পাশ না ফেল – তাতে কী এসে গেল

ছেলেমেয়েরা সুনাগরিক হচ্ছে না, দেশের সংস্কৃতি ভুলছে, চাকরিও পাচ্ছে না, ক্লাসে উঠে যাচ্ছে ওয়ান-টু-থ্রি

হারুদা পাশ করেছে এক চান্সে! গ্রামে গ্রামে রটি গেল এই বার্তা ক্রমে… । খবর বটে। তখন সাক্ষরতার হার ২৭% এর সামান্য এদিক-ওদিক। তখন সামাজিক অর্থনৈতিক কারণে পিছিয়ে পড়া মানুষ আরও পিছিয়ে শিক্ষায়।  বাড়িতে শুনছি – হারুও পারল, পারবি না? সে বছর আমি প্রাথমিকে, আমার ক্লাস ফোর। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল প্রায় ৬০-৬৫ জন, ক্লাস ফোরে তখন জনা দশেক। হারুদার অত্যাশ্চর্য সাফল্যের পর সংখ্যাটা দাঁড়াল দুয়ে – আমাদের বাড়িরই দুজন। আমরা তো হাল ছাড়তে  পারি না, আমরা যে ‘ভদ্র’ বাড়ির ছেলে! অন্যরা ফেল করার ঝুঁকি নিতে না চেয়ে পালাল।

আমার এক দাদা স্কুল ফাইন্যাল পার হতে দু’বার ঘায়েল হয়েছে, তারপর অবশ্য আর তাকে রোখা যায়নি – তার পর তো আর তাকে সংস্কৃত বা বিজ্ঞান বা অঙ্ক শেখার ভয়ে কাঁপতে হতো না। আমার ছাত্র হিসেবে সুনাম ছিল অনেক বেশি, তার প্রধান কারণ আমি কখনও ‘ফেল’ করিনি। তবে ক্লাসে একবার ‘প্রথম’ হওয়ার বিড়ম্বনাও সয়েছি, সেবার যে ঐ ক্লাসে সব বিষয়ে অন্য কেউ ‘পাশ’ করেনি! এখনও স্বপ্নে ফেরে ‘পাশ-ফেল’ – স্বপ্ন নয়, দুঃস্বপ্ন।

সেই ‘পাশ-ফেল’ আর নেই, স্কুল-ছুটের সংখ্যা অনেক কমেছে। রাষ্ট্রের প্রগতির ভিত এখন অনেক শক্ত।

মুক্ত বাজার অর্থনীতির পিঠে চাপলে আমরা তরতরিয়ে এগোব – আমাদের বলা হল। কিন্তু কোথায় কী – একুশ শতকে পা দিয়ে বোঝা গেল, কোরিয়া, জাপান বা চীনের মতো সাড়া জাগানো অগ্রগতি আমাদের হয়নি। বিচার-বিশ্লেষণ শেষে জানা গেল দেশটা শিক্ষায় পিছিয়ে আছে অনেক – তাই। ‘জুতো আবিষ্কার’-এর মতো এক সরল সত্য আবিষ্কৃত হল। অথচ, সে সোজা-সরল কথাটা কত আগেই না আমাদের দেশনায়করা জেনেছেন, বুঝেছেন, বলেছেন – সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি মিলেছে, কমিটি- কমিশনের সুপারিশে এসেছে, সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে। তবু, ঘুম ভাঙতে হল বেলা – হয়তো বাজারের গুঁতোয়। পাওয়া গেল শিক্ষা অধিকার আইন, ২০০৯। সেই থেকে শিক্ষা মৌলিক অধিকার – ৬-১৪ বছরের সব শিশুর বিনা খরচে প্রথাগত শিক্ষার আয়োজনের দায় রাষ্ট্রের। যেমনতেমন নয় – দিতে হবে সুশিক্ষা বা ভালো মানের শিক্ষা। এখন সাক্ষরতার হার ৮০% ছুঁইছুঁই। এই তথ্য দেখিয়ে শাসক আর আমলারা উদ্বাহু হয়ে নাচতে পারত, যদি না …

দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ – প্রচুর খরচ করেও লাভ হচ্ছে না, ছেলেমেয়েরা সুনাগরিক হচ্ছে না, দেশের সংস্কৃতি ভুলছে, আবার চাকরিও পাচ্ছে না – কী শিখছে?

বাজারেরও প্রশ্ন তাই – কী শিখছে?  তারা  সুনাগরিক না পাওয়া নিয়ে চিন্তিত নয়, তাদের চাই সু-বেচুবাবু।  তাদের খুশি করতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গড়ায় উৎসাহ বাড়ল, শিক্ষা ক্ষেত্রে বিদেশি-বেসরকারি পুঁজির জন্য দরজা হাট করে খুলে দেওয়া হল। তাতে কিছু শিক্ষ-ব্যাপারী লোকের লাভ হল বটে, বাজার খুশি হতে পারল না ।  তাদের চাই মার্কেটেবল গ্রাজুয়েট। মেলে না। কেন?

শাসক ও আমলা বাজারের সাথে গলা মিলিয়ে বলছে গোড়ায় গলদ। বুনিয়াদি শিক্ষার মান ভালো নয়। অভিযোগটা অস্বীকার করার মতো নয়, কিন্তু অপরাধ কার? একটা অপরাধী চাই। অনেক তথ্য-তত্ত্ব-প্রমাণ হাজির – অপরাধী শিক্ষা অধিকার আইন,২০০৯। সবটা না হোক অন্তত কিছুটা – যথা, ‘পাশ-ফেল’ প্রথা তুলে দেওয়ার( ধারা ১৬) প্রভাব! কিছু শিখছে না, ইংরেজি জানেও না বলতেও পারে না, পড়তে পারে না, অঙ্ক পারে না…  টকাটক ওপরের ক্লাসে উঠে যাচ্ছে ওয়ান-টু-থ্রি …। আইনের দোষ বললে দায় চাপে আইন প্রণেতাদের ঘাড়ে, তা চলবে না। তাহলে?

আইনে ‘পাশ-ফেল’ সরিয়ে নিয়মিত ধারাবাহিক ও সামগ্রিক মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে (ধারা ২৯, যার উৎস জাতীয় পাঠক্রম রূপরেখা,  ২০০৫, NCF,2005)। তাতে স্কুল-ছুট কমেছে, NER  বেড়েছে, সাক্ষরতার হার বেড়েছে। কিন্তু মান পড়েছে যে! দায়ী কে? সহজ উত্তর – শিক্ষকরা। তারা পড়ায় না, আসে না, নিয়মিত ধারাবাহিক মূল্যায়নে মন দেয় না … । শিক্ষার্থীরা মন দিয়ে পড়ে না – পাশ-ফেল নেই যে! শিক্ষকরা তাদের প্রাণিত করতে পারে না। সমস্যা সেখানেই।

সত্যি কী তাই?

শিক্ষা বহির্ভূত কাজ করতে হবে শিক্ষককে। কেবল শিক্ষা নয় – শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির দিকে নজর রাখার দায় শিক্ষকেরই, শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির কারণ খোঁজার দায় তার। ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত নিয়মের অনেক অনেক বাইরে, – সব ভার বইবে শিক্ষক …  শিক্ষার মান পড়ে যাওয়ার দায় কোনও শিক্ষক এড়াতে পারে না, কিন্তু দায় কী কেবল শিক্ষকের!

পরিকাঠামোয় বিপুল ঘাটতি, অভিভাবককুল তথা সমাজের উচ্চাশার চরিত্র বদল – যেমন করে হোক একটা কাগজ জোটালে বাজারে একটা ‘হোয়াইট কলার’ কাজ জুটবে। হোক না চুক্তির কাজ, কল সেন্টার, শপিং মল … । মাস্টার, প্রাইভেট পড়াবেনি? আইনের বাধা? কে মানে আইন, কে মানায়? কেন? রাজা-মন্ত্রীর ছানাপুনাদের প্রাইভেট মাস্টার থাকতে পারে, আমাদের থাকলে দোষ?

একই মাস্টার পড়ায় ইতিহাস, ভূগোল, অঙ্ক, বিজ্ঞান। গুলি-লাট্টু-লাটাই হারানো ছাত্র নেতিয়ে পড়ে।

নিয়মিত ধারাবাহিক ও সামগ্রিক মূল্যায়নের সময় বা সুযোগ কেড়ে নেয় ব্যবস্থা। অব্যবস্থার আয়োজন নিয়মিত ধারাবাহিক। দায় ব্যবস্থাপক আমলাকুলের, কিন্তু তারা মানে না, তাদের মানানো যায় না। তাদের দিকে আঙুল তুললেও বিপদ, তারা আঙুল কেটে নেবে, ভাত কেড়ে নেবে। তারা বলেছে মাস্টাররা দায়ি, অতএব, মাস্টাররা দায়ি – এনিয়ে রাষ্ট্রতো নয়ই – সমাজও কথা বলতে পারবে না।

শিক্ষা অধিকার আইন, ২০০৯ –এর একটি ধারা নিয়েই আলোচনা, তবু মনে রাখতে হবে যে কোনও ধারাই বিচ্ছিন্ন নয়, একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে।

শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে পরিবর্তন বা সংস্কার আসে ধীর পায়ে। অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা, আলাপ-আলোচনার স্তর বা দেওয়াল ডিঙ্গিয়ে আসে পরিবর্তন। হিতকারী সমাজের চাহিদা, সময়ের চাহিদা, স্থানিক চাহিদা – মাথায় রাখতে হয় সবই।

আলাপ-আলোচনা চলছে, আরও হবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত সামনে রেখে! এই রাজ্য সরকার তথা তার শিক্ষামন্ত্রী বলছেন, আমরা ‘পাশ-ফেল’ ফেরাতে চাই। প্রশ্ন করতে পারি কী – মহাশয়, আপনারা কারা? কেন ফেরাতে চান? নিয়মিত ধারাবাহিক ও সামগ্রিক মূল্যায়ন ব্যর্থ হয়েছে বলে? কেন ব্যর্থ হল খোঁজ করেছেন? নাকি বাজারের কথায় উঠবস!

বলা যেতেই পারে, নিয়মিত ধারাবাহিক ও সামগ্রিক মূল্যায়ন ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু কেন? শিক্ষকদের যথোপযুক্ত ট্রেনিং হয়েছে? তাদের যে লড়াই-এর ময়দানে ঢাল-তরোয়ালহীন নিধিরাম করে নামানো হয়েছে সে কথাটা চেপে গেলে হবে? সমস্যা আরও আছে।

আইনে বলা হয়েছে রাষ্ট্র সকল শিশুর জন্য ভালোমানের অবৈতনিক শিক্ষার আয়োজন করবে। সাত মণ তেলও পোড়েনি, রাধাও নাচেনি – ভালোমানের শিক্ষার আয়োজন কোথায়, কোথায় আয়োজন অবৈতনিক? এই রাজ্যেই বিদ্যালয়গুলো টাকা যাতে নিতে পারে (সর্বাধিক ২৪০ টাকা, অনেক ক্ষেত্রে সে বেড়াও ডিঙ্গিয়ে যাওয়ার নজির আছে) তার জন্য সরকারি নির্দেশনামা আছে। আইন ও বিধিতে আছে যে, প্রাইভেট স্কুলগুলোতেও নির্দিষ্ট সংখ্যক শিশু নিখরচায় পড়তে পারবে – এই রাজ্যে তা হয় না। আইনে আছে বিদ্যালয় পরিচালন সমিতি গড়া বাধ্যতামূলক – আইন মানাটা বাধ্যতামূলক হলে তবে না? – কে মানে, কে মানায়?

সমস্যা আরও আছে। পাশাপাশি একথাও তো ভুললে চলবে না এই আইনটির বয়স মাত্র ছয় (চালু হয় ২০১০ সালের ১লা এপ্রিল)। শিক্ষা এমন এক ক্ষেত্র যেখানে নিয়মিত পরীক্ষানিরিক্ষা হয়, কিন্তু সংস্কার হয় অতি ধীরে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ও সব মানুষের মতামত বিচার-বিশ্লেষণ করে।

কেউ যেন বলেছে – চিলে কান নিয়ে গেছে। আমরা চিলের পেছনে দৌড়োচ্ছি!  

Developed by DXDasia