
নীতীশকে না–চটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধী
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কোনও ইচ্ছা তাঁর নেই, কারণ তাঁর দলটা ছোট, বলেছেন নীতীশ কুমার। তাঁর কথায়, না তাঁর সেই যোগ্যতা আছে, না ইচ্ছে। ঠিকই বলেছেন। এই মুহূর্তে এনডিএ শিবিরে নরেন্দ্র মোদির কোনও বিকল্প নেই। আর পারিবারিক কংগ্রেসেও কোনও জায়গা ফাঁকা নেই। তবে তাঁর জন্য, নীতীশ জানেন, দুই শিবিরেই জায়গা আছে। চাইলে ভবিষ্যতে তিনি উপ–প্রধানমন্ত্রী হতেই পারেন।
নীতীশ ধুরন্ধর রাজনীতীক। সদর্থে। তিনি দেখতে পাচ্ছেন কংগ্রেসের কোনও ভবিষ্যৎ আপাতত নেই। সঙ্কুচিত হতে হতে বিশাল নদী হয়ে গিয়েছে নালা। তিনি রাহুল গান্ধীর ‘হিট অ্যান্ড রান’ রাজনীতির সঙ্গেও বিন্দুমাত্র সহমত নন। দিনের নির্দিষ্ট একটা সময় রাজনীতি করব, বাকি সময়টা অন্য কিছু, এবং মাঝেমধ্যে ছুটিতে চলে যাব, এমন ঘরানার লোক নয় নীতীশ। সেদিক থেকে তিনি নরেন্দ্র মোদি ঘরানার। সারাদিনই কাজের মধ্যে থাকেন। এবং অত্যন্ত ভাবমূর্তি সচেতন। তাঁর সরকারের উপর ক্রমাগত সপরিবারে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া লালুপ্রসাদের খবরদারি বরদাস্ত করা তাঁর পক্ষে কঠিন। লালুপ্রসাদের পারিবারিক রাজনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেই একসময় লালুর দল ছেড়েছিলেন তিনি। চলে গেছিলেন বিজেপির সঙ্গে। নরেন্দ্র মোদিকে বিজেপি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তুলে ধরায় বিজেপির সঙ্গও ছেড়েছিলেন। তারপর লোকসভায় পর্যুদস্ত নীতীশ–লালুপ্রসাদ কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়ে বিহারে বিধানসভা ভোটের আগে মহাজোট গড়েন। সফলও হন। কিন্তু কংগ্রেসের তাঁবেদারিও রামমনোহর লোহিয়ার অনুগামী এই নেতার অসহ্য। এখন তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস শুধু নরেন্দ্র মোদির কাজের উপর প্রতিক্রিয়াভিত্তিক রাজনীতি করছে এবং ডুবছে। বিরোধীরা কোনও গঠনমূলক পাল্টা কর্মসূচি গড়ে তুলতে পারছে না। সংশয় নেই, তাঁর খোঁচাটা কংগ্রেসের যুবরাজের দিকেই।
প্রতিক্রিয়াভিত্তিক রাজনীতি বলতে নীতীশ বোঝাতে চাইছেন মোদির যাবতীয় কাজের বিরোধিতা। বাকি বিরোধীদের থেকে আলাদা হয়ে গিয়ে তিনি দুর্নীতি রুখতে নোটবাতিল পুরোপুরি সমর্থন করেছিলেন। এখন আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরেধীরা মীরা কুমারকে তাঁদের প্রার্থী ঘোষণার আগেই তিনি এনডিএ প্রার্থী রামনাথ কোবিন্দকে সমর্থন করে দেন। তা নিয়েই জেডি (ইউ) কর্তার সঙ্গে আরজেডি আর কংগ্রেসের দূরত্ব তৈরি হয়ে। লালুপ্রসাদ অবশ্য পরে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টায় নামেন। কিন্তু কংগ্রেসের তরফে গুলান নবি আজাদ নীতীশকে আক্রমণ করে নীতীহীনতার অভিযোগ এনে বসেন। তারপর গত রবিবার দলের বৈঠকে কংগ্রেস কীভাবে ব্যর্থ হচ্ছে, কীভাবে রাহুল গান্ধীর জন্য অসম হারিয়েছে কংগ্রেস, উত্তরপ্রদেশে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছে, তার বর্ণনা দিয়ে নীতীশ বলেছিলেন, তাঁরা কারওকে অনুসরণ করে চলবেন না। বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি তাঁর বিশ্বাস অনুযায়ী এগোবেন। আর তার পরের দিনই সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি মোটেই প্রধানমন্ত্রিত্বের স্বপ্ন দেখেন না।
ঘটনা হল, তারপরেই কংগ্রেস নেমেছে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ঝালিয়ে নিতে। কংগ্রেস মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি মঙ্গলবার বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে যাবতীয় প্রশ্নের আর বিশেষ কোনও তাৎপর্য নেই।’ অর্থাৎ, দলীয় নেতাদের উদ্দেশ্যে বার্তা দিতে চেয়েছেন সিংভি। কংগ্রেসের খবর, নীতীশকে না–চটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধী। উল্টোদিকে, তাঁর দিকে সদর্থক বার্তা সারাক্ষণই পাঠিয়ে চলেছেন বিহার বিজেপির শীর্ষ নেতা সুশীল মোদি। অমিত শাহরাও যে তাঁকে সঙ্গে পেলে ধন্য হবেন, সংশয় নেই। এখন ধুরন্ধর নীতীশের সামনে দুই বিকল্পই খোলা। এবং সেটাও এমন একটা সময় যখন নরেন্দ্র মোদির এনডিএ আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন প্রস্তাবিত জাতীয় মহাজোটের সম্পর্ক সাপে নেউলে। অথচ, তাঁর মতো অন্য যাঁরা—শরদ পওয়ার, এইচ ডি দেবেগৌড়া, নবীন পট্টনায়ক বা চন্দ্রশেখর রাও—তাঁদের সামনে রাস্তাটা কিন্তু এত সহজ নয়। তাঁদের সামনে অনেক জটিলতা। পওয়ারের বিজেপি–র দিকে আসার পথে বাধা চিরশত্রু শিবসেনা। কর্ণাটকে দেবেগৌড়ার দলকে কংগ্রেস বা বিজেপি কেউ সঙ্গে নিতে চায় না। ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়ক কংগ্রেসবিরোধী, আবার বিজেপিই এখন রাজ্যে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। চন্দ্রশেখর রাও ভয় পাচ্ছেন কংগ্রেসের দিকে যেতে হলে অনেক মূল্য দিতে হবে।
এইখানেই নীতীশ অনন্য। একটা ছোট দল, যারা বিহারেই আলাদা লড়লে তৃতীয় হবে, সেই দলের নেতা হয়েও কীভাবে তাৎপর্যপূর্ণ থাকতে হয়, সেটা নীতীশ জানেন। তাঁর সবচেয়ে বড় সুবিধা, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁর কোনও কলঙ্ক নেই। আর সেই সুবিধাটাকেই কাজে লাগিয়ে নীতীশ এখন অনন্য। বিজেপি জানে, নীতীশকে সঙ্গে পেলে বিহারের লোকসভা আসনের আশি শতাংশ তাঁদেরই থাকবে। কংগ্রেস জানে, নীতীশ সঙ্গে থাকলে লড়াইটাকে ৫০–৫০ করে দেওয়া যাবে। তাই সবাই তাঁকে চায়। তাই তাঁর সামনে
