তৎকালীন সময়ে সাহিত্য জগতের সুচিন্তকদের মিলন ঘটিয়েছিলেন অক্ষয়চন্দ্র সরকার

তাঁর প্রবন্ধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয় ১৮৯১ সালে

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে মধ্যযুগীয় সমাজ-সংস্কৃতিকে তীব্র ঝাঁকুনি দেওয়ার যে উদ্যোগ দেখা দিল, সেই নবজোয়ারের অন্যতম প্রদর্শন ঘটল ওই শতাব্দীর বিশের দশকের শেষ দিকে। ১৮২৮ সালের ২০ অগাস্ট, ফিরিঙ্গি কমলকুমার বসুর আপার চিৎপুর রোডের বাড়িতে ব্রাহ্ম সভার উদ্বোধন হল। নব্য এই আন্দোলনের পুরোভাগে থাকলেন রামমোহন রায়, রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ, দ্বারকানাথ ঠাকুরের মতো বিদ্বান-সংস্কারকগণ।

এই সংগঠনের মুক্তকণ্ঠী (বিশেষ ক্ষেত্র অনুযায়ী) মানসিকতার ঠিক বিপরীত মুখে দাঁড়িয়ে সমকালীন সময়ে আরও কয়েকজন বিদগ্ধ মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল, যাঁরা পাশ্চাত্য শিক্ষাকে সাদরে বরণ করে নিয়েও জাতপাত এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে যেতে পারেননি, বরং বলা যায়, সচেতনভাবেই তাঁরা সেই সীমাবদ্ধতাকে ঝেড়ে ফেলতে রাজি হননি। যেমন, ভূদেব মুখোপাধ্যায়। যেমন, ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (যিনি ‘রসরাজ’ উপাধি পেয়েছিলেন)। এবং, এঁদের সঙ্গেই আরও একজনের নাম উচ্চারিত হয়। তিনি অক্ষয়চন্দ্র সরকার।

পেশায় উকিল অক্ষয় জন্মসূত্রে চুঁচুড়ার হলেও পেশাগত তাগিদে বহরমপুরে আগমন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বহরমপুরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। ওকালতিতে খুব একটা সাফল্যের মুখ দেখেননি, তাই সব ছেড়ে সাংবাদিকতায় মনোনিবেশ করলেন তিনি। ১৮৭২ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত ‘বঙ্গদর্শনের’ প্রথম সংখ্যাতেই (১২৭৯ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ) তাঁর একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। নাম ছিল ‘উদ্দীপনা’।

এর ঠিক দেড় বছর পরে অক্ষয়চন্দ্র নিজস্ব পত্রিকা শুরু করলেন। ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর জন্ম নিল ‘সাধারণী’। প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর প্রায় একবছর কাঁঠালপাড়ায় বঙ্গদর্শনের প্রেসেই ছাপা হত ‘সাধারণী’। পরে চুঁচুড়ায় অক্ষয়চন্দ্রের নিজস্ব ছাপাখানা তৈরি হলে সেখান থেকেই বেরোত এই পত্রিকাটি। বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত বঙ্কিম সাধারণী-র জন্য ‘জাতিবৈরি’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখে দিয়েছিলেন। সাময়িক পত্রে সমালোচনা-মূলক নিবন্ধকে নিয়মিত করে তুলতে বঙ্কিমের চেয়েও অনেক বেশি অবদান রয়েছে অক্ষয়চন্দ্রের। যদিও, অধ্যাপক জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, অক্ষয়চন্দ্রের সমালোচনা রচনায় ‘সুসমগ্র সামগ্রিক গঠন’ ছিল না। বেশিরভাগ সমালোচনাই ব্যক্তি-আবেগ ও ভাষার অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারে ঔদার্য্য হারিয়েছে। সাংবাদিকতার ব্যস্ত পেশা তাঁর এই ক্ষমতার উপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করা হয়।

‘সাধারণী’ চলেছিল টানা ষোল বছর। শেষের দিকে অর্থাভাব ও লোকাভাবে গঙ্গাধর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নববিভাকর’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়। অবশেষে ১৮৮৯ সালে পত্রিকাটি বন্ধ করে দিতে হয়। তবে সাধারণী-র চেয়েও অক্ষয়চন্দ্র বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা স্মরণীয় হয়ে আছেন ‘নবজীবন’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে। বঙ্কিমচন্দ্রের দ্বিতীয় সম্পাদিত পত্রিকা ‘প্রচার’-এর সঙ্গেই প্রকাশিত হওয়া শুরু করে ‘নবজীবন’। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর প্রথম রচনা এই পত্রিকাতেই। ১৮৮৫-র জানুয়ারি সংখ্যায় তাঁর লেখা ‘মহাশক্তি’ এখানে প্রকাশিত হয়। তৎকালীন সময়ের সাহিত্যজগতের সুচিন্তকদের মিলন ঘটত এই পত্রিকায়। সেখানে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো প্রবীণরা যেমন থাকতেন, তেমন উদীয়মান তরুণদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নামগুলি ছিল রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
 
‘নবজীবন’-এর আয়ুষ্কালও ১৮৮৯-তে সমাপ্ত হয়েছে। এরপর অক্ষয়চন্দ্র যোগ দিয়েছিলেন যোগেন্দ্রচন্দ্র বসুর ‘বঙ্গবাসী’তে। এখানেই তাঁর ইংরেজ-বিরোধী স্বদেশিয়ানার প্রকট প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। ১৮৯১ সালে বঙ্গবাসীতে প্রকাশিত পাঁচটি প্রবন্ধের বিরুদ্ধে যে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয়, তার দুটির রচয়িতা ছিলেন অক্ষয়চন্দ্র। তাঁর স্বদেশপ্রীতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছিলেন- “বলিবেন, অক্ষয়বাবু বাঙ্গালীকে কি দিয়াছেন যে আমরা তাঁহার এত বড়াই করি? আমি বলি, যাহা আর কেহ দেয় নাই। সেটা কী? বাঙ্গালীয়ানা, বাঙ্গালীত্ব, আমি বাঙ্গালী এই বোধ।”

কিন্তু সামাজিক বিধিনিষেধের প্রতি এই অক্ষয়চন্দ্রেরই ছিল অগাধ ভক্তি। বাবা গঙ্গাচরণের মুখে শৈশবে তিনি ঠাকুমার সহমরণে যাওয়ার গল্প শুনেছিলেন। সেকথা আত্মজীবনীতে লিখেছেন অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে। ইতিহাসবিদ অমিয়প্রসাদ সেন তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন- “dogmatic defender of traditional social order.” রাষ্ট্রনৈতিক সাংবাদিকতায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা মাথায় রেখেও বলা যায়, তাঁর এই ইংরেজ-বিরোধিতা কিছুটা হলেও এই সামাজিক সংস্কার রক্ষার পরিপূরক।

তথ্যঋণ-
Amiya P. Sen. Hindu Revivalism in Bengal, c. 1872-1905: Some Essays in Interpretation, Oxford University Press, 1993.
জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। সমালোচনার রূপরেখা: বঙ্কিমপর্ব, পুস্তক বিপণি, ১৯৮৬।

Developed by DXDasia