
আদি সুরটি রক্ষিত হয়নি বলেই হয়তো সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন সুর তৈরি হওয়ার সুযোগ
‘বন্দে মাতরম্’-এর মতো গানে যদুভট্টের ন্যায় অতি-বিখ্যাত সংগীত-নায়কের দেওয়া আদি সুর, যার সৃষ্টি হয়েছিল মাত্র একশ বছরের সামান্য আগে এবং যা বঙ্কিমের সামনেই গীত হয়েছিল, সেটি সম্পূর্ণ অবলুপ্ত ভাবলে আত্মগ্লানিই জাগে বাঙালি সত্যিই আত্মবিস্মৃত জাতি। গানটি লিখিত (ও সম্ভবত সুরারোপিত) হওয়ার পর বেশ কয়েক বছর ধরে বঙ্কিমচন্দ্রের টেবিলে বা ডেস্কে বন্দি হয়ে ছিল, অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি তা ‘বঙ্গদর্শন’-এ বা অন্য কোথাও প্রকাশ করতে চাননি। বঙ্গদর্শন-এ ‘আনন্দমঠ’-এর অংশ হিসেবেই এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ‘আনন্দমঠ’-এর ধারাবাহিক প্রকাশের কাল চৈত্র ১২৮৭ থেকে জ্যৈষ্ঠ ১২৮৯ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দ, এবং শেষ হতে না হতেই প্রথম পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় ঐ ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দেই। ‘আনন্দমঠ’-এ পাদটীকা হিসেবে উল্লেখ আছে গানটির রাগ ‘মল্লার – কাওয়ালি তাল’; সঙ্গে তালের মাত্রা বিন্যাসও দেওয়া আছে। যদুভট্টের দেওয়া সুরও কি ঐ বঙ্কিম-নির্দেশিত রাগে-তালে নিবদ্ধ ছিল, না কি যদুভট্টের রাগ-তাল-নির্দেশই বঙ্কিমচন্দ্র এখানে গ্রহণ করেছেন? – নির্দিষ্টভাবে কিছুই বলা যায় না। যদুভট্ট ছিলেন মূলত ধ্রুপদ গায়ক। কাওয়ালি তাল কিন্তু ধ্রুপদী তাল নয়।
তবে এই বিস্মরণের একটা অন্য দিকও আছে। আদি সুরটি রক্ষিত হয়নি বলেই হয়তো বিভিন্ন সুর তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। লক্ষ্য করতে হবে যে ব্যাপারটা ঠিক ‘জনগণমন’-র মতো নয়। ‘জনগণমন’-র ক্ষেত্রে কথাকার ও সুরকার একই ব্যক্তি, এবং সেই সুর সংরক্ষণের পাকাপোক্ত ব্যবস্থাও ছিল স্বরলিপিও ছিল(‘স্বরবিতান’ ৪৭), আবার শেখানোর বন্দোবস্তও ছিল। ‘বন্দে মাতরম্’-এর ক্ষেত্রে কিন্তু কথাকার ও সুরকার আলাদা, গোড়ার দিকে সুর-সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। অর্থাৎ ছাপা অক্ষরে কথাগুলি লোকের কাছে অনেক আগেই পৌঁছে গেছে, বেশ কিছুটা জনপ্রিয়তাও পেয়েছে, কিন্তু নির্দিষ্ট সুর পৌঁছেছে অনেক পরে হয়তো অনেক কম লোকের কাছে। ফলে, বাংলা এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিভিন্ন মহলে, নানা সুরের সৃষ্টি হয়েছে এবং বিভিন্ন শিল্পী বিভিন্ন সুর বসিয়েছেন নিজ নিজ শিক্ষা, সামর্থ্য, প্রেরণা বা প্রয়োজন অনুসারে।
রবীন্দ্রনাথ নিজেও ‘বন্দে মাতরম্’ গানের প্রথম সাতটি পংক্তিতে (‘সুখদাং বরদাং মাতরম্’ পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রথম দুটি স্তবকে) সুর দিয়ছিলেন, গেয়েও ছিলেন। (পরবর্তীকালে অবশ্য ‘বন্দে মাতরম্’ সম্পর্কে তাঁর মনোভাবের কিছুটা পরিবর্তন হয়, যার পরিচয় ধরা আছে তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে এবং দুটি উপন্যাসে ‘ঘরে বাইরে’ ও ‘চার অধ্যায়’-এ।
(সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘নির্বাচিত ধ্রুবপদ’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে অনন্তকুমার চক্রবর্তী লিখিত ‘বন্দে মাতরম্-এর সুর উৎস ও বৈচিত্র্য’ প্রবন্ধের নির্বাচিত অংশ)
