
সাধনা কী? মাকি কাজুমি বললেন, সহজ আর সরল হওয়া
হাটগোবিন্দপুর আশ্রমে বাড়ির ঠাকুমা দিদিমার মতো আটপৌরে ধরনের ধবধবে থান কাপড় পরে ফর্সা রঙের বেটেখাটো গড়নের মাকি কাজুমি যখন আমাকে যত্ন করে ভাত বেড়ে খেতে দিচ্ছিলেন তখন তাঁকে মনে হচ্ছিল আমার মা। আমি ভাবছিলাম ওসাকার কানসাই ইউনিভার্সিটির দর্শনের সেই ছাত্রী কোন সাধনার বলে হয়ে উঠলেন বাংলার বাউলনি, আমাদের মা গোঁসাই। ভাত খাওয়া হয়ে গেছে। এঁটো থালা গুছোতে যাব। মা বকা দিলেন। বললাম, নিয়ে নিই। আপনি নেবেন কেন? এর আগে প্রণাম করতে গেলে চুলে বিলি কেটে দিয়ে বলেছিলেন, সন্তানের জায়গা মায়ের পায়ে নয় বোকা ছেলে। বুকে। এবার বললেন, ছেলের এঁটো মাকে কুড়ুতে হয়। আদরের ধন তো সবাই। আশ্রমের সবাই খাবে। ভাত বেড়ে দেওয়া। একা হাতে রান্না সামলানো। আসেজন বসেজন। সবই তিনি করছেন হাসি মুখে বাড়ির মায়ের মতো। বললাম, জয়রামবাটির এক মা এমনই তদারকি করতেন ছেলেদের জন্য। মাকি কাজুমি তখন সারদা মায়ের নাম জানতেন না। স্বামী গম্ভীরানন্দের লেখায় সারদা মায়ের সেই বর্ণনার কথা বলতেই মাকি মা প্রণাম করলেন দু’হাত জোড় করে। বললাম, মানিয়ে নিলেন কীভাবে? বললেন, মায়ের ভাষা দিয়ে। যখন প্রথম এলাম ভাষা তো বুঝতাম না। তবে পৃথিবী জোড়া মায়ের ভাষা এক। ওটা মেয়েদের সহজাত। রপ্ত করতে হয় না। তাই মানিয়ে নিতে হয় না। হয়ে উঠতে হয়। সাধনা এটাই। বললাম, সাধনার মূল বিষয় কী? হাটগোবিন্দপুরে তখন বিকেলের ফুরফুরে হাওয়া। কোঁকড়া চুলও উড়ছে হাওয়ার দাপটে মাকি মায়ের। বললেন, সহজ হওয়া, সরল হওয়া। মানুষ ধরে মানুষ হওয়া। এই তো। মানুষ হওয়াই মানুষের শ্রেষ্ঠ সাধনা। ভাবছিলাম কত অপপ্রচার একসময়। তাঁর গান করা নিয়ে। জাপানের মতো সভ্য দেশের শিক্ষিতা কোন জীবন দর্শনের আশায় এখানে এসেছেন তা তখন কেউ ভাবেননি। ভেবেছেন সাধন দাস বৈরাগ্যর সঙ্গে তাঁর সখ্য নিয়ে। শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলাতে একসময় গাইতে দেওয়া হয়নি পর্যন্ত মাকে। সেসব এখন অতীত।
১৯৯১ সালে জাপানের ভারত উৎসবে সাধন দাস বৈরাগ্যর কন্ঠে বাউল শুনে ঘর ছেড়ে এসেছেন তিনি। আস্তে আস্তে নানা বিদ্রূপ টিপ্পনী সহ্য করে সবাইকে আপন করে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলার বাউলনি। বাংলা শিখেছেন। গান শিখেছেন। সাধনা করেছেন। বাংলার বাউলকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন বিশ্বের দরবারে।জাপানের ওসাকায় এখন রীতিমত বাউল চর্চা হয় মাকি মায়ের তত্ত্বাবধানে। জাপানি বাউলরা আসেন প্রতি বছর জয়দেবে। মনের মানুষ আখড়া গমগম করে। বৈভবের জীবন ছেড়ে একজন বিদেশিনীর বাংলার বাউলনি হয়ে ওঠার নেপথ্যে যিনি তিনি সাধন দাস বৈরাগ্য। তিরিশ বছর বয়সে তিনি ঘর ছেড়ে সহজিয়া পথে চলে আসেন। গুরু পান সুরেন চাঁদ গোস্বামীকে। গান শেখেন অনন্ত দাস বাউলের কাছে। দেহতত্ত্ব রপ্ত করেন কৃষ্ণখ্যাপা চাঁদ গোস্বামীর তত্ত্বাবধানে। বর্ধমানের হাটগোবিন্দপুর, আমরুল পঞ্চাননতলা ও জয়দেবে তাঁর তিন তিনখানি আখড়া এখন। ৩০০০ এর ওপর দেহতত্ত্ব বিষয়ক গান লিখেছেন সাধন দাস বৈরাগ্য। প্রতিটি গানে তত্ত্ব গুরু হিসেবে মা গোঁসাই মাকি কাজুমির উল্লেখ। এর থেকে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে আমাদের মায়ের। নৈহাটির লালন আকাদেমি সাধন দাস বৈরাগ্যর ২০০ গান দিয়ে একটা গ্রন্থ ছেপেছে উজানতরী নামে। সম্প্রতি এই বইটি উপহার পেলাম মনের মানুষ অয়ন হালদার এর কাছ থেকে। মাকি মাকে প্রথম দেখি ২০০৬ সালে। তারপর অনেক অনেক বার… উজানতরী পড়তে পড়তে কত স্মৃতি। হাটগোবিন্দপুর আবার ডাকছে। শুনতে পাচ্ছি মায়ের গলা। সাধু সঙ্গ বড় সঙ্গ সঙ্গ আমার হল কই।
