
এ সময় বোধয় ওঁর গানের মজ্জা কে ধরার সময় এসেছে
ইতিহাসের নোট লেখার মত করে ‘তোমাকে চাই’ সেই প্রথম বলা, আর সেই-ই শেষ।একটা হিন্দি গান ছিল, যার বাংলা নির্যাস হল, প্রথমবার ভালবাসছি, শেষবারের মত ভালবাসছি, সেইরকম আর কী। ‘তোমাকে চাই’ টাই কেউ বলেনি, ভালোবাসি, প্রেমে পড়েছি- এইসব কথা বাংলা গানে এসেছে, তোমাকে চাই, এই ফ্রেজটা আসেনি। কবীর সুমনের তোমাকে চাই, ইলা বসুর গলার মত স্মার্ট, কিংবা তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলার মত । ওঁর প্রথম অ্যালবাম যখন বেরোয় তখন আমার তিন বছর বয়েস, ভেতরে ভেতরে হেমন্ত মান্নার গান নিজের অজান্তেই ঢুকছে, কিন্তু সুমন তখনো আসেননি এটা আমার নিশ্চিত বিশ্বাস। এমনকি সুমনের ‘তোমাকে চাই’ গানটাও যে প্রথম শোনা গান তাও নয়, সুমনের প্রথম গান শুনি, ‘কখনো সময় আসে/জীবন মুচকি হাসে’—তাও পিসতুতো দাদার কল্যাণে, সদ্য কলেজে উঠেছে সে। এটা আকছার বলা হয়ে থাকে, সুমনের গান ,ফুল পাখি, চাঁদ তারা থেকে বাইরে নিয়ে এলো আমাদের । ফুল,পাখি,চাঁদ তারা-র বাইরেও আমাদের আরো অনেক কিছু আছে, সেটা দেখালো, কিন্তু সেটা কী?‘ বেশ্যা- দালাল- টিকিধারী পুরোহিত- ট্যাক্সিচালক, পুলিশের খিটমিট’ এটাও আমাদের belonging।
আবার এই ভদ্রলোক যখন লেখেন, ‘সারারাত জ্বলেছে নিবিড় ধূসর নীলাভ এক তারা’ -এ এক অনন্য অভিজ্ঞতা শ্রোতার জন্য, সেটা সুরের ক্ষেত্রে হোক বা কথার। নিবিড় শব্দটার একটা অসামান্য প্রয়োগ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, ‘নিবিড় অমা তিমির হতে /বাহির হল জোয়ার স্রোতে / শুক্ল রাতে চাঁদের তরণী’- দুটো নিবিড়ের মধ্যে মিল বা তুলনা আনছি না, দুটো নিবিড়ের ব্যবহার আমাকে অবাক করে । কবীর সুমন আক্ষেপ করেন, বাংলা গানে সঞ্চারী আর হচ্ছে না !ওঁর এই গানে সঞ্চারীটা, “বড় বেরঙ্গিন আজকাল কাছাকাছি কোন রং পাই না”-এরকম সঞ্চারী ওঁর গানে সেটা ও ভাবী কালের কাজ খুঁজে বের করা।
সবই প্রেমের গান, কিন্তু একটা গান কীভাবে আলাদা হয়ে যায় শেষ দিকে, “আমি যাকে ভালোবাসি সে কাঁদে দুনিয়ার জন্য/ সে বড় একলা, অনন্য” সেই একাকীত্ব কেমন, সেই অনন্যতা কেমন, “ বেশী বয়েসের প্রেমের মত ।” এটা সুমন পারতেন লিখতে, সুমনই পারতেন । ‘তোমাকে চাই’ অ্যালবামের ২৫ বছর উদযাপিত হতে চলেছে, এ সময় বোধয় ওঁর গানের মজ্জা কে ধরার সময় এসেছে। গানের ভাষা- বলতে পারতাম, কিন্তু তাতে এসেন্স টা পাওয়া যেত না। একজন মানুষ পাগল কে বর্ণনা করছেন, “ জটপড়া চুলে তার/ উকুনের পরিপাটি সংসার।” কীভাবে সেন্সিবিলিটি আর বুদ্ধিদীপ্ততা এক হয়ে একটা ফ্রেজ তৈরি করছে, “পিচুটি চোখের কোণে/ দৃষ্টি বিস্মরণে মগ্ন।” ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জানি, হাজরার চিত্তরঞ্জন ক্যানসার হসপিটালে এক পাগল থাকে, আপন মনে কথা বলে যায়, বোধয় অনেক বড় বাড়ির ছেলে, ৪৫ এর মধ্যে বয়েস, সবার থেকে চা চেয়ে খায়, আর সিগারেট/ বিড়ি।
আমরা গ্লোরি শব্দটা খুব বেশী ব্যবহার করে থাকি, কবীর সুমনের সংগীত, প্রকৃত অর্থেই গ্লোরিয়াস। “ আমার স্বপ্নে বিভোর হয়ে জন্মেছ বহুবার/ আমিই ছিলাম তোমার কামনা, বিদ্রোহ চিৎকার” এই আত্মবিশ্বাস না থাকলে গ্লোরি তৈরি হয় না।
সুমনের সুর নিয়ে প্রাজ্ঞজনেরা কথা বলবেন, কিন্তু ওঁর গীতিকবিতার ভাষার এ আপ্রোচ সেটা বিরল, “ জানিনা কোন গুণীর তান পুড়ে হল তানপুরা”-তান নিয়ে খুব সঙ্গত pun রয়েছে, কিন্তু সেটা আর চোখে পড়ছে না। সুমন এই জন্যে জরুরী, ‘গান তুমি হও আমার মেয়ের ঘুমিয়ে পড়া মুখ।’ এই চিত্রকল্প আর কোনোদিন আসবে কি না জানি না।
