
তাঁর বারোশোর ওপর লেখা গানের খাতা আছে বৃত্তিহুদায় আখড়াবাড়িতে
ডুব ডুব ডুব রূপসাগরে আমার মন গানখানা যখন দক্ষিণেশ্বরে বসে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ গাইছেন তখন সবে দেহ রেখেছেন নদিয়ার বৃত্তিহুদার কুবির গোঁসাই। জাতে যুগী। ঠাকুরের মতন কুলীন নন। তাঁত বুনতেন আর সেই খটখটির সুর গেলেই বোধহয় গান এল মনে। পাল্লা গানের দল বানিয়ে দেশগাঁয় গেয়ে ফিরলেন কুবির সরকার। গাইতে গাইতে সে সময়কার অখণ্ড নদিয়ার ঘোষবিলা থেকে চাপড়ায় এসে পৌঁছে বৃত্তিহুদায় গুরুর দেখা পেলেন। চরণ পালের শিষ্য হয়ে স্ত্রী ও সাধন সঙ্গিনী নিয়ে বাস করতে থাকলেন গুরঘরের কাছে। আর লিখতে থাকলেন সাধন গান। যে গানে জাতাজাতি উঠে গেল। বললেন, আল্লা থাকেন আলজিহ্বায় কৃষ্ণ থাকেন টাগরায়। অর্থাৎ আমরা যা বলি সবেতেই আল্লাহ ও ভগবানের স্পর্শ থাকে। লোকায়ত সাধক সাধনার গানে সবসময়ই এই সাম্যের বাণী বলে গেছেন। গোল তুলেছে যত মোল্লা ও পুরোহিত।
ফকির লালন শাহের মতো নিরক্ষর ছিলেন না গোঁসাই। লিখতে পারতেন। তাঁর বারোশোর ওপর লেখা গানের খাতা আছে বৃত্তিহুদায় আখড়াবাড়িতে। ঠাকুর রামকৃষ্ণ যখন কুবিরের গান গাইছেন তখন তাঁর গান অত ছড়ানো পরিধির ব্যাপার নয়। ছাপা তো দূর অস্ত। সেটা ১৮৮২ সাল। গোঁসাই দেহ রেখেছেন তিন বছর আগে। দক্ষিণেশ্বরে বাউলেরা আসতেন। সুদূর নদিয়ার অখ্যাত লোকসাধকের গান রামকৃষ্ণ ঠাকুর বাউলের মুখ থেকেই তুলেছিলেন। গান এভাবে পৌঁছে যায়। পরিযায়ী বাউলের ডানায়।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যখন কুবির গোঁসাইয়ের গান গাইছেন তখন নদিয়ার ঘোষপাড়াতে কর্তাভজা মত জাঁকিয়ে বসেছে। কলকাতার বাবু থেকে দাশরথী রায় সকলেই মগ্ন কর্তাভজা সম্প্রদায়ের আখড়া ও মেলায়। এর কত আগে উনিশের প্রথমে উইলিয়াম কেরি থেকে শুরু করে বাঘা শ্রীরামপুরের মিশনারিরা সব এসছেন সতী মা ও দুলালচাঁদের সঙ্গে দেখা করতে। আসল উদ্দেশ্য কর্তাভজা সম্প্রদায়ের এক ঈশ্বরবাদের ছোঁয়ায় যদি নিরক্ষর সাধারণজনকে ধর্মান্তরিত করা যায়। কেরিদের সে চেষ্টা সফল হয়েছিল। তা সত্ত্বেও তখন থেকে এখন কর্তাভজা সম্প্রদায় হল বাংলার সবচেয়ে বড় লোকায়ত ধর্মের সম্প্রদায়।এঁদের দেহসাধনা যুগল ভজনায় কলকাতার বাবুরা মজেছে। দোল মেলাতে ছয়লাপ হয়েছে ঘোষপাড়া মেয়ে ও মরদে। তাই বদনাম পেয়েছে এ ধর্ম।
দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের কাছে উনিশের শেষ ভাগে আসছেন কর্তাভজা সম্প্রদায়ের লোক। ঠাকুর যুগল ভজনা পছন্দ করছেন না আবার যুগল ভজনায় রত কুবিরের গান গাইছেন। সেই কুবির গোঁসাইয়ের সমাধি বৃত্তিহুদায়। লালনের মতো ইমারত নয় সেটা। দীন ফকির বাউলের সমাধির গড়ন। বৃত্তিহুদায় আছে কুবিরের গুরু চরণ পালের ভিটে। কুবিরের আখড়াবাড়িতে সাধুগুরুদের ভিড় হয় বৈশাখী পূর্ণিমাতে। গান হবে সেখানে দিনভর। বাউল ফকিরেরা দৈন্য গানে গোঁসাইকে ভক্তি দেবেন। কুবিরের বারোশো গানের গতি হয়নি। শিষ্য নিমাইচাঁদ রায় একশো গান ছেপেছেন। সুধীর চক্রবর্তী আখড়ার খাতা থেকে গান টুকে পঞ্চাশটি গানের ছাপা বন্দোবস্ত করেছেন। শক্তিনাথ ঝাঁও একশো মতো গানের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। ভাবি, পাহাড় প্রমাণ কুবির গোঁসাইয়ের গানের কী গতি হবে। আখড়াবাড়ির খাতা থেকে সেসব টীকা টিপ্পনী বিশ্লেষণ সহ কবে প্রকাশ ঘটবে।আমার জানা নেই।
বৃত্তিহুদায় বুদ্ধ পূর্ণিমার মস্ত চাঁদ মাথায় রেখে সারা বাংলার সাধকেরা গান গোঁসাইয়ের গান। রামকৃষ্ণ ঠাকুরের মতো সবটাই শুনে তোলা। পরিযায়ী বাউল ফকির।গান, দেহতত্ত্বের অমল মনীষা এভাবেই তবে আখড়া থেকে আখড়ায় উড়ে যাক। জানি না কুবির গোঁসাইয়ের গানের ছাপা নিয়তি জুটবে কি না। না হলে আখড়াবাড়ির হাতে লেখা খাতায় অস্পষ্ট হবে আরও গোঁসাইয়ের গান। একসময় হারিয়ে যাবে। তবে আমার বিশ্বাস বাংলার ফকির বাউল গাইবেন, গাইবেন রামকৃষ্ণ ঠাকুরের মতো ভাবতন্ময় সাধক কুবির গোঁসাইয়ের গান।ডুব ডুব ডুব রূপসাগরে আমার মন/তলাতল পাতাল খুঁজে পাবিনাক রত্নধন। বাংলার দেহতত্ত্বের কত রত্ন এভাবে যে হারিয়ে যাচ্ছে।হারিয়ে যাচ্ছে নিগূঢ় রহস্যবিশ্ব।
