
কাঁটাওয়ালা খেজুর গাছে খালি পায়ে উঠে পড়েন সন্ন্যাসীরা
বাংলা বছরের শেষ দিন। চৈত্র সংক্রান্তি। বাঙালির এই দিনটা কেটে যায় নানা উৎসব-অনুষ্ঠানে, পুজো-পার্বণে। বিশেষ করে গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতিতে বছরের এই শেষ দিনটার আলাদা ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। শহরে তখন চলে বর্ষবরণের প্রস্তুতি। পরের দিন সকালে কেউ প্রভাত ফেরির আয়োজন করবে, কারো বা সন্ধেবেলায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এদিকে গ্রামের মানুষ তখন মেতে আছে গাজন, চড়ক, শরবত উৎসব, খেজুর ভাঙা, শাকান্ন, শাক কুড়োনো, নীল উৎসব, নীল পুজো, গম্ভীরা পুজোর মতো নানা পরবে। এগুলোর মধ্যে চড়ক আর গাজনের জনপ্রিয়তা সব থেকে বেশি। বাকি উৎসবগুলো বেশিরভাগই একটা বা কয়েকটা জেলাতেই সীমাবদ্ধ। আধুনিক শহুরে সংস্কৃতি ঢুকে অনেক জায়গাতেই এই প্রাচীন উৎসবগুলোকে বিলুপ্তির পথে নিয়ে গেছে। খুব অল্প জায়গাতেই টিমটিম করে কিছু মানুষ টিকিয়ে রেখেছে তাদের ঐতিহ্য।
আরও পড়ুন
শিবের গাজন হয় এই পিরের দরগায়
খেজুর ভাঙা উৎসব যেমন যশোর আর খুলনা অঞ্চলেই এখনো মোটামুটি টিকে রয়েছে। চৈত্র সংক্রান্তির অন্যান্য সব উৎসবের মতোই এই খেজুর ভাঙার প্রথাও মহাদেব শিবের সঙ্গে যুক্ত। এই কয়েকটা জেলায় আসলে চড়ক আর খেজুর ভাঙা একই উৎসবের দু’টো অংশ। গ্রাম বাংলার লোককথায় প্রচলিত আছে, পরম শিবভক্ত বাণরাজা যুদ্ধ করতে গেছিলেন দ্বারকার অধিপতি কৃষ্ণের বিরুদ্ধে। যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার পর তিনি অমরত্ব পাওয়ার আশায় চৈত্র মাসের শেষ দিনে তাঁর অনুচরদের নিয়ে নাচে গানে আত্মহারা হয়ে নিজের শরীরের রক্ত বের করে সমর্পণ করেন মহাদেব শিবের উদ্দেশ্যে। সেই ঘটনার স্মৃতিতেই প্রত্যেক বছর এই দিনে চড়ক উৎসব পালন করেন শিবের উপাসকেরা। চরক পুজো পর্যন্ত তাঁরা সন্ন্যাস ব্রত পালন করেন এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিবের নাম মাহাত্ম্য শুনিয়ে ভিক্ষে করে সেই খাবারেই পেট ভরান। ওই সময়ে নিরামিশ খাবারই তাঁরা খেয়ে থাকেন। চরক পুজোর সারাদিন উপোস করার পর যশোর, খুলনার মতো জেলাতে খেজুর ভাঙা উৎসবের খেজুর খেয়ে উপবাস ভাঙেন এই ভক্তরা।

চৈত্র সংক্রান্তির সকালে এইসব জেলার গ্রামে গ্রামে দেখা যায়, শিবভক্ত মেয়েরা একটা নির্দিষ্ট খেজুর গাছের তলায় দুধ আর ডাবের জল ঢেলে পুজো করেন। তারপর সন্ন্যাসী দলের নেতা একটা নতুন গামছা শরীরে জড়িয়ে খেজুর গাছটাকে প্রণাম করে সেই গাছে উঠে পড়েন খালি পায়ে। তারপর আরও কয়েকজন সন্ন্যাসী সেই খেজুর গাছে উঠে যান। কাঁটাওয়ালা খেজুর গাছের উপর শুরু হয় নৃত্য, যাকে ‘খেজুর নৃত্য’ বলা হয়ে থাকে। সন্ন্যাসীরা বিশ্বাস করেন, খেজুর গাছের কাঁটাতে তাঁদের পা অক্ষত রাখেন স্বয়ং ভগবান। গাছের খেজুর এরপর নিচের ভক্তদের বিলোতে থাকেন তাঁরা। এদিকে গাছের নিচে ততক্ষণে কয়েকশো মানুষ ভিড় জমিয়েছেন। গাছ থেকে ছুঁড়ে দেওয়া খেজুর ‘ভোগ’ খেয়েই তাঁদের উপোস ভাঙবে। আরও কিছু আনুষ্ঠানিকতার পর খেজুর ভাঙা উৎসব শেষ হয়। কোনো কোনো জায়গায় উৎসবের পর মেলাও বসে।
তথ্যসূত্র – কালের কণ্ঠ, jagonews24.com
