
কম্যুনিস্ট পার্টি আর করি না। মা কী ছিলেন, আর কী হইয়াছেন
ক্লাস ফাইভ-সিক্স পর্যন্ত আমি ঘোর আস্তিক ছিলাম। সেটা মায়ের দেখাদেখি। রাস্তায় যত মন্দির পড়ত নমস্কার করতাম। ষাটের দশকের শেষ দিকে বা সত্তর দশকের প্রথম দিকের কথা। আরেকটু বড় হয়ে লক্ষ্য করলাম বাবা ওসবের ধার ধরেন না। বরং নমস্কার করতে গিয়ে বাস মিস করায় একবার খুব চটেছিলেন উনি। বাবার কাছ থেকেই মার্কসবাদ পেয়েছিলাম, পরে তা বহু বিখ্যাত মার্কসবাদীদের সান্নিধ্যে চকচকে হয়েছিল। ক্লাস নাইন নাগাদ আমি ঘোর নাস্তিক হয়ে পড়ি।
সেটা সত্তর দশক। বিপ্লব-আফিমের জ্বরে কিশোর-যুবকরা থরথর করে কাঁপছে। ১৯৬৪-তে তৈরি হওয়া সিপিএম তখন আবার ভেঙেছে, গড়ে উঠেছে নকশালপন্থা। সে এক প্রবল মারামারির যুগ। তারই মধ্যে দুগ্গাপুজো আসত। লেনিন সাহেবের একটা কথা ছিল, যেখানেই মানুষ আছে সেখানেই যাও। তখন কী সিপিএম, কী নকশাল, সবার মুখে মুখে ঘুরত, জলের মধ্যে যেমন মাছ থাকে, তেমনই মানুষের মাঝে থাকতে হবে কম্যুনিস্টদের। তা দুগ্গাপুজোয় কী করা যায়? প্রশ্নটা তো সহজ, উত্তরটাও জানা। বুক স্টল। আমরা বলতাম শারদীয়া বুক স্টল। কোনও কোনও ঘোর বাঙাল বলতেন, বুকেস্টল। দু-তিনটে তক্তায় সারি সারি লেনিন, স্ট্যালিন, দু-একটা কাকাবাবুর (এ দেশে কম্যুনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুজফ্ফর আহমেদ ওই নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন) বই, এসব সাজান হতো। আমাদের যাদের বয়স কম ছিল, তাদের অনেক সময় বলা হতো ছোকরা ফাইল। বড় কম্যুনিস্টদের আন্ডারে ছোকরা ফাইল বুক স্টলে সকাল সন্ধে ডিউটি দিত। কে বই নিল, কে এসে দাঁড়াল, কে ফিরেও তাকাল না, সব লক্ষ্য করা হতো। হাল্কা কম্যুনিস্টরা দু-একদিন ছুটি নিতেন। কিন্তু কড়া কম্যুনিস্টরা সবাই ছুটির দিনগুলো ঘোরতর পুস্তক বিক্রেতা। সেই সময়ে পুজো চারদিনই চলত, এখানকার মতো দশদিন নয়। দশমীর দিন পাত্তারি গোটানো হতো। কোথা দিয়ে যে চারটে দিন কেটে যেত তা বোঝাই যেত না।
তারই মধ্যে ফুরফুরে বাতাসও বইত। কাগজে ‘তোমাকে ভালবাসি’ লিখে সেটা গোল্লা পাকিয়ে পাড়ার ইয়ং দুগ্গাদের দিকে ছুড়ে দেওয়ার মধ্যে যে শিভালরি ছিল, সেটা ভাবলে আজও শিহরণ জাগে। তার পর কোনও কোনও কেস ম্যাচিত্তর করত। সে এক দারুণ ব্যাপার। কম্যুনিস্ট অবশ্য বিয়ে-টিয়ের ব্যাপারে পার্টির সম্মতি লাগত। আর আজ যাকে আমরা কোর্টশিপ বলি, তা ছিল সপ্তাহে দু-একদিন কিছুক্ষণ পাশাপাশি হাঁটা। প্রথমে এসেছিল টাইট চুজ প্যান্ট, পরে চকরা-বকরা বেল বটম। কম্যুনিস্টদের এসব পরা চলত না। রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রকাশ পাজামা-পাঞ্জাবিতে। কিন্তু নতুন প্রেমে পড়া কমরেডকে ফ্যসন-দুরস্ত প্যান্ট শার্ট পরে প্রেমিকাকে নিয়ে লুকিয়ে রেস্তোরাঁতে মোগলাই পরোটা খেতে দেখেছি। ছোঁয়াছুঁই-র সুযোগ খুব কমই পাওয়া যেত, বাসে পাশাপাশি সিট পেলে যেটুকু আলতো ছোঁয়া লাগত, তাতেই যেন হাজার সানাই বেজে উঠত।
কম্যুনিস্ট পার্টি আর করি না। মা কী ছিলেন, আর কী হইয়াছেন! দেখে কখনও কখনও অবাক লাগে, দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির এই বাড়বাড়ন্তের সময়েও বিজেপি বিরোধী বড় মঞ্চ করতে কী প্রবল ছুঁতমার্গ। সাধারণ স্বাভাবিক বুদ্ধি হারিয়ে পড়ে আছেন প্রাচীন বাচস্পতি অতীত গৌরবের চর্বিতচর্বণে। এক বিরাট শুকনো প্রান্তরে ভারতীয় বামপন্থা আত্মবিস্মৃতি। যাকগে রাজনীতির কথা। এখন তো প্রতিদিন প্রৌঢ়ের উজানযাত্রা। তবু দুগ্গাপুজো এলে বুকস্টলের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। কেউ চেনে, কেউ বা না চিনে ডিসিপ্লিনড্ কণ্ঠে বলে, এই বইটা নিয়ে যান দাদা, জ্যোতি বসুর লেখা।
চোখটা ছলছল করে ওঠে। কখনও এক ফোঁটা অশ্রু কব্জিতে মুছে ফেলি। অতীত বিপ্লব-স্বপ্নের কবরস্থানে ঝুঁকে ঝুঁকে ক্লান্ত পথ চলি। চারদিকে আলোর ঝলকানি, লাউড স্পিকারের মাতন, সব বয়সের মানুষ দুঃখ ভুলে উৎসবের ফুচকা মুখে তুলছে। নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে পথ হাঁটি, লোকে বলে পাগল!
