
‘উনুন জ্বলেনি আর, বেড়ার ধারেই সেই ডানপিটের তেজি রক্তধারা,/গোধূলি গগনে মেঘে ঢেকেছিল তারা।’
গান্ধীনগরে রাত্রি। এরকমও বাংলা কবিতা হয়! এতো আমার প্রায় পরিচিত পরিবেশ! একেও কবিতা করে তোলা যায়। প্রথম পরিচয়ে এই বইটা নিয়েই মণিভূষণ অনেক কথা বলেছিলেন। নৈহাটি, রেলইয়ার্ড, পুলিশ, কুম্বিং। মুগ্ধতা, চরম মুগ্ধতা! বইটা আবার তিনি উপহার দিলেন। আবার পড়লাম। মুগ্ধতা পেরিয়ে সহমর্মিতা আমাকেও যেন গ্রাসে নিয়ে এল। ওই তেত্রিশটি কবিতাই মনে গেঁথে গেল।
‘উনুন জ্বলেনি আর, বেড়ার ধারেই সেই ডানপিটের তেজি রক্তধারা,/গোধূলি গগনে মেঘে ঢেকেছিল তারা।’
‘চতুর্দিক অন্ধকার করে বৃষ্টি নামলো, বৃষ্টি নামে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে – মাচায় আপসহীন দুর্দান্ত লাউয়ের ডগা নাচে।’
‘হাত পা ডুবেছে, কিন্তু চোখ খোলা, আর আছে মাঝারি বিবেক/একমাত্র সেই শর্তে একদিন তুলকালাম হবে অভিষেক।’
‘ঘটালে তবেই ঘটে, সন্ধি নয়, বৈজ্ঞানিক রক্তপাতে/চোখের জলের দাগ মজে।’
আরও কত কত। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি! আজ যখন আবার গান্ধীনগরে রাত্রিতে ফিরে আসি। টের পাই মুগ্ধতা কিছুটা কমে এসেছে ঠিকই। কিন্তু লেখাগুলি আমাকে এক লহমায় নিয়ে যায় সেই অন্ধকার দিনগুলিতে যখন ‘রক্তে ভাসে স্বদেশ সময়’, ‘মুণ্ডহীন ধড়গুলি আহ্লাদে চিৎকার করে’। আর আমি আরও আলোড়নে আসি, কেননা এই বইটার সঙ্গে এমন সব স্মৃতি জড়িয়ে আছে যা পুনরায় প্রকাশ্যে আসে।
বইটি প্রথম আমাকে পড়ান তপনদা। তপন কর। আমার শিক্ষক। মেধাবী মানুষ। ছাত্রাবস্থায় নকশাল আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। ফলে যা যা হয়। না, প্রাণে মরেননি। আত্মগোপন ও জেল পর্ব কাটিয়ে যখন এলেন, দেখলেন পার্টিতে নানা মত ও পথের মধ্যে তুমুল বিতণ্ডা, ভাঙন। কমরেডদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেও দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। জীবিকা হিসেবে প্রাইভেট টিউশনকেই বেছে নিয়েছিলেন। পুলিশের অত্যাচারে শরীর আগেই ভেঙে গিয়েছিল। ভাঙা শরীর নিয়ে ৫০/৫৫ বছর লড়লেন। দুটো কিডনিই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। অ্যাকাউন্টেন্সি পড়াবার পাশাপাশি আমাকে দর্শনের পাঠও দিয়েছিলেন। তপনদাই একবার আমাকে সঙ্গে নিয়ে কানু সান্যালের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তপনদাকে গান্ধীনগরে রাত্রি উপহার দিয়েছিলেন অমলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। নীল কালিতে লিখে দিয়েছিলেন, স্নেহের তপনকে সংগ্রামী ভালোবাসাসহ। অমলবাবুর খুব প্রিয় ছাত্র ছিলেন তপনদা। অমলবাবুর কাছে বেলঘরিয়া যতীনদাস বিদ্যামন্দিরে আমিও পড়েছি। যদিও আজীবন খদ্দরের পাঞ্জাবি আর ধুতির সুদর্শন মানুষটির সংস্পর্শে প্রবলভাবে এসেছিলাম কলেজ জীবনের পরে। বন্ধু, শিক্ষক, তার্কিক, অসম্ভব পড়ুয়া এই মানুষটিকে যত জেনেছি তত অবাক হয়েছি। আমার কলোনি জীবনে একটুকরো নীল আকাশ। বিচিত্র তাঁর জ্ঞানের সীমা। পাশ্চাত্য সাহিত্য ও দর্শনে অবাধ যাতায়াত। মার্কসবাদে সন্দেহ রেখেও মার্কসবাদী দর্শন ও সাহিত্যের এমন পড়ুয়া খুব বেশি চোখে পড়ে না! এক বৃষ্টির বিকেলে অমলবাবু ও আমার সঙ্গে রাজনীতি বিষয়ে নানা কথাবার্তা বলতে বলতে হঠাৎ তপনদা হাউ হাউ করে কেঁদে উঠেছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে একটা প্রশ্নই বারবার করছিলেন, ‘স্যার, বলুন স্যার, আমরা কি এই পৃথিবী চেয়েছিলাম?’
কী পৃথিবী, কোন পৃথিবী তপনদা চেয়েছিলেন তপনদার সঙ্গে তা নিয়ে প্রত্যক্ষ আলোচনা কখনও হয়নি। তবে যে স্মৃতি ও স্বপ্ন নিয়ে বাকি দিনগুলো কাটিয়ে গেলেন তার একটা প্রচ্ছন্ন হদিশ তপনদার পড়া বইগুলি দেখলে ঠাহর করা যায়। তপনদা যখন বই পড়তেন দাগিয়ে পড়তেন। মার্জিনে বিভিন্ন মন্তব্য। কখনও কখনও সেগুলো এত ব্যক্তিগত হয়ে যেত যে ঘনিষ্ঠ দু’একজন ছাড়া সচরাচর কাউকে বইতে হাত দিতে দিতেন না। আমাকে যে গান্ধীনগরে রাত্রি পড়তে দিয়েছিলেন তাতেও নানা মন্তব্য ছিল। এই মওকায় চলুন সেই মন্তব্যগুলি আরেকবার পড়ে নেওয়া যাক।
১। বইটির উৎসর্গপত্রে মণিভূষণ হো চি মিনের ‘প্রিজন ডায়েরি’ থেকে একটা উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছিলেন –
‘The body is in Jail/But the spirit, never/For the great cause to prevail,/Let the spirit soar, higher.’
উদ্ধৃতিটির নিচে হো চি মিনের একটি ছোট স্কেচ করেছেন তপনদা। পাশে লাল কালিতে লিখেছেন, যে পথ দেখাও তুমি, সে পথেই বারে বারে যাই!
২। বইটির নাম কবিতা দ্বিতীয় লেখাটি, যার প্রথম কয়েকটি পঙক্তি – “গোকুলকে সবাই জানে, চিনে রাখল ডি আই বি’র লোক/স্টেটসম্যান পড়ার ফাঁকে আড়চোখে, গোকুলের মা/অন্ধকার ঘন হলে বলেছিল, ‘আর নয়, এবার ফিরে যা’–/ফেরার আগেই খাকি রঙের বিদ্যুৎ দরজায়। রিভলভার গর্জে ওঠে, গর্জায় গোকুল/রাষ্ট্রীয় ডালকুত্তা ঝুঁকে ছিঁড়ে নিল এক খাবলা চুল…”
এই লেখাটির দুটো শব্দে লাল গোল। গোকুল ও রাষ্ট্রীয় ডালকুত্তা। প্রথমটির পাশে লেখা – কমঃ খোকন, কখনও তোমাকে ভুলব না। আর দ্বিতীয়টির পাশে – বিমল, দেবী। লেখাটির শেষের দিকে একটি শব্দ ‘তেজি রক্তধারা’র নিচে লাল কালির মোটা দাগ।
৩। ‘গণতন্ত্রী গণৎকাররা কোথায় তখন ভেজান গলা/সিংহ রোডের গন্ডারেরা শানায় যখন ছুরির ফলা?’ পঞ্চম কবিতার এই দুটি পঙক্তির নিচে লাল দাগ। পাশে লেখা, চিনি চিনি সবকটাকে চিনি। কিন্তু চিনেই বা কী করলাম। আর করবোইবা কেন?
৪। সপ্তম কবিতায় ১টি পঙক্তির নিচে দাগ। ‘সূর্যে বিস্ফোরণ ঘটে পৃথিবীতে ঘটে যায় ছোট বড় বহু ভিয়েতনাম…’। মন্তব্য – তোমার নাম, আমার নাম ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম! এখনও বিশ্বাস করা যায়?
৫। ১১ সংখ্যক কবিতার প্রায় তিনটি পঙক্তি ঘিরে একটিই লাল গোল – ‘সকালে নখ কাটতে গিয়ে মনে হয়/শেষ রাত্রির ময়দানে সরোজ দত্তের দোমড়ানো শরীর ফেলে গেছে/ছিন্নমস্তার বেতনভুক কবন্ধরা…’। পাশে লেখা – শশাঙ্ক! লাল সেলাম। আপনার কবিতা নয়, অনুবাদ, ব্রজেন শীল বুকে বড় বাজে।
৬। ‘বাঁকুড়ার ঘোড়া’ কবিতাটির নিচে কয়েকটি লাইন ছোট ছোট হরফে লেখা – কমঃ সুবোধের পায়ে গুলি… কাল আসবেন… কী ঠান্ডা… শিশির আরেকটু হলেই ধরা পড়ছিল… এখান থেকে সোজা দমদম। তপতীকে মনে পড়ে।
৭। ‘কোনো’ কবি সম্মেলনে কবিতাটির পাশে একটিই এন্ট্রি – জেলে আমরাও কবিতা শুনেছি, পড়েছি, সমীরদা… সমীর রায়।
৮। ‘মন্টুর জীবন’ কবিতার শেষ তিনটি পঙক্তির নিচে আবারও দাগ – ‘…কিন্তু পাউরুটি কেটে দু’টুকরো করে দু’জনকে দিয়ে দিলেও তার হাতে আর একটা জিনিস/থাকে – ভারতবর্ষের অন্ধকার আকাশে হঠাৎ লাফিয়ে ওঠা বিদ্যুতের মতো আট ইঞ্চি লম্বা ঝকঝকে একখানা ছুরি।’ মন্তব্য – আবার ছুরি? আবার খতম? ভুল, ভুল, মহাভুল, কি বলেন কমরেড?
৯। “যখন দেয়ালে ফুটে ওঠে ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’ তখন/ক্ষমতার আগে রাজনৈতিক শব্দটা নেই বলে আমি আঁতকে উঠি…’ – ‘একটি স্লোগানের জন্ম কবিতার এই দুটি লাইনের নিচে কালো কালির দাগ। পাশে লেখা – ঠিকই বলেছেন কবি। কিন্তু বন্দুকের নল? সত্যিই কি প্রয়োজন?
এভাবেই কোনও কবিতায় ‘রাজবন্দী’ শব্দটির নিচে ঘন দাগ। পাশে লেখা – একদিন আমিও ছিলাম। ছিলাম কেন, এখনও। আবার কোনও কবিতায় ‘বুদ্ধদেব বসু’র চারপাশে গোল দাগ। পাশে তারকাচিহ্ন দিয়ে লেখা ‘তিথিডোর’, আর বইটির শেষ পুস্তানিতে লেখা দুটি লাইন – আমার মৃত্যুর পাশে তুমি থেকো হে গ্রন্থ/আর থেকো জোলা, জার্মিনাল।
না, তপন করের শেষ শয্যায় এমিল জোলা বা মণিভূষণ ছিলেন কিনা জানি না। কিন্তু আমার কেন আজকাল মাঝে মধ্যে গান্ধীনগরে রাত্রি পড়তে ও পড়াতে ইচ্ছে করে, এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে অবধারিত মনে পড়ল তপনদা’র পড়া গান্ধীনগরে রাত্রি’র কথা। তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, সংশয়ে, বিশ্বাসে, স্মৃতিতে, স্বপ্নে ঘুরে ফিরে আসে কবিতাগুলির নানা অনুষঙ্গে। তিনি এক ধরনের আশ্রয় খুঁজে পান কাব্যগ্রন্থটিতে। আর আমি? অনেক টালমাটাল উজিয়ে এসে এখনও আমি কেন অবলম্বন পাই এই গ্রন্থে? আর কেনই বা প্রতিবাদের চিত্রপট খুঁজতে, ভাষা খুঁজতে আমাকে ৪০ বছরের আগে প্রকাশিত গান্ধীনগরের রাত্রিতে যেতে হয়? সাম্প্রতিক কবিতাতেও তো কত প্রতিবাদ লেখা হয়ে চলেছে – পত্র-পত্রিকা, কাব্যগ্রন্থে, ফেসবুকে!
সন্তু মল্লিক কঙ্কালী তলার চা-এর প্লেটে লম্বা চুমুক মেরে বলছেন, দাদা, আজকাল প্রতিবাদের কবিতা মানেই তো তালিয়া কবিতা।
– তালিয়া কবিতা! সেটা কী সন্তু?
– প্রতিবাদ লিখলেই Like, প্রতিবাদ পড়লেই দাদা হাততালি, হাততালি আর হাততালি।
– সে দায় কার সন্তু? কবির, পাঠকের, না দর্শক-শ্রোতার?
সন্তু আমাকে পাত্তা না দিয়েই বলে যেতে লাগলেন, যত লম্বা প্রটেস্ট তত লম্বা হাততালি। মাঝে মাঝে শিস টিসও শোনা যায়।
– তবে কি সমাজে প্রতিবাদও এখন বিনোদন? যেভাবে সমাজসেবা এখন পেশা!
সন্তু মল্লিক কোনও উত্তর দিলেন না। একমনে চা টানিতে লাগিলেন।
