদাস বৈরাগ্যর ওখানে। অনন্তদাস আশি পেরোনো। সুঠাম চেহারার। এখনও সাইকেল চালিয়ে মাইলের পর মাইল পেরিয়ে শিষ্যবাড়ি যান।কিছু জমিজমা আছে। নিজে চাষ করেন। পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরেন। সেই মাছে আখড়ায় সেবা হয় দিবসী উৎসবে। জমির চালে হয় সারা বছরের অন্ন সেবা। সহজিয়া বৈষ্ণবরা মাছ খান। মাছ খাওয়া নিয়ে মনোময় এক কথা বলেছিলেন আমায় অনন্তদাস বৈরাগ্য। বললাম, গৌড়ীয় বৈষ্ণবরা তো মাছ খান না। তাঁরা নিরামিষাশী। অনন্তদাস বললেন, সাধনা করতে হবে বাবা মাছের মতো। বললাম, কীরকম সেটা? অনন্তদাস বললেন, দেখো না মাছের চোখের পলক পড়ে না। সেই রকম অপলক চোখে তাকিয়ে থাকতে হবে বাবা, তাঁর পানে। অনন্তদাস বৈরাগ্যর সাধন সঙ্গিনী মাধবী দাসী আমাকে বিষয়টা বোঝানোর জন্য দুকলি গান গাইলেন এবার — কেন মীনের নয়ন নাহি দিলে /রাধা – কৃষ্ণলীলা মধুর লীলা /পলকে কেন ছেদ হানিলে? অনন্তদাস বললেন, বাবা রাধাকৃষ্ণের লীলার মাধুর্য অবিরাম দেখতে হবে ওই মীনের নয়নে। নিজের ভেতরকার সব অন্ধকার দূর করতে বাবা মাছের মতো স্থিরতা চাই । স্থির না হলে সাধনা হবে না যে। মাছের সঙ্গে স্থিরতার সম্পর্ক কি? জিজ্ঞেস করলাম আমি। অনন্তদাস বললেন, আমরা বৈষ্ণবরা বড় মাছ খাই। ছোট মাছ একদম খাই না। কোনও জিওল মাছও খাই না। বড় মাছ সাধন সম্পৃক্ত ব্যাপার। জিজ্ঞেস করলাম, কীরকম? বললেন, ছোট মাছ দ্যাখো না কেমন চঞ্চল। পুকুরের ওপর ওপর ভেসে বেড়ায়। চঞ্চল হয়ে ঘুরে বেড়ালে যে সাধনা হবে না। ছোট মাছ গভীর জলে গেলেই খাবি খাবে আর মরে যাবে। সাধকের কাজ গভীরে যাওয়া। যোগে, দম শ্বাসে গভীরে গিয়ে রাধাকৃষ্ণের মধুর লীলা অতীন্দ্রিয় হয়ে অপলক দৃষ্টিতে অনুভব করতে হবে বাবা। না হলে কিছুই হবে না। বললাম, কেমন সে সাধনা? বললেন, বড় মাছ পুকুরের তলায় থেকে বুড়বুড়ি ছাড়ে। শ্বাস নেয়। তার মানে ওরা আমাদের মতো শরীর সাধনায় রত। কুম্ভক করে জলের তলদেশে শ্বাস ভর্তি করে। রেচক করে শ্বাস ছাড়ে। বড় মাছের হল গিয়ে যোগীর লক্ষণ। জিজ্ঞেস করলাম, আর জিওল মাছ না খাওয়ার কারন? বললেন, দ্যাখো না কই, মাগুর, শিঙি, শোল মাছ ডাঙাতে বাঁচে। গৃহস্থ হাঁড়িতে রেখে দেয়। জাওলা মাছের বাসনা বেশি। ওরা ভোগী। গৃহস্থের মতোই। তাই সাধক ও মাছ মুখে তোলে না বাবা। বড় মাছ — রুই, কাতল এরা সাত্ত্বিক স্বভাবের। জল থেকে তোলা মাত্র মরে যায়। সাধকের শরীরের রজগুণ আর তমগুণ মারতে হয়। এগুলো বাসনা। এই বাসনা ত্যাগই সাধনা বাবা।বড় মাছে সেই বাসনাহীন অপলক চোখের সুলক্ষণ থাকে। সাধককে বড় মাছের মতোই মনের তলদেশে গিয়ে দম শ্বাস দিয়ে বুড়বুড়ি তুলে অপলক হয়ে তাঁর দিকে চেয়ে থাকতে হবে। ছোট মাছের মতো হলে সংসারে খাবি খেয়ে মরে যেতে হবে বাবা। অল্প জলের তিতপুঁটি হলে চলবে না যে। মাধবী দাসী এবার বললেন আমায়, অপলক নয়নে চেয়ে থাকো গা বাবা। তোমার যা কাজ তাই মাছের নেত্র এনে একভাবে করে যাবা। কর্ম আর ধর্ম করবা মাছের স্বভাব নিয়ে। সংসারে বৃন্দাবন আছে। শুধু তোমার দেখবার চোখ নাই বাবা। দ্যাখো। কর্মে ধর্মে বৃন্দাবনের লীলাখানি। অপলক হয়ে আগায় যাও। অশিক্ষিত মাধবী দাসীর মুখে এই সাধনার অভিব্যক্তি শুনে আমি থ। এরকম করে ভাবতে পারে না কেন আমার শিক্ষিত মন? দেহসাধনায় যৌনতা ও বাউল গানের কথকতা বই দুটিতে অনন্তদাস বৈরাগ্য ও মাধবী দাসীর জীবনধারণ আরও বিস্তারিত লিখেছি। এঁদের সহজ প্রেমের গল্প আমাদের প্রচলিত প্রেম কাহিনিগুলোকে হার মানিয়ে দিতে পারে। ওদের বৃন্দাবনী আখড়ায় সেই কবে থেকে আমার গতায়াত। আমি যাই এই দুই মানুষের রাধাকৃষ্ণলীলা দেখতে। এর থেকে বড় বৃন্দাবনের খবর আমার জানা নেই আর।

Developed by DXDasia